মহামায়া এবং হেমছায়া দুজনায় পিঠোপিঠি বোন না হলেও প্রায় একই আদলের। উচ্চতা গায়ের রং সবই প্রায় এক রকম। তফাত শুধু এইটুকু যে হেমছায়া একটু থেমে থেমে ভেবেচিন্তে কথা বলে, তার আবেগ-অনুভূতি একটু চাপা।
এদিকে মহামায়া দিদির একেবারে বিপরীত। সে খিলখিল করে হাসে, গমগম করে রাগ করে, তেমন অঘটন ঘটলে ঝিরঝির করে চোখের জলে ভাসে।
দুই বোনের এই পার্থক্য নিতান্ত ব্যক্তিগত। পুরোপুরি মন মেজাজের ব্যাপার। কিন্তু চেহারা এবং চালচলনের দিকটা চোখে পড়ার মতো।
নিজের বিয়ের পরে প্রথম প্রথম মেঘলাল এদিকটায় খুব নজর দেননি, সে অবকাশও ছিল না কারণ তখন তার পুরো নজর হেমছায়ার ওপরে।
তবে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একদিন আকর্ষণ কমে যায়, তখন মেঘলাল আবার চার পাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। মেঘলাল দুশ্চরিত্র বা সাদা কথায় যাকে বলে লম্পট তা নন, সুতরাং তার বিপথগামী হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। শুধু বিবাহিতা স্ত্রীর প্রতি মনোযোগ একটু হ্রাস পেল।
এই সময় মহামায়া বড় হচ্ছে। শ্বশুরালয়ে গেলে কিংবা যখন মহামায়া দিদির কাছে বেড়াতে আসত মেঘলাল শ্যালিকাকে দেখতে পেতেন। তার চোখের সামনে সাধের শ্যালিকা পল্লবিতা, কুসুমিতা হয়ে উঠল। হেমছায়া বেশ সুন্দরী। মহামায়াও ভাল দেখতে, তবে সেই সঙ্গে তার নবযৌবনের চটক ছিল।
দু বোনই প্রায় এক রকম দেখতে, আকারে-প্রকারে সুতরাং দূর থেকে দেখে কিংবা অন্যমনস্কভাবে মেঘলাল অনেক সময় ক্ষণিকের জন্যে দুজনকে গুলিয়ে ফেলতেন।
মেঘলালের এই সমচেহারায় স্ত্রী ও শ্যালিকাকে গুলিয়ে ফেলার কথা আগে কোথায় যেন লিখেছি। কিন্তু এই শালিক ও শ্যালিকা নামক গল্পে বিষয়টি এড়িয়ে গেলে অন্যায় হবে।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখনও অনুপমের সঙ্গে মহামায়ার বিয়ে হয়নি, বোধহয় কথাবার্তাও চলছে না। সেই সময়ে একদিন, বোধহয় সেটা কোনও ছুটির দিন ছিল, মহামায়া দিদির কাছে বেড়াতে এসেছে।
বিকেলবেলা বাইরের বারান্দায় বসে মেঘলালবাবু দুজন সহকর্মীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। দুজনই বয়েসে মেঘলালের থেকে একটু ছোট। মেঘলালের সঙ্গে একই ইস্কুলে মাস্টারি করে।
বাড়ির মধ্যে থেকে হেমছায়া বোনের হাত দিয়ে বারান্দার আড্ডায় চা পাঠিয়ে দিল। মফস্সলের বিকেলে তখন একটু আবছায়া ভাব। চায়ের ট্রে হাতে মহামায়া বারান্দায় আসতেই মেঘলালের তরুণ বন্ধুদ্বয় তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। মেঘলাল ব্যাপারটা অনুমান করে দুজনাকেই বসতে বললেন, তারপর বললেন, কাকে দেখে উঠে দাঁড়াচ্ছ? ইনি তোমাদের বউদি নন, বউদির ছোট বোন।
দুজনারই তখন বেশ অপ্রস্তুত অবস্থা। মহামায়াও লজ্জায় মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বাড়ির মধ্যে চলে গেল। কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে থাকার পরে এদের মধ্যে একজন বলল, আমরা তো বউদি ভেবে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। একটু জব্দই হয়ে গেলাম।
মেঘলাল বলেছিলেন, সাহেবরা মহিলা এলেই উঠে দাঁড়ায়। তোমরাও সাহেবি আচরণ করছ।
যেমন হয়, চা খেতে খেতে এরা আবার কৌতূহলী হয়ে উঠল, আচ্ছা, বউদি আর বউদির বোন দুজনে একই রকম দেখতে।
মেঘলাল স্বীকার করলেন, ঠিক এক রকম না হলেও, অনেকটাই একরকম।
সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন হল, আপনার অসুবিধে হয় না?
