মল্লিকমশায় এসব কথা শুনে বিশেষ উত্তেজিত হয়ে যেতেন, আমাকে আলাদা পেলেই বললেন, ডুববেন মশায়, জয়গোপাল আপনাকে পথে বসিয়ে ছাড়বে। ওই একটা থার্ড ক্লাস কৃপণের সঙ্গে মেলামেশা করতে আপনার ঘেন্না হওয়া উচিত মশায়।
কৃপণের এই শ্রেণী বিভাগ বিষয়ে মল্লিকমশায়ের একটা থিয়োরি ছিল। সব কৃপণই যাতায়াতের পয়সা বাঁচানোর জন্যে গাড়িতে না উঠে গাড়ির পিছনে পিছনে দৌড়ে যায়। যারা ট্যাক্সির পিছনে দৌড়োয় তারা ফার্স্ট ক্লাস। এরই মধ্যে বড় ট্যাক্সি ছাড়া আর কিছুর পিছেই দৌড়ায় না এই ধরনের অভিজাত প্রথম শ্রেণীও একটা আছে। (প্রসঙ্গত সেই সময়ে কলকাতায় বড়-ছোট দুই রকম ট্যাক্সি ছিল দুই রকম ভাড়ার।) কিছু কিছু আয়েসি কৃপণ ফিটন, রিকশা এই সব শ্লথগতি যানের পিছনে। দৌড়ায়, তাদের পয়সা বাঁচানোর খুব ইচ্ছে–কিন্তু শারীরিক সামর্থ্যের অভাব। এরা দ্বিতীয় শ্রেণীর। তৃতীয় শ্রেণীর কৃপণেরা ট্রাম-বাসের পিছনে দৌড়ায়। ট্যাক্সি কিংবা ফিটনের পিছনে দৌড়ে বেশি টাকা বাঁচানোর মতো মনের প্রসারতা বা উদারতা এদের নেই। ট্রামের কিংবা বাসের পিছনে দৌড়ে দু-চার পয়সা বাঁচাতেই এদের যা আনন্দ। জয়গোপাল এই শ্রেণীর। তাও নিকৃষ্ট পর্যায়ের। এর মানসিকতা দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রামের পিছে দৌড়ানোর। ফার্স্ট ক্লাস ভাবতেও ওর বুক কেঁপে ওঠে।
মল্লিকমশায় আমাকে গালাগাল করতেন, আরে দৌড়াবেনই যখন বড় ট্যাক্সির পিছনে দৌড়ে পাঁচ টাকা বাঁচবে, আমার পিছনে দৌড়ান, তা নয়, সেকেণ্ড ক্লাস ট্রাম, ওই জয়গোপালের পিছনে দৌড়চ্ছেন! এই সব বলে তারপর আমাকে বলতেন, নিন এবার এক প্যাকেট সিগারেট কিনুন। সঞ্চয়ের বিষয়টা একবার পার্কে বসে স্থিরমস্তিষ্কে ভাবতে হচ্ছে।
একদিকে জয়গোপাল অন্যদিকে মল্লিকমশায়, সঞ্চয়ের বাসনা আমার প্রবল হয়ে উঠল। কাউকে কিছু না জানিয়েই গোপনে গোপনে একদিন ব্যাঙ্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলাম। অ্যাকাউন্ট খোলা খুবই সোজা, শুধু যদি আপনার এমন একজনের সঙ্গে পরিচয় থাকে যার ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে। আমি অনেক ভাবলাম কিন্তু এমন একজনের কথা ভাবতে পারলাম না আমার চেনালোকের মধ্যে যার ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে, বাধ্য হয়ে আবার জয়গোপালের শরণাপন্ন হতে হল। কিন্তু। আশ্চর্য, জয়গোপালেরও কোনও অ্যাকাউন্ট নেই। সে দেখলাম একটা সঞ্চয়িতার মলাটের মধ্যে টাকা রাখে। সঞ্চয় করার জন্যেই তো সঞ্চয়িতা, এর মধ্যে বাবা টাকা জমাতেন, আমিও জমাই, এই কাপড়ের মলাট একটু ব্লেড দিয়ে চিরে ভেতরে ঢুকিয়ে রাখবে, একেক দিকের মলাটে পঞ্চাশটা করে দশ টাকার নোট, দুদিকের মলাট ভরে গেলে পুরো হাজার টাকা। জয়গোপাল নিশ্চয় আমাকে খুব বিশ্বাসী বলে ধরে নিয়েছিল। মাথার কাছে কালো শক্ত কাঠের আলমারি খুলে দেখাল, প্রায় তিন-চারশো সঞ্চয়িতা তাকে তাকে যত্ন করে সাজানো।
জয়গোপালের ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম মল্লিকমশায়ের বাড়িতে। মজুমদারসাহেবও রয়েছেন। মল্লিকমশায় খুব হাসলেন, ও, ব্যাঙ্কে টাকা রাখবেন বুঝি! পরে তুলতে চান তো, বিপদ আপদে পড়লে টাকাটা আপনি তুলতে চাইবেন তো।
মল্লিকমশায়ের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, সে কে না চাইবে। আমার টাকা আমার প্রয়োজনে আমি তুলব।
এক টুকরো সাদা কাগজ এগিয়ে দিয়ে মল্লিকমশায় বললেন, আপনার নাম লিখুন তো এখানে।
নাম লেখা হল। কিন্তু মল্লিকমশায় প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে অন্য এক সরসতর আলোচনায় মনোনিবেশ করলেন। ঘণ্টাখানেক পরে আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, তা আপনারও কি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই?
