এইরকম অনেক ঘাটে জল খেয়ে সনাতনবাবু একদিন পশুক্লেশ নিবারণী সমিতিতে এসে পৌঁছালেন। তারা সব শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘোড়াটা কোথায়? সনাতনবাবু বললেন, ঘোড়া এখনও কিনিনি। তারা তখন বললেন, তাহলে এখন আমাদের কিছু করণীয় নেই। আমাদের এটা পশুক্লেশ নিবারণী সমিতি। আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি আপনার খুবই ক্লেশ হয়েছে, কিন্তু আপনার ক্লেশ দূর করার ক্ষমতা আমাদের নেই। অশেষ ধন্যবাদ দিয়ে সনাতনবাবু চলে এলেন।
এই শেষ ঘটনার পনেরো দিন পরের কথা। ইতিমধ্যে আশ্বিন মাস এসে গেছে। শরতের নীল আকাশে ঝকঝকে আরবি ঘোড়ার মতো সাদা মেঘগুলো গ্রীবা নাচিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এইরকম এক সকালবেলায় হঠাৎ হাতিবাগানের লোকেরা দেখল এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোক টগবগিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেরিয়ে পড়েছেন। ঘোড়া অবশ্য আকাশের মেঘের মতো সাদা নয়, বাদামি এবং খুব বড়ও নয়, তবু তো সত্যিকারের ঘোড়া।
শুধু রাস্তার লোকেরাই নয়, জানলা, দরজা, বারান্দায়, ছাদে দাঁড়িয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই সবিস্ময়ে এই অভাবিত দৃশ্য দেখতে লাগল। কলকাতার জটিল রাস্তায় ট্রামবাস, ট্যাকসি-রিকশা, পদাতিক ইত্যাদির পাশাপাশি কদম চালে এক অশ্বারোহী প্রফুল্ল বদনে চলে যাচ্ছে। মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ জিনিসটা বে-আইনি হচ্ছে কিনা বুঝতে না পেরে পকেট থেকে নোটবুক বার করে কী একটা লিখতে গিয়ে খেয়াল করল ঘোড়ার নম্বর নেই। সে হতভম্বের মতো ট্রাফিক কন্ট্রোল বন্ধ করে দিয়ে অশ্ব এবং অশ্বারোহীর দিকে হা করে তাকিয়ে রইল।
বলা বাহুল্য, শ্রীযুক্ত সনাতন সরকার মশায়ই এই অশ্বারোহী। তিনি কী করে ঘোড়া সংগ্রহ করলেন, ঘোড়া এবং তার আরোহী অর্থাৎ নিজের জন্যে লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন কিনা শেষ পর্যন্ত, ইত্যাদির বিস্তারিত আলোচনায় আমরা যাব না। কারণ, সেটা সনাতনবাবুর স্বার্থের বিরোধী হবে।
শুধু এটুকু বলে রাখি, সনাতনবাবু সাহসী লোক। আজ দু-দিন হল মাত্র ঘোড়াটি একটি সাময়িক সহিসসহ সংগ্রহ করে এনেছেন। আজ সকালবেলায় সহিস ঘোড়াকে দানাপানি খাইয়ে লাগাম পরিয়ে দিয়েছে। এখন সেও সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু সনাতনবাবু তাকে রেখে একাই ঘোড়ার পিঠে চড়ে অপিসের দিকে রওনা হয়েছেন। কে কী বলতে চেয়েছিল, সনাতনবাবু তাতে একবিন্দু কর্ণপাত করেননি।
কর্ণপাত করার মতো কোনও কারণও দেখা গেল না। নির্বিবাদে গ্রে স্ট্রিট হয়ে সোজা চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ হয়ে কয়েক সহস্র পথচারী এবং অলিন্দবিহারী জনতার অভিভূত দৃষ্টির সামনে দিয়ে কলকাতার শেষ অশ্বারোহী এসপ্ল্যানেডে এসে পৌঁছালেন।
আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন, ধীরে-সুস্থে কার্জন পার্কের পিছন দিক দিয়ে ঘোড়া নিয়ে সনাতনবাবু মেয়ো রোডের একপাশে একটা ঘাসে-ভরা জায়গায় এসে দাঁড়ালেন। ঘোড়া থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমে হাতের ব্যাগ থেকে একটা পাটের দড়ি বার করে ঘোড়াটার গলায় বাঁধলেন, তারপর আরেকটা প্রান্ত বেঁধে দিলেন একটা কৃষ্ণচূড়ার গুঁড়ির সঙ্গে। এরপর অত্যন্ত সাবধানে, ভয়ে ভয়ে মুখ থেকে লাগামটা ছাড়িয়ে ব্যাগে ভরে নিলেন, ঘোড়াটা আনন্দে পরপর তিনবার হ্রেষাধ্বনি করে উঠল।
সনাতনবাবুও খুশিমনে অপিস চলে গেলেন। এতদিনে তার অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে। তার ওপরে পার্কিং ফি লাগছে না।
বিকেলে অপিস থেকে বেরিয়ে মনে একটু শঙ্কা ছিল, গিয়ে ঘোড়াটা দেখতে পাবেন কিনা। কিন্তু দূর থেকেই দেখতে পেলেন, ঘোড়াটা গ্রীবা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ইতিমধ্যে পরিচিত অপরিচিত মহলে, নানা দিকে সনাতনবাবুর কীর্তির কথা ছড়িয়ে পড়েছিল। সনাতনবাবু ঘোড়র কাছে পৌঁছে দেখলেন, ঘোড়ার থেকে একটু নিরাপদ দূরত্বে একটা ছোটখাটো জনতা। তারা এতক্ষণ অধীর কৌতূহলের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল, সনাতনবাবু যেতেই একটা চাপা গুঞ্জন উঠল।
কোনওদিকে দৃষ্টিপাত না করে অত্যন্ত স্মার্টভাবে সনাতনবাবু ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। তার আগে হাতের ব্যাগ থেকে লাগামটা বার করে নিয়েছেন। কিন্তু লাগাম পরাতে গিয়ে বুঝলেন অসম্ভব, সহিস ছাড়া এ কাজ তার পক্ষে অসম্ভব। ঘোড়াটা এমনিতে নিরীহ, কিন্তু কিছুতেই মুখ খুলবে না। আর মুখ না খুললে লাগামও লাগানো যাবে না।
অনেকক্ষণ চেষ্টার পর সনাতনবাবু ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। কৌতূহলী জনতাও আস্তে আস্তে কেটে পড়ল, শুধু কয়েকজন তখনও দাঁড়িয়ে। সনাতনবাবু খুব মাথা খাটিয়ে অবশেষে ঘোড়াটার মুখের সামনে আস্তে আস্তে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও মধ্যমার সাহায্যে ছোট ছোট তুড়ি দিতে লাগলেন। যে কয়েকজন তখনও উপস্থিত ছিল তারা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে গেল যে, সনাতনবাবু সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছেন। তারা কেউ সনাতনবাবুকে বুঝতে পারল না, সে বুদ্ধিই তাদের নেই। এই আশায় সনাতনবাবু তুড়ি দিয়ে চললেন, যে তুড়ির শব্দে ঘোড়াটা যদি একবার হাই তোলে, সঙ্গে সঙ্গে লাগামটা মুখে গলিয়ে দেবেন।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ময়দানে ঘন হয়ে এল। সনাতনবাবুর হাতের বুড়ো আঙুলে ফোঁসকা পড়ে গেল, আশ্বিন মাসের আকাশের নীচে মেয়ো রোডের কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় কলকাতার শেষ অশ্বারোহী বাঁ হাতে লাগাম ধরে ডান হাতে অক্লান্ত, অনবরত ঘোড়ার মুখের সামনে তুড়ি দিয়ে চললেন।
সঞ্চয়িতা
জয়গোপালের সঙ্গে আমার পরিচয় সে প্রায় বছর পাঁচেক হয়ে গেল। এই পাঁচ বছরে অনেক। দেখেছি এবং জয়গোপাল সম্পর্কে আমার ভীতি ক্রমশ বেড়ে গেছে। আসলে জয়গোপাল ভারি অমায়িক, নিরীহ ছেলে, কোনও দোষ নেই, বিনয়ী, বিদ্বান, মিতব্যয়ী।
