উদ্ধার করলেন হারাধন সারকেল। সাহেবকে এলাকা দেখিয়ে ফেরার পথে হারাধন দেখেন যে বদরপুরের মাঠের পাশে লালমোহন তখনও দাঁড়িয়ে।
লালমোহন তখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। হাইওয়ের ওপর খোলা আকাশের নীচে অঝোর বৃষ্টিতে অসহায়ের মতো ভিজছে।
স্যার, আমাদের একটি ছেলে এই দুর্যোগে এখানে ডিউটি করছে, ওকে তুলে নিয়ে যাই। বড়সাহেবকে এ কথা বলে হারাধন ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন লালমোহনের পাশে গাড়ি দাঁড় করাতে।
দরজা খুলে ডাকতে লালমোহন আচ্ছন্নের মতো গাড়িতে উঠে এল, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসল। তার শরীরের আর জামাকাপড়ের জলে গাড়ির সামনের সিটটা ভিজে গেল।
.
পেছনের সিটে বড়সাহেবকে সে লক্ষ করেনি। নতুন বড়সাহেবকে চেনেও না। গাড়ি চলতে শুরু করলে হারাধনবাবু কিঞ্চিৎ স্নেহময় গঞ্জনার সুরে লালমোহনকে বললেন, ডবল নিমুনিয়া হয়ে যাবে। তোমার উচিত ছিল বৃষ্টি আসামাত্র একটা গাড়ি ধরে বাড়ি ফিরে যাওয়া।
বড়সাহেব বললেন, এই দুর্যোগেও লোকটি ডিউটি করছিল, এরকম কর্তব্যপরায়ণতা আজকাল বিরল।তারপর একটু থেমে হারাধনকে বললেন, সি আই সাহেব, কাল অফিসে এর নামটা আমাকে একটু মনে করিয়ে দেবেন।
কিন্তু তখনই হারাধন কোনও রকম বাধা দেওয়ার আগেই লালমোহন বললেন, আমি কি বাড়ি ফেরার কম চেষ্টা করেছি। কিন্তু যেই গাড়ি থামাতে হাত বাড়াই, হাতের মধ্যে একটা পাঁচ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে গাড়ি ভেগে যায়। দেখুন না অবস্থা, প্যান্ট ও শার্টের পকেট থেকে বের করে ভেঁড়া, ময়লা পাঁচ টাকার শতশত ভেজা নোট লালমোহন গাড়ির সামনের সিটে রাখতে লাগল।
বড়সাহেব বললেন, এ তো দেখছি সৎও খুব, ঘুষের টাকা নিজে থেকে বের করে দিচ্ছে।
সুযোগ বুঝে হারাধন বললেন, স্যার, এর একটা কেস আপনার টেবিলে আছে।
বড়সাহেব বললেন, কাল অফিসে মনে করিয়ে দেবেন।
সামনের সিটে বসে লালমোহন তখনও শীতে-ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে।
শালিক ও শ্যালিকা
০১.
সম্রাট শালিবাহন..
শিবরাম চক্রবর্তী
শিবরাম চক্রবর্তীকে মনে আছে? সেই যে মহর্ষি শিবরাম চক্রবর্তী।
অনেকদিন আগের কথা, সে আমাদের হারিয়ে যাওয়া অমল কৈশোরের কথা। সত্যযুগ না হলেও, সে প্রায় ক্রেতা-দ্বাপরের কথা। তখন টাকায় চার-পাঁচ সের চাল পাওয়া যেত, তিন-চার সের দুধ। কলকাতা থেকে নৈহাটি রেলভাড়া আট আনা। ঢাকা বরিশাল যেতে দলিল-দস্তাবেজ লাগে না
তখনও বঙ্গজননীর বাম হাতে কমলার ফুল। লোকজন রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানে আলোচনা করে, সুভাষ বসু দুয়েকদিনের মধ্যেই এসে যাচ্ছেন, গত মাসে তাকে সিঙ্গাপুরে দেখা গেছে, কিংবা আগের সপ্তাহে রেঙ্গুন শহরে।
সেই প্রাচীন যুগে মহর্ষি শিবরাম সম্রাট শালিবাহনের কথা লিখেছিলেন। সে গল্প পাঠ করে আমরা হেসে আকুল হয়েছিলাম।
বলা বাহুল্য, শিবরাম ইতিহাসখ্যাত সম্রাট শালিবাহনের কথা লেখেননি। ইতিহাস রসিকতা পছন্দ করে না। সে বড় জবরদস্ত বিষয়।
ইতিহাসের সম্রাট শালিবাহনও জবরদস্ত নৃপতি ছিলেন। শালিবাহন ছিলেন শক বংশের রাজা, সেই যে শকহুণ দলের কথা আছে ভারতভাগ্যবিধাতায়, সেই শক। তিনি শকাব্দ প্রবর্তন করেন যা আজও চলে আসছে। সে প্রায় খ্রিস্টাব্দের সমবয়সি। সবচেয়ে বড় কথা প্রবল-পরাক্রান্ত নরপতি বিক্রমাদিত্যকে শালিবাহন যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন।
.
