এসব কথার ফাঁকে বলি, আসল গোলমালটা অন্য জায়গায়।
রামপুরহাটের বটতলা গ্রামের চৌধুরীরা খুবই জ্যোতিষ-ট্যোতিষ মানেন। মহাধাম কাশীতে তাদের কুলগুরুরা পুরুষানুক্রমে বাস করেন। চৌধুরীবাড়িতে কোনও জন্মমৃত্যুর ঘটনা ঘটলে দিনক্ষণ-ঘণ্টা-মিনিট-সেকেন্ড, সমস্ত বিশদ করে কাশীতে গুরুগৃহে জানানো হয়।
বর্তমান গুরু হলেন জ্যোতিষ বারিধি, ত্রিকালদর্শী পণ্ডুলাল দেবশর্মা। সর্বাঙ্গসুন্দরের জন্মক্ষণ ইত্যাদি তার কাছে পৌঁছানোর পর পঙুলাল ঠাকুর বহু যত্নে সর্বাঙ্গসুন্দরের ঠিকুজি তৈরি করে পাঠিয়েছিলেন। এর বাবদ চৌধুরী পরিবার পাঁচশো এক টাকা পঁচিশ পয়সা প্রণামী দিয়েছিলেন গুরুদেবকে।
এই মূল্যবান ঠিকুজিতে লেখা আছে যে, শ্রীমান সর্বাঙ্গসুন্দর চৌধুরীর জন্মক্ষণে রাশি-নক্ষত্র, গ্রহাদির যেরকম অবস্থান ছিল তাহা এক কথায় বলা চলে অভূতপূর্ব। তাঁহার জন্মকুণ্ডলীতে মহাকবির সমস্ত লক্ষণ পাওয়া গিয়াছে। এই শিশু একদিন কালিদাস-ভবভূতি কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতো বড় কবি হইবেই হইবে। অত্যন্ত সতর্কতা এবং যত্নের সহিত ইহাকে লালন-পালন করিতে হইবে। ইহার কবিত্ব বিকশিত হওয়ার জন্য যাহা কিছু করা প্রয়োজন তাহার যেন অন্যথা না হয়।
ঠিকুজির সঙ্গে এই ভবিষ্যৎবাণী, তার সঙ্গে গুরুদেবের স্বহস্ত লিখিত প্রেসক্রিপশন এবং ওষুধ ছিল। একটি ছোট তামার মাদুলি, পদ্যবিকশিনী তাবিজ সেটা, আকারে ছোট হলে কী হবে দারুণ শক্তিশালী, ভগবতী ভারতীর আশীর্বাদধন্য অথচ দাম মাত্র এগারোশো টাকা।
সুন্দরের বাবা নিমাই চৌধুরী রেলে কাজ করেন, চোখা বুদ্ধির লোক। তিনি এ টাকা কখনওই গুরুদেবকে দিতেন না। মাদুলি ফেরত দেওয়ার উপক্রম করেছিলেন তিনি, কিন্তু সুন্দরের ঠাকুরদা তখনও বেঁচে, তিনি আধ বিঘে ধানজমি বেচে গুরুর পাওনা মেটালেন। তাঁর বক্তব্য হল যে বাড়িতে এমন একটি ছেলে জন্মেছে যে একদিন কবিতা লিখে বংশের মুখোজ্জ্বল করবে, তার জন্যে এক-আধ বিঘে জমি বেচে দেওয়া যেতেই পারে। লোকেরা তো ছেলেমেয়ের ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে কত খরচ করে। কবি হওয়ার জন্যে তো আর সেরকম খরচ করতে হবে না।
অতঃপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। সর্বাঙ্গসুন্দর লেখাপড়া বিশেষ করে না, সদা-সর্বদাই কাব্য রচনা করে চলেছে। কখনও সে কবিতা জলের মতো সোজা:
সোজা চল, বাঁকা চল,
জলে জলে টলমল।
কিবা হবে বাহুবল,
নৌকাই সম্বল।
এ কবিতা অবশ্য অনেকদিন আগে লেখা। সর্বাঙ্গসুন্দর দ্বিতীয় ভাগ শেষ করেই কবিতা লিখতে শুরু করে। এ কবিতা তার বছর দুয়েকের মধ্যেই সে রচনা করে।
