একটু আগে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন মেঘলাল। পুরোহিত এখনও আসেনি। লোকজন, অতিথি অভ্যাগতও বেলার দিকে আসবে। একটু আগে বারান্দায় মহামায়া ছিল, কিন্তু এখন তাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
মেঘলাল ভাবলেন, বোধহয় উঠোনের ওদিকটায় পুরনো পেঁকিঘরের দরজায় সিঁদুরচন্দন লাগাতে গেছে। একটু সাবধান করতে হবে। গরমের দিন। ওদিকে আবার সাপ আছে।
বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে মেঘলালবাবু দেখলেন মহামায়া উঠোনের চারপাশে, ঘরের ছাদে, গাছের ডালে চারপাশে তাকাচ্ছে। তারপর হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে মেঘলালবাবুকে দেখে আকুল কণ্ঠে বলল, জামাইবাবু, কী হবে?
চিন্তিত হয়ে মেঘলালবাবু বললেন, কেন কী হয়েছে?
মহামায়া বলল, ভারী অমঙ্গুলে ব্যাপার হয়েছে, মাত্র একটা শালিক দেখে ফেললাম। বলে গোয়ালঘরের চালে বসা একটা শালিককে আঙুল দিয়ে দেখাল। মেঘলালও চোখ দিয়ে চারদিকে খুঁজে দেখলেন দ্বিতীয় কোনও শালিক নজরে আসছে না। অবশ্য রান্নাঘরের পিছনে একটা বহু প্রাচীন কঁকড়া গাছ আছে। তার ডালপাতার ভিতরে বহুরকম পাখি কিচমিচ করছে, যার মধ্যে নিশ্চয় শালিকও আছে। তবে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।
০৩.
একটি শালিক অমাঙ্গলিক
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
বাঙালি মাত্রেই একথা অবশ্য জানেন যে একটা শালিক হঠাৎ দেখে ফেলা খুবই অমঙ্গল ব্যাপার। বাঙালি কবি এ বিষয়ে কবিতা পর্যন্ত লিখেছেন।
একটি শালিক দৃষ্টিপথে আসা মানেই চরম দুর্ভাগ্যের ইঙ্গিত পাওয়া, খুঁজে পেতে যেভাবে হোক দ্বিতীয় শালিকটির দেখা না পেলে এই অমঙ্গলের হাত থেকে পরিত্রাণ নেই।
এই ব্যাপারটা মেঘলালবাবু জানেন। আর হেমছায়া আর মহামায়া দুজনেরই এ ব্যাপারে সংস্কার অতি প্রবল, পিত্রালয় থেকে পেয়েছে।
একটা শালিক দেখে দেখে এবং হাজার চেষ্টা করেও দ্বিতীয় শালিক দেখতে না পেয়ে হেমছায়া বেশ কিছুদিন হল ঘরের বাইরে উঠোনে বা গাছপালায় দৃষ্টিপাত করে না।
কিন্তু আজ এই অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য প্রভাতে গোল বাধাল মহামায়া। বহু খুঁজে দ্বিতীয় শালিকটির সন্ধান না পেয়ে জামাইবাবুর কাছে এসে ব্যাকুল চোখে আবার বলল, কী হবে জামাইবাবু?
জামাইবাবু মেঘলাল চক্রবর্তী সামান্য লোক নন। তাঁর ধমনীতে তালুকদারের রক্ত রয়েছে। তিনি শ্যালিকাকে বললেন, দাঁড়াও। বলে শোয়ার ঘরের মধ্যে গিয়ে বড় কাঠের আলমারিটা খুলে। বহুকালের পুরনো একটা গাদা বন্দুক বার করে আনলেন। তারপর বন্দুকের নলটা শূন্যে মুখ করে। একটা ফঁকা আওয়াজ করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাচীন কাঁঠাল গাছ থেকে এবং আশপাশের থেকে অসংখ্য পাখি কিচমিচ, কিচির মিচির কা-কা ইত্যাদি নানারকম চেঁচামেচি করতে করতে দ্রুত বেগে বেরিয়ে উড়তে উড়তে বিভিন্ন দিকে চলে গেল।
এই পাখির দলের মধ্যে অন্তত দশটা শালিক।
মহামায়ার অমঙ্গল ভঙ্গ হল।
পাখিদের চিৎকার চেঁচামেচি মিটে যাওয়ার পরে মেঘলাল মহামায়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কলকাতায় বউবাজারের শ্বশুরবাড়িতে জোড়া শালিক দেখতে পাও?
