আমার ঘরোয়া ডাক্তার বলেছেন, লক্ষণ শুনে মনে হচ্ছে, হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে গেছে। আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসছি। আপনি এখনই গিয়ে এই ট্যাবলেটটার অর্ধেক খাইয়ে দিন। ড্রয়ার খুলে একটা ছোট ট্যাবলেট বের করে দিয়ে ডাক্তার বলে দিয়েছেন, খুব কড়া ওষুধ। পুরোটা দেবেন না যেন।
সতীসাধ্বী পত্নী সেই ট্যাবলেট আঁচলে গিট দিয়ে বেঁধে এনেছেন। এবার আঁচল খুলে বার করে আমার সামনে খাওয়ার টেবিলে রেখে বললেন, এটা অর্ধেক করে খেয়ে নাও।
মোড়ক খুলে অতি ক্ষুদ্র আকারের ট্যাবলেটটি বার করতে করতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটাই কি আজকের ব্রেকফাস্ট?
স্ত্রী বললেন, এখন তো আধখানা ট্যাবলেট খেয়ে নাও। ডাক্তারবাবু এসে তোমাকে দেখে। ডায়েট চার্ট করে দেবেন। আজ থেকে সেই অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া হবে। আপাতত একটা দুধ-চিনি ছাড়া চা করে দিচ্ছি। তুমি ততক্ষণে ওষুধটা ভেঙে অর্ধেক খেয়ে নাও।
সাধারণ বড়ির চেয়েও ছোট আকারের ওষুধ। ব্যাসার্ধ এক সেন্টিমিটারের এক চতুর্থাংশ হবে।
মোড়ক খোলা ট্যাবলেটটি হাতে নিয়ে আমি সেটাকে দ্বিখণ্ড করায় ব্রতী হলাম। বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনীর মধ্যে ট্যাবলেটটির সূক্ষ্ম একদিক শক্ত করে ধরে অন্যদিক ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনীর মধ্যে চেপে ভাঙবার চেষ্টা করলাম।
পৃথিবীর কঠিনতম কর্মগুলির তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত এই ট্যাবলেট দ্বিখণ্ডীকরণের কাজ। প্রভূত বলপ্রয়োগ করেও কোনও সুবিধে হল না।
ইতিমধ্যে গৃহিণী ধূমায়িত লাল চা নিয়ে এসে গেছেন এবং আমি যে এতক্ষণেও সামান্য একটা ওষুধের বড়ি দুটুকরো করতে পারিনি তাতে রীতিমতো উত্তেজিত। আমাকে অকর্মণ্য বলে সম্বোধন করে তিনি ট্যাবলেটটি আমার হাত থেকে কেড়ে নিলেন এবং টেবিলের ওপরে রেখে একটা ফলকাটা ছুরি দিয়ে ভাগ করতে গেলেন। একটু জোরে চাপ দিতেই ছুরিটির ফলা বরাবর বড়িটি টেবিলের ওপর দিয়ে ছিটকিয়ে জানলাপথে বেরিয়ে আসলে আকাশে উঠে গেল। বলা যায়, মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গেল। আমি স্পষ্ট দেখলাম ঊর্ধ্বমুখী বড়িটা আকাশপানে উঠে যাচ্ছে। মুখে বললাম, তু চিজ বড়ি হ্যায়…।
হায়! হায়! করতে করতে গৃহিণী রাস্তায় ছুটে গেলেন। কিন্তু কোথাও সেই বড়িটার চিহ্ন পাওয়া গেল না। তিনি আর বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন না, আবার ডাক্তারের কাছে ছুটলেন।
.