না। ইতিহাসের রাজা শালিবাহনকে নিয়ে শিবরাম চক্রবর্তী কিছু লেখেননি। লেখার কথাও নয়। রাজা-উজির নিয়ে সময় নষ্ট করার লোক ছিলেন না শিবরাম।
শিবরাম যে সম্রাট শালিবাহনের কথা লিখেছিলেন, তিনি কোনও রাজাগজা ছিলেন না। শ্যালিকাবাহন এক গোলগাল, বিপর্যস্ত জামাইবাবুর কথা লিখেছিলেন শিবরাম।
আমাদের চিরচেনা সেই সেকালের জামাইবাবু, শ্যালিকা পরিবেষ্টিত হয়ে হাঁসফাঁস করে, টালমাটাল হয়ে বারবার হাস্যকর হওয়াই যার অনিবার্য পরিণতি।
আজকাল সংসারে শ্যালক-শ্যালিকার খুব অভাব। সেকালের সেই শালিবাহন জামাইবাবুদের একালে আর বিশেষ দেখা যায় না। তারাও এখন ত্রেতা বা দ্বাপর যুগের জীব।
তবু এখনও যা দু-চারজন আছেন। অল্প কিছু দিন পরে, পরের প্রজন্মে তাও আর দেখা যাবে না। পরিবার পরিকল্পনার প্রকল্পে অদ্বিতীয়-অদ্বিতীয়বার পৃথিবীতে শ্যালক-শ্যালিকাই থাকবে না, জামাইবাবু আসবে কোথা থেকে।
এবং একই কারণে পিসি-মাসি, কাকা-জ্যাঠা, মামাতো-পিসতুতো কিছুই থাকবে না। জামাইবাবুরা থাকবে না।
তুলসী মঞ্চ, আকাশ প্রদীপ, একান্নবর্তী পরিবার ইত্যাদির মতো হারিয়ে যাবেন জামাইবাবুরা। প্রাগৈতিহাসিক ডায়নোসরের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন তারা।
আফসোস করে লাভ নেই। হাসির গল্প লিখতে বসে আফসোসের সুযোগ নেই। আবার এই ছলে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করাও উচিত নয়।
সুতরাং এবার সরাসরি গল্পে প্রবেশ করার কথা ভাবতে হচ্ছে। স্বীকার করা ভাল গল্পটি পুরনো ঢংয়ের এক শ্যালিকা বিহ্বল জামাইবাবুকে নিয়ে। গোলগাল, ঢিলেঢালা ভাল মানুষ জামাইবাবু, হয়তো ইনিই বঙ্গীয় সমাজের শেষ জামাইবাবু। আর, তা না হলেও ইনি শেষ জামাইবাবুদের মানে শেষতম জামাইবাবু প্রজন্মের একজন তো বটেই।
০২.
দেখে শুনে বুঝিলাম
করি তালিকা,
সবচেয়ে ভাল মোর
ছোট শ্যালিকা।
গোলাম মোস্তাফা বেশিক্ষণ ধরে শুধু জামাইবাবু জামাইবাবু করলে চলবে না। জামাইবাবুর নাম বলতে হবে, না হলে গল্প জমবে কী করে।