আমার আছে কি নেই সেটা বড় কথা নয়। আপনার থাকবে কিনা সেটাই বড় কথা। নিন নিজের নাম লিখুন। মল্লিকমশায় তখন হাকিমি পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন। কণ্ঠস্বরে আদেশের ভাব দেখলাম।
তবু আমি বললাম, একবার তো সই করলাম! আবার কেন?
আরে মশায় বলছি করুন। এইবার আবার সই করার পরে মল্লিকমশায় আমার সই দুটো মজুমদারসাহেবের হাত দিয়ে বললেন, দেখুন তো, এ দুটো একই হাতে লেখা কিনা?
মজুমদারসাহেব বললেন, অসম্ভব মশায়! একই চেহারার যেমন দুজন লোক হয় না, তেমনই একই রকম সই একই নোক দুবার করতে পারে না। যতই চেষ্টা করুন কিছুতেই মিলবে না।
এবার আমি নিজের সইদুটোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম। একেবারে দুরকম। কোনও মিল নেই। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, টাকা জমা দিলে আর রক্ষা নেই। সই মিলবে না, টাকাও উঠানো যাবে না।
কিন্তু অনেক লোকে তো ওঠায়?
এর পরেও আমি কী করে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে সক্ষম হয়েছিলাম, সে রহস্য আমি নিজেও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট বুঝে উঠতে পারিনি, সে বিষয়ে কোনও আলোচনায় প্রবেশ করা আমার পক্ষে খুব সম্মানজনক হবে না।
মল্লিকমশায় যা বলেছিলেন, তা কিন্তু মিলল না। ব্যাঙ্ক আমার চেক অনেক সময়েই ফেরত দিয়ে দিত বটে কিন্তু আমার সই মিলছে না বলে নয়, একেবারে অন্য এক সামান্য কারণে, অ্যাকাউন্টে টাকা নেই বলে। এত কম টাকা তুলতুম একেকবারে যে সই মেলানোর প্রশ্নই বোধহয় উঠত না।
এইভাবে কিছুদিন চলল। তারপর একদিন ধীরে ধীরে কী করে আমার ব্যাঙ্ক-উৎসাহে ভাটা লাগল, টাকা জমা দেওয়া বহুদিন বন্ধ। একাধিকবার টাকা তুলতে গিয়ে জানলাম আর টাকা তোলা যাবে না, তুলতে গেলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে তুলতে হবে। ইচ্ছার অভাবে এবং বিশেষত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার নানা কাল্পনিক হাঙ্গামার কথা ভেবে কিছু আর করলাম না। ব্যাঙ্কে আমারও একটা অ্যাকাউন্ট আছে, আমার নিজের নামে পাশবই, চেকবই আছে, আমার কুৎসিত স্বাক্ষর কোনও এক লাল চামড়া দিয়ে বাঁধানো মোটা দামি লেজার-খাতায় অসংখ্য ধনী লোকদের স্বাক্ষরের সঙ্গে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে, আমার জীবনের এই গৌরবময় দিকটা পর্যন্ত কী অনায়াসে অবহেলা করলাম।