দুধ-চিনি ছাড়া লাল চা দেখলে চিরদিনই আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। কী করব, সেই চা নিজেকে একা একা বসে গলাধঃকরণ করতে হল।
এদিকে ঘটনার ডামাডোলে শরীর তছনছ হয়ে গেছে, পেট চোঁ চোঁ করছে। এরপরে আবার ডাক্তার এসে হয়তো সব খাওয়াই বন্ধ করে দেবে, তার চেয়ে এই অবসরে যা পারি কিছু খেয়ে নিই।
সামনে ফ্রিজের ওপরে পাউরুটি রয়েছে। এখন আর সেঁকে নেওয়ার সময় নেই, কঁচা চার-পাঁচ পিস বের করে নিলাম। একটু মাখন মাখিয়ে চিনি দিয়ে খাব।
সামনেই টেবিলের ওপরে মুখবন্ধ গোলাকার স্টিলের কৌটো, ওটাই আমাদের মাখনদানি। কৌটোটা হাতে নিয়ে কৌটোর মুখটা ঘোরালাম। সুন্দর, মসৃণভাবে মুখটা ঘুরছে। কিন্তু ওপরদিকে যত টানি কিছুতে খোলে না।
একে স্টিলের কৌটো, তার ওপরে মাখন রাখা হয়। রীতিমতো পিচ্ছিল। টেনে খোলা অসম্ভব। কৌটোটাকে নিয়ে প্রথমে মেঝেতে, তারপরে দেয়ালে কাত করে ঠুকতে লাগলাম। কিন্তু কিছুই হওয়ার নয়। জোরে ঠুকতে গিয়ে দু-জায়গায় টোল খেয়ে গেল।
অবশেষে মাখনের কৌটোটি গোল করে টেবিলের ওপরে শক্ত করে ধরে সেই তরকারি কাটা ছুরি দিয়ে কৌটো আর মুখের জায়গায় খুব শক্ত চাপ দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে কাজ হল। কৌটোর মুখটা খুলে গিয়ে ছিটকিয়ে আমার কাঁধে লেগে ঝনঝন শব্দে মেঝেতে পড়ল এবং মাখনভরতি কৌটো লাফিয়ে উঠে আমার মুখে এসে লাগল। বিলিতি হাসির সিনেমায় যেমন দেখা যায় আমার ঠোঁটে মুখে চিবুকে গালে মাখন লেপটে গেল।
ঠিক এই সময়ে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে স্ত্রী ঘরে প্রবেশ করলেন। আমার অবস্থা দেখে দুজনেই স্তম্ভিত। ডাক্তারবাবু বললেন, এ বয়েসে এভাবে মাখন খাবেন না, একটু রয়েসয়ে খান।
» একদিন রাত্রে
আজ সকাল থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। শীতের প্যাচালো বৃষ্টি। সেই সঙ্গে যথারীতি উত্তুরে হাওয়া। ঠান্ডাও পড়েছে খুব। অনেকদিন কলকাতা শহরে এরকম জমাট ভাব, ভারী ঠান্ডা দেখা যায়নি।
সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা হয়ে গেল, বৃষ্টি থামবার কোনও নামগন্ধ নেই। যদি জোরে দু-চার পশলা হয়ে যেত তবে সে ছিল মন্দের ভাল, হয়তো মেঘটা কেটে যেত। কিন্তু আকাশ ঘন হয়ে শীতের রাতের অন্ধকার নেমে এল, টিপটিপ করে বৃষ্টিও হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে লোডশেডিং, আজ সারাদিন ধরেই বিদ্যুৎবিভ্রাট হচ্ছে। অথচ কাগজে কোলাঘাট-ব্যান্ডেলের কোনও গোলমালের খবর নেই, কী জানি, হয়তো ঠান্ডার জন্যেই বিদ্যুতের বাবুরা কাজে আসেনি, বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লোকের অভাব। হয়েছে।
সে যা হোক, এসব অবান্তর চিন্তা। জয়দেব বলেছিলেন, ঠিক পাঁচটার সময় আসবেন। একেবারে কাটায় কাঁটায় পাঁচটায়। সওদাগরি অফিস মহিমাময়ের, ওই ঠিক পাঁচটাতেই ছুটি হয়। দশটা-পাঁচটা-ইংরেজ আমলের সেই পুরনো রুটিন এখনও বদল হয়নি।
পাঁচটা থেকে জয়দেবের জন্যে মহিমাময় বসে আছেন। এই বৃষ্টির দুর্দিনে বিকেল বিকেলই অফিস ফঁকা হয়ে গিয়েছিল, এখন ছুটির পরে প্রায় কেউই নেই। শুধু বড়সাহেবের ঘরে আলো জ্বলছে। আর ওখানে বড়সাহেবের কাছে বোধ হয় কোনও ভিজিটর এসেছে। আর এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-চারজন দারোয়ান, চাপরাশি রয়েছে। ওরা এ অফিসেরই কেয়ারটেকারের স্টাফ; অফিসেরই একতলায় থাকে।
