দু-একদিনের মধ্যেই অবশ্য অনিবার্যভাবে, পরবর্তী চিন্তা মাথায় এল তার। প্রথম সমস্যা, ঘোড়া কোথায় পাওয়া যাবে? দ্বিতীয় হল, ঘোড়ার জন্য লাইসেন্স লাগবে কিনা?
এই দুই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সনাতনবাবু অসুখ ভাল হওয়ার পরে আরও তিন সপ্তাহ ছুটি বাড়িয়ে নিলেন। প্রথমটির সমাধান তিনি নিজেই করলেন। একদিন বেড়াতে বেড়াতে শেয়ালদা গিয়ে ছ্যাকড়া গাড়ির কোচোয়ানদের কাছে আলাপ-আলোচনা করে জানতে পারলেন, কাটিহারের কাছে এক হাটে ভাল ঘোড়া পাওয়া যাবে। একজন বুড়ো গাড়োয়ান বলল, দার্জিলিং-এ ভাল টাটু-ঘোড়া পাওয়া যায়, দামও খুব কম।
কিন্তু দার্জিলিং কিংবা কাটিহার থেকে কে নিয়ে আসবে ঘোড়া? অবশেষে একজন সৎ পরামর্শ দিল, এই খিদিরপুরের গোহাটাতেই একবার খোঁজ করে দেখুন না, ভাল ঘোড়া পেয়ে যেতে পারেন হঠাৎ। মোটের উপর, শেয়ালদার সহিস-কোচোয়ান যারা আছে সবাই খুবই খাতির করল সনাতনবাবুকে। বহুদিন তাদের রুজির বাইরের কোনও লোক তাদের কাছে ঘোড়া সম্বন্ধে এত খোঁজখবর করেনি।
সহিসেরা খুব খুশি হল বটে, কিন্তু আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীদের নিয়ে খুব বিপদ হল সনাতন সরকার মশায়ের। বিশেষ করে যখন তিনি ওই দ্বিতীয় সমস্যা নিয়ে ঘোড়ার লাইসেন্স লাগে কি না…খোঁজখবর শুরু করলেন, সকলের ধারণা হল তার সম্পূর্ণ মাথা খারাপ হয়ে গেছে। অনেকেই বলল, খুব খারাপ ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছিল, আজকাল এরকম খুব হচ্ছে, ব্রেনটা টোটালি ড্যামেজ করে দিয়েছে। যারা একটু অচেনা, তারা অবাক হয়ে গেল, কী বললেন, ঘোড়ার লাইসেন্স? ঘোড়ার লাইসেন্স দিয়ে কী করবেন? ঘোড়ার গাড়ি, ভাড়াটে গাড়ি করবেন? নিজে চড়বেন? ঘোড়ায় চড়ে অপিস যাবেন? কোথায় অপিস, এসপ্ল্যানেডে? হাতিবাগান থেকে এসপ্ল্যানেড ঘোড়ায় চড়ে? দৈনিক দুবেলা?
একটা সামান্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রশ্নের ঝড়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন সনাতনবাবু। এবং দু-একদিনের মধ্যে সনাতনবাবু স্পষ্ট বুঝতে পারলেন–ঘোড়ার অর্থাৎ ঘোড়ার পিঠে কলকাতা শহরের রাস্তায় যাতায়াতের জন্যে ঘোড়া কিংবা তার মালিকের লাইসেন্স লাগে কিনা, অথবা ঘোড়ার পিঠে যাতায়াতে এই শহরে কোনও বাধানিষেধ আছে কিনা এই প্রশ্নটি খুব সোজা নয়। এর উত্তর কেউ জানে কিনা তার রীতিমতো সন্দেহ হতে লাগল।
সনাতনবাবু সর্বপ্রথমে লালবাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা ডি. সি. ট্রাফিকের অফিসে পাঠালেন। ট্রাফিক অপিসে সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি কোনও পাঁচ আইন ভঙ্গের মামলার তদ্বিরে এসেছেন, যখন শুনল, ঘোড়া, সঙ্গে সঙ্গে তারা তাকে কর্পোরেশন দেখিয়ে দিলেন।
