কিন্তু জয়গোপালের এই শেষ গুণটি, এই মিতব্যয়িতাই আমার পক্ষে মর্মান্তিক। তখন প্রথম আলাপ, একদিন শীতের দুপুরবেলায় জয়গোপালের সঙ্গে দেখা। জয়গোপাল মৃদু হেসে এগিয়ে এল, এই যে, কী খবর? এসো এই পার্কে বসে একটু গল্প করা যাক। ভাল কথা, ফ্রুট খাবে, শীতের দিনে ফ্রুট খাওয়া ভাল।
জয়গোপাল দুই পয়সার টোপাকুল কিনে নিয়ে এল।
দুজনে পার্কে ঘাসের উপর বসে আছি। কথাবার্তা বলছি, এমন সময় এদিক ওদিক তাকিয়ে জয়গোপাল পকেট থেকে একটা ডায়েরি বার করে খুটখুট করে লিখে আবার ভাঁজ করে রাখল। আমার কেমন কৌতূহল হল। প্রশ্ন করলাম কী ব্যাপার?
মৃদু হেসে জয়গোপাল জানাল, না, কিছু না।
অনেক দিন পরে জয়গোপালের বাড়িতে একটা অন্যায় কাজ করেছিলাম। টেবিলের ওপর ডায়েরিটা রয়েছে, সে স্নান করতে গেছে। ডায়েরিটা খুলে দেখলাম ওই তারিখে লেখা রয়েছে, দুপুরবেলা–চ্যারিটি–দু পয়সা। টোপাকুল সাতাশটা। আমি আঠারোটা, অমুক নটা।
এই রকম ছোট-বড় খরচের খতিয়ান পাতায় পাতায়, সকালবেলা জিলিপি দু আনা, আমি তিন, বলরাম এক। এমনকী দৈনিক কটা করে কঁচালঙ্কা খরচ হচ্ছে তার হিসেব, গুনে দেখলাম পাঁচ-ছয় দিন যোগ করে যেই পঁচিশটা হচ্ছে, তার পাশে লেখা আনুমানিক এক ছটাক, এক আনা।
আর বেশি দেখার সুযোগ পেলাম না, জয়গোপাল স্নান সেরে ফিরে এল। খালি গায়ে। গলায় পইতে, তাতে অনেগুলো বিরাট বিরাট চাবি ঝুলছে। আমি বললুম, তোমরা বামুন তা তো জানতাম না! বসু কি বামুন হয়?
না, না, সেজন্যে পইতে নয়। এই চাবি ঝোলানোর খুব সুবিধে হয় কিনা তাই আমি পইতে ব্যবহার করি, আসলে আমার পইতে-টইতে কিছুই হয়নি। জয়গোপাল ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল আমাকে।
জয়গোপাল চাকরকে ডেকে চা করতে বলল। চাকর চায়ের জল চাপিয়ে এসে আবার দাঁড়াল।
কী চাই? জয়গোপাল জিজ্ঞেস করল।
চা! চাকরটা জানাল।
হ্যাঁ। বলে জয়গোপাল ওদের পুরানো আমলের ভারি লোহার সিন্দুকটা খুলে ফেলল। তারপর আমাকে ডাকল, এই ডালাটা একটু তুলে ধরো তো।
ডালাটা তুলে ধরলাম, সিন্দুকের মধ্যে শুধু কৌটো ছোট-বড় নানা আকারের। সবগুলোর গায়ে লেবেল মারা,-চা, হলুদ, ছোলার ডাল! যাবতীয় জিনিস সিন্দুকের মধ্যে। জয়গোপাল চায়ের কৌটো বার করে মেপে দু চামচ চা দিল চাকরের হাতে। তারপর আবার খুব যত্নে সিন্দুক বন্ধ করল।
আমি ঘরে ঘণ্টা-দেড়েক ছিলাম। এর মধ্যে আমাকে বার সাতেক সিন্দুকের ডালা ওঠানো নামানোয় সাহায্য করতে হল। কনুইয়ের থেকে কবজি পর্যন্ত আর ঘাড়ের দু পাশে পিঠ দিয়ে ঘুরে বুক পর্যন্ত রীতিমতো ফুলে গেল।
পরে শুনেছিলাম জয়গোপালের মতো নিরীহ, অমায়িক ছেলে বহুবার প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে শুধু এই একই কারণে। একবার মল্লিকমশায় দুহাতে প্লাস্টার করা একটি মেয়েকে রাস্তায় দেখিয়ে আমাকে বলেছিলেন, জয়গোপালের সদ্য প্রাক্তন প্রেমিকা। কাল চার ঘণ্টা জয়গোপালের বাড়িতে গল্প করেছে। আমি কিন্তু অবিশ্বাস করতে পারিনি।
আমি মল্লিকমশায়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জয়গোপালকে চিনলেন কী করে?
