ভুলেই গিয়েছিলাম বলা উচিত। হঠাৎ ছয় বছর পরে সেদিন ব্যাঙ্ক থেকে একটা চিঠি এসে। উপস্থিত, পঙ্গু তর্জমায় চিঠিটা এইরকম দাঁড়াতে পারে–
প্রিয় মহাশয়,
আমাদের ব্যাঙ্কে ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাস হইতে আপনার অ্যাকাউন্টে আর কোনও কাজকারবার হয় নাই। শেষ কারবারের তারিখে আপনার জমা টাকার পরিমাণ ছিল একুশ টাকা বাষট্টি নয়া পয়সা।
আমাদের ব্যাঙ্ক আইনের ১৭(২) (খ) সূত্রের পঞ্চম উপসূত্র অনুযায়ী অ্যাকাউন্টে পঁচিশ টাকার কম জমা থাকিলে প্রতি অর্ধ বৎসরে দেড় টাকা করিয়া কাটিয়া লওয়া হয়। তদুপরি উক্ত আইনের ২৯(৩) (চ) সূত্রের বিশেষ উপসূত্র অনুযায়ী যেহেতু আপনাকে চেকবই দেওয়া হইয়াছিল এবং উক্ত আইনের ২৯ (৩) (ঝ) সূত্রের দণ্ডাদেশ অনুযায়ী যেহেতু আপনার গচ্ছিত অর্থ একশত টাকার কম ছিল, প্রতি মাসে পঁচিশ নয়া পয়সা হিসাবে আপনার হিসাব হইতে কাটিতব্য।
এমতাবস্থায় আপনার একুশ টাকা বাষট্টি নয়া পয়সা কাটিয়া আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হইল বলিয়া আপনাকে নিবেদন করা যাইতেছে।
ইতি ২২।৫৬৩
আপনার বিশ্বস্ত
অস্পষ্ট স্বাক্ষর
এমন নিদারুণ নির্মম চিঠি জীবনে আমি খুব বেশি পাইনি। সারাদিন ধরে মাথা ঘুরতে লাগল। একুশ টাকা–একুশ-বাষট্টি-টাকা-নয়া পয়সা, রাতে ভাল করে ঘুম হল না। শেষরাতে ভাল করে স্নান করলুম, তারপর এক কাপ চা খেয়ে ব্যাঙ্কের এজেন্টকে চিঠি লিখলাম–
প্রিয় মহাশয়,
আপনার অমুক তারিখের পত্রের জন্য ধন্যবাদ। আমার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হইয়াছে তাহা আমাকে জানাইয়া সদাশয়তার পরিচয় দিয়াছেন। কিন্তু এই বিষয়ে আমার একটি বক্তব্য আছে।
১৯৫৭ সালের নভেম্বর হইতে এ পর্যন্ত চৌদ্দটি অর্থ বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে, প্রতি ছয় মাসে যদি দেড় টাকা হয় তবে তাহাতে একুশ টাকা কাটা যাইবে। তদুপরি এই ঊনআশি মাসে পঁচিশ নয়া পয়সা করিয়া (চেকবই রাখা বাবদ) উনিশ টাকা পঁচাত্তর নয়া পয়সা আমার নিকট আপনাদের প্রাপ্য। অর্থাৎ মোট চল্লিশ টাকা পঁচাত্তর নয়া পয়সা আপনারা এখন পর্যন্ত আমার কাছে পাইবেন। ইহার পরিবর্তে আমার একুশ টাকা বাষট্টি নয়া পয়সা আপনারা কাটিয়াছেন।
আমি সৎ ব্যক্তি, এইরূপ হিসাবে উনিশ টাকা তেরো নয়া পয়সা আপনাদের ক্ষতি হইতেছে। আমি ইহা হইতে দিতে চাহি না।
আমি আপনাদের ব্যাঙ্ককে আমার নিকটে একটি অ্যাকাউন্ট খুলিতে বলি। আপনাদের কোনও টাকা পয়সা জমা দিতে হইবে না, এই উনিশ টাকা তেরো নয়া পয়সা জমা থাকিলেই চলিবে, তবে চেকবই দিতে পারিব না। আর যেহেতু আপনাদের জমা পঁচিশ টাকার কম, আপনাদেরই আইন অনুযায়ী প্রতি ছয় মাসে দেড় টাকা করিয়া কাটিব। এইরূপে আগামী চৌদ্দো বৎসরে আপনাদের বেয়াল্লিশ টাকা কাটা যাইবে, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে আপনাদের নিকট হইতে আমি আমার প্রাপ্য অর্থ লইয়া আসিব।