প্রশ্নটা বুঝতে পেরেও একটু হেসে মেঘলাল প্রশ্ন করলেন, কীসের অসুবিধে?
এবার আসল জিজ্ঞাসা এল। মেঘলালদা, আপনি চট করে আলাদা করে বুঝতে পারেন কে সত্যি সত্যি বউদি। আর কে বউদির ছোট বোন?
মেঘলাল মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, চট করে আলাদা করে বোঝার খুব একটা চেষ্টা করি না। প্রয়োজনও বোধ করি না।
এই প্রয়োজনীয় পুরনো ব্যাপারটি পুনরুল্লেখ করলাম নিতান্ত গল্পের খাতিরে। এরপরেও যদি গল্প না জমে সে দোষ আমার নয়, পাঠিকা ঠাকুরানি বুঝুন বা না বুঝুন সম্পাদক মহোদয় অবশ্যই বুঝতে পারছেন যে আমি চেষ্টার কোনও ত্রুটি করছি না।
সুতরাং এবার বর্তমান সময়ের সমীপবর্তী হচ্ছি। সেই যেখানে আমরা এই গল্পটাকে ফেলে এসেছিলাম, সেই বসন্তশেষ, নবগ্রীষ্মের বিহ্বল দিন, মহামায়ার বর অনুপম গেছে পাহাড় জয় করতে। মহামায়ার মনের যা অবস্থা আগেকার দিন হলে সে পাহাড়কে সতীন বলে ধরে নিত।
কিন্তু মহামায়া গ্রামের মেয়ে হলেও, মোটেই গ্রাম্য নয়। দু-চারটি প্রাচীন পাড়াগেঁয়ে সংস্কার হয়তো তার মনের মধ্যে আছে। কিন্তু একথাও মনে রাখা উচিত সে মাধ্যমিকে অঙ্কে আর জীববিজ্ঞানে লেটার পেয়েছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে তার বিদ্যালয়ের মেয়েদের মধ্যে সেই একা গ্রেস ছাড়া ইংরেজিতে পাশ করেছিল।
কিন্তু লেখাপড়ার কথা নয়। এসব নীরস ব্যাপারে গিয়ে লাভ নেই। বরং এবার আমরা শ্রীমতী মহামায়াকে একটু ভাল করে নিরীক্ষণ করি। মেঘলালবাবুর দৃষ্টিতে তাকে একটু পর্যবেক্ষণ করা যাক।
দিদি হেমছায়ার বাড়িতে এবার মহামায়া এসেছে উৎসব উপলক্ষে। আজ অক্ষয় তৃতীয়া। এ বাড়িতে খুব ধূম।
ওই মহামায়া আসছে। তার হাতের থালায় রুপোর বাটি, লম্বা প্রদীপ। চন্দন আর সিঁদুরের দুটো রুপোর বাটি থেকে শোয়ার ঘরের, বাইরের ঘরের, রান্নাঘরের, গোয়ালঘরের দরজায় দরজায় নিপুণ তর্জনী ফোঁটা দিচ্ছে।
সালংকারা, সযৌবনা, বেনারসি পরিহিতা শ্যালিকাকে বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে পর্যবেক্ষণ করতে করতে মেঘলালের আগের দিনের বিকেলের কথা মনে পড়ছিল। যখন মহামায়াকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে নিয়ে সে এসেছিল সেই সময়কার ঘনিষ্ঠ শিহরনের কথা মনে পড়ছিল।