মহামায়া বলল, আমাদের ওদিকে কোনও শালিক নেই। একটা শালিক দেখে যেমন অমঙ্গল হয়। আবার জোড়া শালিকের সৌভাগ্যও মেলে না।
বলা বাহুল্য, জামাইবাবু মেঘলাল চক্রবর্তী শ্যালিকার এই দুঃখের সমাধান করেছেন। মহামায়ার যাতে নিয়ত সৌভাগ্য সূচিত হয় সেই জন্যে শেয়ালদা রথের মেলা থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দপ্তরের দৃষ্টি বাঁচিয়ে একটি খাঁচা সুদ্ধ এক জোড়া শালিক পাখি কিনে শ্যালিকাকে গত মাসে উপহার দিয়ে এসেছেন।
কিন্তু আজ সকালের শালিক নিয়ে বেশ সুখেই ছিল কিন্তু পাখি দুটোকে গতকাল স্নান করাতে গিয়ে দুটোরই গা থেকে রং উঠে গিয়ে ধূসর রং বেরিয়েছে। স্নানের পর পাখি দুটো দেখে মহামায়ার। শাশুড়ি বলেছেন, এ দুটো ছাতারে পাখি।
চিঠিটা পড়ার পর বাংলা অভিধান খুলে মেঘলালবাবু দেখলেন ছাতারেও শালিকজাতীয় পাখি। কোথাও কোথাও এই পাখিকে ভাটশালিক বলে।
মহামায়াকে এই কথা মেঘলালবাবু জানালেন। তবে শালিকের জায়গায় ভাটশালিক, জোড়া ভটশালিক কতখানি মঙ্গলজনক হবে সে বিষয়ে জামাইবাবু কোনও ভরসা দিতে পারলেন না।
শেষ অশ্বারোহী
জুলাই মাস নাগাদ একটা বর্ষা ভাল করে পেরোবার আগেই যখন পর পর তেরোটা ওয়াইপার চুরি গেল, সনাতন সরকার স্থির করে ফেললেন, আর গাড়ি নয় এবং সত্যি সত্যিই সাত দিনের মধ্যে জলের দামে গাড়িটা বেচে দিলেন।
গাড়িটা বেচে তার বিপদ কিন্তু আরও বাড়ল। থাকেন হাতিবাগানের কাছে। অপিসের সময় সেখান থেকে ট্রামে-বাসে ওঠা যায় না, মিনিবাস কিংবা ট্যাকসির নাগাল পাওয়া অসম্ভব। পঞ্চাশ বছর বয়স হয়েছে সনাতনবাবুর, সারাজীবন নিজের গাড়িতে অপিসে যাতায়াত করেছেন, এখন এই শেষবয়েসে নাকালের একশেষ।
দু-একদিন হেঁটে যাতায়াত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার ধাক্কায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে শয্যাশায়ী হয়ে রইলেন পনেরো দিন। রোগশয্যায় নিজের ঘরে চুপ করে শুয়ে বসে অবশেষে চিন্তাটা মাথায় এল তার, একটা ঘোড়া কিনলে কী রকম হয়? সেই কবে ছোটবেলায় পড়েছেন হর্স ইজ এ নোবল অ্যানিম্যাল–রোগশয্যায় ঘোড়ার কথা চিন্তা করতে করতে তিনি উত্তেজিত হতে লাগলেন। কত সুবিধে, গ্যারেজের দরকার নেই, প্যাসেজে বেঁধে রাখো, পার্কিং ফি নেই, পেট্রোল-মবিল লাগবে না, একটু ছোলা আর ঘাসজল হলেই হবে, তাও তিনি ঠিক করলেন বিকেলে অপিস থেকে ফিরবার পথে ময়দান হয়ে একটু ঘাস খাইয়ে আনাও চলবে, এবং সবচেয়ে বড় কথা ঘোড়ার পার্টস চুরি যাবার কোনও ভয় নেই, চুরি গেলে আস্ত ঘোড়াটা চুরি যেতে পারে, কিন্তু সে প্রায় অসম্ভব, ঘোড়াচোর এখন দেশে আর না থাকাই সম্ভব, অন্তত কলকাতায় তো নেই-ই।