তার এখনকার কবিতা কিন্তু আস্তে আস্তে জটিল হচ্ছে। বছর কয়েক আগের জলের কবিতাই ধীরে ধীরে অন্য রকম হয়েছে, তার মধ্যে নানা প্যাঁচ এসে গেছে, সে তেল আর জল মেলাতে গেছে:
তেল আর জল। ধর্মের কল।
দধি অম্বল। অমল কমল।
গদি টলমল। চোখ ছলছল।
নদী ছলছল। অদল বদল।
দিবসে নিশাতে। লেপ কম্বল।
তেল আর জল। তরল গরল।
মিশাতে মিশাতে…
ভুক্তভোগীরা জানেন এ ধরনের কবিতা লেখা বেশ কঠিন। যেমন এইখানে সর্বাঙ্গসুন্দরের একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তেল আর জল মেশানোর পরে কী করতে হবে, সেটা ঠিক তার মাথায় খেলছে না।
মাস তিনেক আগে আরেকবার এমন হয়েছিল। সেবার পাড়ায় একটা বড় চুরি হয়েছিল। চুরির তিনদিন পরে একজন বেঁটে দারোগা চুরির তদন্ত করতে এসেছিলেন। সেই দারোগাসাহেব শুধু বেঁটেই নন, রোগাও খুব। পরনের খাকি ইউনিফর্ম ঢলঢল করছে। কিন্তু তাঁর কী প্রতাপ! কথায় কথায় হাতের বেতের লাঠিটা মাটিতে ঠুকছেন, কাউকে ইডিয়েট, কাউকে স্টুপিড বলছেন।
দারোগা চলে যাওয়ার সময় পাড়ার মুদির দোকান থেকে পাঁচ কেজি সরষের তেলের একটা টিন আর দশ কেজি গোবিন্দভোগ চাল ধারে নিয়ে গেলেন। পরে শোনা গেল, দারোগাবাবু নাকি ভীষণ ঘুষখোর। চোর-টোর কোনওদিন কিছুই ধরেন না, ধরার চেষ্টাও করেন না। শুধু ঘুষ খেতে ওস্তাদ। পান-সিগারেট, এক টাকা দু টাকা থেকে সোনা-দানা মোটা টাকা সব কিছুই ঘুষ খান এই দারোগাবাবু।
চোর বলে দারোগারে
কত ঘুষ খাবি খারে।
তার পরও যদি ধারে
তেল খাস চাল খাস…
সেই সময়ে দারোগাবাবুর ব্যাপার, দেখে রাগে, ঘৃণায় এই কবিতাটি লিখেছিল সুন্দর। কিন্তু কবিতাটি একাধিক কারণে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
এক নম্বর কারণ হল, এর পরে আর কী লেখার থাকতে পারে সেটা সুন্দর ভেবে উঠতে পারেনি। ওই তেল খাস, চাল খাস এতেই সব কথা বলা শেষ হয়ে গেছে।
দুই নম্বর কারণটি অবশ্য খুবই সাংঘাতিক।
কবিতাটি আরম্ভ করেই সর্বাঙ্গসুন্দর তার বাবাকে শোনাতে গিয়েছিল। নিমাই চৌধুরী ওই চার লাইন শুনেই ছেলেকে বাধা দিলেন। তিনি বললেন, পুলিশের ঘুষ খাওয়া নিয়ে কবিতা লিখতে যেও না। একদম ফাটকে পুরে দেবে।
এরকম একটা সম্ভাবনার কথা কিশোর সর্বাঙ্গসুন্দর মোটেই ভাবেনি। কিন্তু বুদ্ধিমান পিতার নির্দেশে সে সতর্ক হয়ে গেল।
তারপর অনেকক্ষণ চিন্তা করে বাবাকে প্রশ্ন করল, বাবা, তাহলে রেশনের জিনিসপত্র নিয়ে কোনও কবিতা লেখা চলবে না?
নিমাইবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, রেশনের চাল-গম নিয়ে আবার কী কবিতা?
সর্বাঙ্গসুন্দর বলল, পড়ব, শুনবে?
নিমাইবাবু রাজি হতে সর্বাঙ্গসুন্দর পড়তে আরম্ভ করল:
