অবশ্য জামাইবাবুরা শেষ হয়ে যাওয়ার ঢের আগে এই মধুর সম্বোধনটি প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল। নব্য যুগের আধুনিকা শ্যালিকাগণ জামাইবাবু না বলে দাদা বলা শুরু করেছিল। খগেনদা, বলরামদা, কপোতাক্ষদা, ইত্যাদি। অন্যদিকে আজিজ-মফিজকে যারা দুলাভাই বলত তারা হঠাৎ আলোকপ্রাপ্তা হয়ে জামাইবাবুদের আজিজ ভাই, মফিজ ভাই বলতে লাগল। ৪২৪
এই সাবালিকা ও নাবালিকাদের কেউ কোনওদিন বোঝানোর চেষ্টা করেনি জামাইবাবু দাদা কিংবা ভাই নন, সহস্র বর্ষের সখী সাধনার ধন।
সে যা হোক, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, আমাদের এই ক্ষুদ্র কথিকার জামাইবাবুর নাম মেঘলাল চক্রবর্তী এবং সৌভাগ্যক্রমে মেঘলালবাবু শুধুই জামাইবাবু, দাদা কিংবা ভাই নন।
প্রায় দশ বছর হল মেঘলালবাবু বিয়ে করেছেন, যথারীতি সম্বন্ধ করে, পাত্রী দেখেশুনে যাচাই করে। মেঘলালবাবু বসবাস করেন হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনের হুগলি জেলার একটি পরিচিত রেল স্টেশনের থেকে মাইল পাঁচেক ভিতরের দিকে একটি পুরনো বর্ধিষ্ণু গ্রামে।
গ্রামের নাম হরিশপুর। পাশের গ্রামে একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেঘলালবাবু শিক্ষকতা করেন। তার একটি স্কুটার আছে, স্কুটারেই যাতায়াত করেন। প্রয়োজনে হাওড়া-কলকাতা পর্যন্ত স্কুটারে আসেন।
তবে স্কুল শিক্ষকতাই মেঘলালবাবুর একমাত্র বা মূল জীবিকা নয়। তিনি প্রাক্তন জোতদার বংশের সন্তান। এখনও কিঞ্চিৎ ধানজমি আছে, সম্বৎসরের খোরাকি চলে যায়। আরও জমিজমা ছিল, সেগুলো যথাকালে হস্তান্তর করেছেন। এখন আসল ব্যবসা বাজারের পাশে একটা টিনের আটচালা ঘরে ভিডিও পারলার।
তবে মেঘলালবাবু বেআইনি কিছু করেন না। তাঁর সরকারি লাইসেন্স আছে, স্থানীয় থানাতেও যথারীতি মাসোহারা দেন। অশ্লীল বা নীল বই ফাঁকে-ফুরসতে দেখানো হয় না এমন কথা নিশ্চয়ই করে বলা যাবে না, তবে বাজার চালু হিন্দি সিনেমার ক্যাসেটই সাধারণত দেখানো হয়। সেও কম উত্তেজনাপ্রদ নয়।
মেঘলালবাবুর স্ত্রীর নাম হেমছায়া। হেমছায়ারা দুই বোন, এক ভাই। হেমছায়াই বড়। পরের ভাই গণনাথ নাসিকে টাকার কারখানায় কাজ করে। সবচেয়ে ছোট মহামায়া। আমাদের মেঘলালবাবুর একমাত্র শ্যালিকা।
মেঘলালবাবুর শ্বশুরবাড়ি আরও দু স্টেশন দূরের ভিতরের দিকের একটা গ্রামে। মেঘলালবাবুর বিয়ের সময় গণনাথের বয়স আঠারো-উনিশ। মহামায়া চোদ্দো-পনেরো বছরের নাবালিকা, স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে।
শুধু ছোট শ্যালিকা বলে নয়, একমাত্র শ্যালিকা বলেও মেঘলালবাবু মহামায়াকে খুব স্নেহ করেন। মেঘলালবাবুর নিজের কোনও বোন নেই, কয়েকটি অপোগন্ড ভাই আছে, এদিক ওদিক করে বেড়ায়। আগে মহামায়া ছুটি-ছাটায় জামাইবাবুর বাড়িতে এলে তারা তাকে খুব বিরক্ত করত। এখন আর অবশ্য সেরকম ঝামেলা নেই, বছর দুয়েক হল মহামায়ার বিয়ে হয়ে গেছে।
মহামায়ার বিয়ে হয়েছে কলকাতায়। তার বর অনুপম কাজ করে একটা কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে। চারপুরুষের বসবাস কলেজ স্ট্রিট-বউবাজার অঞ্চলে। ছেলেটি এমনিতে চমৎকার; কথাবার্তা, চালচলন, লেখাপড়া সবাই ভাল। কিন্তু এই অনুপমের একটি মহৎ দোষ আছে, সে সুদূরের পিয়াসী।
অনুপম, গিরিবান্ধব সমিতির অবৈতনিক সম্পাদক। পাহাড় বলতে সে অজ্ঞান। সমতল কলকাতায় ইট-কাঠের জঙ্গলে জন্মে এবং বড় হয়ে পাহাড়ের প্রতি তার এই আকর্ষণ কী করে জন্মাল সেটা বলা কঠিন।
প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল পড়তে না পড়তে, কলকাতার রাস্তায় পিচ গলে যাওয়ার অনেক আগে, যখন পাহাড়তলির আমের গাছে মুকুল ঝরে গিয়ে সবে গুটি এসেছে, গিরিবনে সদ্য কোকিলের ডাক শুরু হয়েছে সেই মুকুলের ঘ্রাণ না পেয়েও, সেই ডাক না শুনেও অনুপমের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। গিরিবান্ধব সমিতির সদস্যেরা আবার পাহাড়ে যাওয়ার তাল করতে থাকে।
তারপর সঙ্গীসাথী জুটিয়ে কোনও এক শুভদিনে কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে এবং শুভার্থী কোনও মন্ত্রী বা আমলা মহোদয়ের পরিয়ে দেওয়া গাঁদা ফুলের মালা গলায় পরে অনুপমেরা বেরিয়ে পড়ে, লোটা কম্বল, টর্চ-অক্সিজেন, কুড়ুল-গাঁইতি, তাঁবু-দড়ি এইসব নিয়ে।
শ্রাবণ বা চৈত্রসংক্রান্তির রঙিন কাপড় পরে তারকেশ্বর যাত্রার মতো প্রায় ব্যাপার। কয়েক সপ্তাহ ধরে অনুপমেরা একের পর এক পাহাড় ডিঙিয়ে যায়। এ এক মারাত্মক নেশা।
বিয়ের প্রথম বছরে নতুন বউ কী ভাবতে পারে ভেবে কিংবা হয়তো প্রণয়ের আধিক্যবশত অনুপম পাহাড়ে চড়তে যায়নি। তারপর সারা বছর সে নিজেই শুধু হা-হুঁতাশ করেছে তা নয়, গিরিবান্ধব সমিতির বন্ধুবান্ধবেরাও তাকে প্রচুর টিটকিরি দিয়েছে।
তাই এ বছর অনুপম প্রাণের টানেই হোক কিংবা বিদ্রুপের ভয়েই হোক গিরিলঙ্ঘনে শামিল হয়েছে। তবে যাওয়ার আগে মহামায়াকে সে ছোট একটি উৎকোচ দিয়েছে। মধ্য কলকাতার ঘিঞ্জি গলির চার দেওয়ালে বন্দি শ্বশুরবাড়ির নিগড়মুক্ত করে তাকে পিত্রালয়ের খোলামেলা পাখিডাকা, ছায়াভরা পরিবেশে রেখে গেছে। বসন্ত শেষে নবগ্রীষ্মের দিনের পল্লীগ্রাম এখনও মনোরম।
পাহাড় জয় করে অনুপমদের ফিরে আসতে সপ্তাহ পাঁচেক লাগে। এই পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে দেড় সপ্তাহ বোনের বাড়িতে কাটিয়ে আগের দিন মহামায়া দিদি হেমছায়ার কাছে এসেছে। আগের মতোই জামাইবাবু মেঘলাল গিয়ে তাকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে নিয়ে আসছে। বিয়ের আগে মহামায়া বহুবার এ গাড়িতে এসেছে। মেঘলালবাবু জামাইবাবু হিসেবে উৎকৃষ্ট শ্রেণীর, প্রিয়তমা শ্যালিকার আদর-আপ্যায়ন যত্ন-তদ্বিরে কখনও কোনও ত্রুটি হয়নি।