সনাতনবাবু কর্পোরেশনে গেলেন। সেই অপিসটি একটু অন্যরকম, কোথায় অনুসন্ধান করতে হবে সেটা জানতেই তার তিন দিন গেল। অবশেষে লাইসেন্স সেকশনে যেতে বললেন এক ভদ্রলোক। সেখানে গিয়ে একটু খোঁজ করতেই গো-মহিষ এবং সারমেয় শাখার পাশে অশ্ব-অশ্বেতর শাখা খুঁজে পেলেন। সেখানে সবাই বলল, হ্যাঁ, ঘোড়ার লাইসেন্স তাঁরা অনায়াসে দিতে পারেন, কিন্তু ঘোড়ায় চড়ার লাইসেন্স এ-বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। এখান থেকে সেরকম কিছু দেওয়া হয় না–এখানেই এক ভদ্রলোক সনাতনবাবুকে পরামর্শ দিলেন, একবার রেসকোর্সে গিয়ে টার্ফ ক্লাবে খোঁজ করে দেখুন। টার্ফ ক্লাবের লোকেরা বললেন, আমাদের ঘেরা মাঠে ঘোড়দৌড়ের লাইসেন্স আছে। তারা ফাইল খুলে সনাতনবাবুকে সব লাইসেন্স-সার্টিফিকেট দেখালেন, তারা কী ভেবেছিলেন কে জানে, বোধহয় তাকে কোনও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরের লোক, কর কিংবা লাইসেন্স ফাঁকির ব্যাপার নিয়ে তদন্ত করতে এসেছেন বলে ধরে নিয়েছেন। খুব ভদ্রতা করলেন, চা-জলখাবার খাওয়ালেন কিন্তু কিছুতেই বলতে পারলেন না কলকাতা শহরের রাস্তায় ঘোড়ায় চড়ে যেতে কোনও লাইসেন্স লাগবে কিনা?
সনাতনবাবু নাছোড়বান্দা প্রকৃতির লোক, তার ওপরে বে-আইনি কাজ করতে ভয় পান। বিনা লাইসেন্সে রাস্তায় ঘোড়া চড়া আইনসঙ্গত কিনা এটা তাকে জানতেই হবে।
এবার তিনি নিজে থেকেই গেলেন মাউন্টেড পুলিশের দপ্তরে। ওরা তো মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করে, ওরা জানতে পারে। মাউন্টেড পুলিশের দপ্তরে একদিন সন্ধ্যার দিকে সনাতনবাবু উপস্থিত হয়ে হাতের কাছে একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সার্জেন্ট পেয়ে সেই সাহেবকে তার হাতিবাগানি ইংরেজিতে সমস্যাটা যথাসাধ্য বোঝাবার চেষ্টা করলেন। সাহেব চোখ গোল গোল করে সব শুনে কী বুঝল কে জানে, শুধু একবার হাউ ফানি বলে, পাশেই একটা দশ ফুট উঁচু ওয়েলার ঘোড়া ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছিল, তার পিঠে সনাতনবাবুকে ঠেলে তুলে দিতে গেল। সনাতনবাবু কোনও ক্রমে তার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচলেন।
কিন্তু তাতে সমস্যার কোনও সমাধান হল না। একটা সামান্য খবরের জন্য তিনি দিনের পর দিন অপিসে অপিসে দরজায় দরজায় ঘুরতে লাগলেন। সবকটা দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজে প্রশ্নবোধক চিঠি পাঠালেন। কিন্তু তারা কেউ তাঁর চিঠি ছাপালেন না।
বাধ্য হয়ে সনাতনবাবু মুখ্যমন্ত্রী, লাটসাহেব এবং প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি তার সমস্যার দিকে আকর্ষণ করিয়ে পত্র দিলেন। কিছুদিন পরে রাইটার্স বিল্ডিং থেকে উত্তর এল, তার আবেদন উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের জন্য পরিবহন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পরিবহন দপ্তর তাঁকে টুরিজম দপ্তরে পাঠালেন। সেখান থেকে খোঁজ করে জানলেন তাকে পশুপালন দপ্তরে যেতে হবে, সেখান থেকে বন-বিভাগ, সেখান থেকে কেন্দ্রীয় পর্যটন বিভাগ, সেখান থেকে আবার পশু-বিভাগ, তবে এবার পশুপালন নয়, পশু-চিকিৎসা বিভাগ, সনাতনবাবু ক্রমাগত ঘুরতে লাগলেন, আরও দুমাস ছুটি বাড়িয়ে নিলেন।