জয়গোপালকে চিনব না! মল্লিকমশায় বললেন, আমার পিসেমশায়ের বাবাকে ওর ছোট ঠাকুরদা খুব ভালবাসতেন। মরার সময় বলে গিয়েছিলেন, তোকে এমন জিনিস দিয়ে গেলাম তিন পুরুষ বসে খাবি। উইলে দেখা গেল পিসেমশায়ের বাবার নামে একটা কাঁঠাল কাঠের পিড়ি।
সব কৃপণ ব্যক্তিকে নিয়েই এ ধরনের গল্প থাকে। মল্লিকমশায়ের গল্পও হয়তো তাই। কিন্তু জয়গোপাল সম্পর্কে আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল, এ গল্প শোনারও অনেক পরে।
ভীষণ বৃষ্টি নেমেছে। রাত দশটা বাজে প্রায়। জয়গোপালদের বাড়ির গাড়িবারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে আছি, একটা থামের আড়ালে, এমন সময় আরে নক্ষত্রবাবু না! আরে এসো ভেতরে এসো! বাইরে। কী করছ? জয়গোপাল আমাকে জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢোকাল, বৃষ্টি তো ছাড়বে না, তুমি এখানেই ডিনার করে যাও।
দিন কয়েক আগে আমার কনুইয়ে একটা ফোঁড়া উঠেছিল, আশঙ্কায় ছিলাম, সিন্দুকের ডালা তুলতে না হয় আবার, তার বদলে ডিনার। ভাবাই যায় না। একসঙ্গে খেতে বসলাম। দু প্লেটে দুটো আটার রুটি, একটা আমার, একটা জয়গোপালের।
তারপরে, খাবে কী দিয়ে? কী দিয়ে খেতে ভালবাসো? গুড় না কাঁচালঙ্কা? জয়গোপালের প্রশ্ন সেই সঙ্গে চাকরের প্রবেশ একটা প্লেটে আধ চামচে পরিমাণ গুড় আর একটা কাঁচা লঙ্কা নিয়ে। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে।
জয়গোপাল আমার মনে সঞ্চয়ের কামনা ঢুকিয়েছিল। যখন-তখন দেখা হলেই বলত, কিছু জমছে তো হাতে-নাতে? এখন জমাবার মতো অবস্থা আমার নয়। কিন্তু জয়গোপাল নিজের উদাহরণ দেখাত, ভিখিরিদের উদাহরণ দেখাত। বলতো, সবাই কিছু কিছু জমিয়ে যাচ্ছে। কখনও কখনও জয়গোপাল আমাকে দু-একজন অমিতব্যয়ী লোকের জীবনের করুণ কাহিনি শোনাত। মানিকগঞ্জের গোপাল চৌধুরীর আপন ভাগ্নেকে সে পায়ের জুতো বেচতে দেখেছে। ভেড়ামারার কোনও এক জমিদারি সেরেস্তার নায়েব ছিল জয়গোপালের কোনও এক বন্ধুর বাবা, তার প্রসঙ্গও মধ্যে মধ্যে আসত। প্রচুর উপার্জন করতেন ভদ্রলোক কিন্তু নিমপাতা সেদ্ধ আর ডাল ভাত ছাড়া কিছুই খেতেন না। আর সেই নিমপাতাও কিনতে হত না। তার সেই কাছারিঘরের সামনেই ছিল বিরাট একজোড়া নিমগাছ। জয়গোপাল এই কাহিনি বলাকালে একাধিকবার সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলত।