আশা করি, এই আইনসম্মত ব্যবস্থায় আপনাদের কোনওই অসুবিধা হইবে।
ইতি
ভবদীয়
সর্বাঙ্গসুন্দরের কবিতা
সর্বাঙ্গসুন্দর চৌধুরীর নাম কেউ শোনেনি। সর্বাঙ্গসুন্দরের কোনও কবিতাও পড়েনি। তার একটা কারণ অবশ্য এই যে সর্বাঙ্গসুন্দরের কোনও কবিতাই আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। যদিও তার কবিতার সংখ্যা অজস্র, কবিতার খাতাই হবে গোটা দশেক, আর সে খাতাগুলোও বেশ মোটা মোটা।
সর্বাঙ্গসুন্দর নামটা নিয়ে কারও কারও মনে খটকা লাগতে পারে। এ আবার কী নাম রে বাবা! তাই ব্যাপারটা প্রথমেই খোলসা করে নেওয়া ভাল।
সর্বাঙ্গসুন্দরদের পরিবারের গৃহদেবতা হলেন গৌরাঙ্গ। বীরভূম জেলায় রামপুরহাট মহকুমা শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে বটতলা গ্রামে সর্বাঙ্গসুন্দরের বাড়ি। সে বাড়িতে সোনার গৌরাঙ্গের মন্দির আছে। আশেপাশের লোকেরা বলে, চৌধুরীদের সোনার গৌরাঙ্গ, যদিও সোনার গৌরাঙ্গ এখন আর নেই। এই সোনার গৌরাঙ্গের নামেই সর্বাঙ্গসুন্দরের দাদার নাম রাখা হয়েছিল গৌরাঙ্গসুন্দর। গৌরাঙ্গসুন্দরের জন্মের বছর কয়েক পরে আমাদের সর্বাঙ্গসুন্দর যখন জন্মাল তখন স্বাভাবিকভাবেই তার পিতামহ এই দ্বিতীয় পৌত্রের নামকরণ করলেন সর্বাঙ্গসুন্দর। গৌরাঙ্গের সঙ্গে মিল দিয়ে অন্য নাম পাওয়া গেল না।
সর্বাঙ্গসুন্দরের পিতামহ অবশ্য এখন আর বেঁচে নেই। সর্বাঙ্গসুন্দরেরাও আর বটতলা গ্রামে থাকে না। তাদের সেই পারিবারিক বিগ্রহ সোনার গৌরাঙ্গ, সেও কয়েক বছর আগে দেশের বাড়ি থেকে চুরি গেছে।
কিন্তু জমজমাট সর্বাঙ্গসুন্দর নামটা রয়ে গেছে। তবে এত বড় নামটা সব সময়ে সবাই ব্যবহার করে না, তাকে ছোট করে সুন্দর বলে ডাকে। সর্বাঙ্গসুন্দরের দাদা গৌরাঙ্গসুন্দরকে অবশ্য সবাই ডাকে গোরা বলে।
সুন্দরের বাবা রেলে কাজ করেন। এখন থাকেন হাওড়ায় সাঁতরাগাছি অঞ্চলে রেলওয়ে কোয়ার্টারে। কাছেই একটা পুরনো আর ভাল হাইস্কুল আছে। সেই স্কুলে গোরা আর সুন্দর দুজনেই পড়ে, গোরা পড়ে ক্লাস টেনে। এ বছরই তার সেকেন্ডারি পরীক্ষা। সুন্দর অবশ্য দু ক্লাশ নীচে পড়ে।
গোরা খুব ভাল ছাত্র। স্কুলের মাস্টারমশায়রা জানেন গোরা স্টার পাবেই, হয়তো স্ট্যান্ড করতেও পারে। কিন্তু সুন্দর মোটেই ভাল নয় লেখাপড়ায়, কোনও রকমে টায়েটুয়ে পরীক্ষায় পাশ করে। অবশ্য দেখলে দেখা যাবে গোরা খেলাধূলা, হইচই করে বেশি সময় কাটায়। আর সুন্দর সর্বদাই। খাতা-কলম নিয়ে বসে আছে।
