দলাই-মালাই থামিয়ে দিয়ে লালমোহন বলল, কিন্তু আমি তো কিছু করিনি স্যার। রোগাভোগা লোকটার বুকে হঠাৎ দুম করে লাথিটাতো আপনিই মারলেন স্যার। আমি তো।…।
লালমোহনকে থামিয়ে দিয়ে হারাধন বললেন, সে তো তুইও জানিস, আমিও জানি কিন্তু একজনকে অন্তত সাসপেন্ড হতে হবে।
লালমোহন বিস্মিত হয়ে দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল, তার মুখ দিয়ে বাক্যস্ফুরণ হচ্ছে না।
লালমোহনকে ব্যাপারটা হজম করার সময় দিয়ে হারাধন বললেন, আমি সাসপেন্ড হতে পারি। কিন্তু তাতে তোরা সবাই যে ধনেপ্রাণে মারা পড়বি। তোদের কে দেখবে?
এতক্ষণে লালমোহন বলল, কিন্তু স্যার সাসপেন্ড হলে খাব কী?
.
এই দুঃখের মধ্যেও হো হো করে হেসে উঠলেন হারাধন সারকেল। লালমোহনকে বললেন, এই বিদ্যা নিয়ে পুলিশের চাকরি করিস। সাসপেন্ড হওয়াই তো সরকারি চাকরির মজা। কোনও কাজ করতে হবে না। মাসে কোনও কাটছাট না করে পুরো মাইনের অর্ধেক হাতে পাবি। তা ছাড়া তুই সাসপেন্ড হলে আমি তোকে দেখতে পারব, আমি সাসপেন্ড হলে সবাই মিলে ভরাডুবি হবে।
তবু লালমোহনের সংশয় যায় না।
হারাধন তাকে বোঝান। সাসপেন্ড হওয়া পুলিশের চাকরিতে ছেলেখেলা। নিজের অতীত জীবনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। গোহাটায় গোলমাল হচ্ছিল, এদিকে তোলাও ভাল উঠছিল না। সে বছর সদর থানায় থাকার সময় দলবলসহ এক গোরুর পাইকারকে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন। তখন কি জানতেন যে ওই লোকটি বিহারের এক এম পি। প্রচুর বেকায়দা হয়েছিল সেবার।
এরকম তিন-চারটে ঘটনা হারাধন লালমোহনকে বললেন। তারপর বললেন, সাসপেন্ড হলেও তোর ব্যবস্থা সব ঠিকই থাকছে। তবে থানার মধ্যে বা কাছাকাছি থাকলে বিপদ হবে, একটু দূরে দূরে থেকে কাজ চালাতে হবে।
কাজটা কী সেটাও হারাধন লালমোহনকে বুঝিয়ে দিলেন। হাইওয়ের পাশে বদরপুরের বিশাল মাঠ। থানা থেকে জায়গাটা পাঁচ-সাত কিলোমিটার দূরে। কাছাকাছি জনবসতি নেই। একপাশে জঙ্গল। মাঠের ওপাশেও ঘন জঙ্গল।
এখানে লালমোহনকে বিশেষ কেউ চিনবে না। চিনলেও সে যে সাসপেন্ড হয়েছে সেটা জানার কথা নয়। সাসপেন্ড হওয়ার পরে এই বদরপুর লালমোহনকে দেওয়া হবে। বাস-ট্রাক-গাড়ি থেকে তোলা যা উঠবে সব তার, কোনও ভাগ দিতে হবে না। সাদা পোশাকে হাতে একটা বেতের লাঠি নিয়ে লালমোহন এখান থেকে টাকা আদায় করবে।
হারাধন সারকেল বললেন, বছর দুয়েকের মাথায় সাসপেনশন উঠে যাবে। তখন দেখবি মনে হবে যে সাসপেন্ড হয়েই তো ভাল ছিলাম।
লালমোহন রাজি হতে সেদিন বিকেলেই সাসপেন্ড হয়ে গেল।
লালমোহনের বিপদ
এবার শীত খুব জমজমাট পড়েছে।
যথারীতি লালমোহন বদরপুরের মাঠে ডিউটিরত। এই এলাকাটা এমনিতেই চরম আবহাওয়ার। যেমন গরম, তেমন ঝড়-বৃষ্টি, তার চেয়েও বেশি শীত।
বিকেলের দিকে জঙ্গলের মধ্যে থেকে একটা উত্তুরে হাওয়া এসে হাড় কাঁপিয়ে দেয়। তা ছাড়া আজ এই মাঘের বিকেলে ঘন মেঘ জমেছে। আকাশের চেহারা সুবিধের নয়।
সেই ঘটনার পর দেড় বছর চলে গেছে।
লালমোহনের সেই সাসপেনশনের কেসের এসপার-ওসপার কিছু হয়নি। ফাইল সদরে কোথায় কোনও ওপরওলার দেরাজে ফিতে বন্দি হয়ে পড়ে আছে। গ্র্যাজুয়েট ক্লিনার ধর্মদাস চক্রবর্তীর পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়েছিল। তারপর সবাই ভুলে গেছে, এরকম কত হয়।
জ্যোতিষীর বাণী সফল করে হারাধন সারকেল কিন্তু প্রমোশন পেয়ে সার্কেল অফিসার হয়ে গেছেন, সেও প্রায় এক বছর হতে চলল।
হারাধন অকৃতজ্ঞ লোক নন। তিনি লালমোহনকে ভোলেননি। তবে এখন আর নিয়মিত খোঁজখবর নিতে পারেন না। সার্কেল অফিসার হওয়ার পর সদরে পোস্টিং হয়েছে তার।
আজ বিকেলে হারাধনবাবু এই জেলায় নবনিযুক্ত এস পি সাহেবকে নিয়ে সফরে বেরিয়েছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যে এই সফর। যেহেতু হারাধনবাবু এই অঞ্চলে আগে দারোগা ছিলেন তাই এস পি সাহেব তাকে সঙ্গে নিয়েছেন।
বিকেলের দিকে তখনও বৃষ্টি নামেনি, হারাধনবাবু লালমোহনকে বদরপুরের মাঠের ধারে লাঠি হাতে ডিউটি করতে অর্থাৎ তোলা আদায় করতে দেখে গেছেন।
পুলিশের গাড়ি দেখে লালমোহন তাঁদের গাড়িটা এড়িয়ে গিয়ে রাস্তার ওপাশে চলে গেছে, অবলা লালমোহন এটা বুঝতে পারেনি যে এ গাড়িতে হারাধন সারকেলও রয়েছে।
সন্ধে হতে না হতে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া।
কাছাকাছি মাথা গোঁজার একটা জায়গা নেই। গাছতলায় একটু সাময়িক আচ্ছাদন পাওয়া গেল। কিছু পরে জলের তোড়ে গাছের পাতা ছুঁড়ে বৃষ্টি পড়তে লাগল, যে সে বৃষ্টি নয়, বরফ জলের ধারাস্রোত।
.
গাছের নীচে থেকে ফঁকা রাস্তার ধারে এসে দাঁড়াল লালমোহন, অতিরিক্ত ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে, দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছে।
সামনে যে গাড়ি আসছে ট্রাক হোক, বাস হোক, প্রাইভেট বা অটো বারবার ছুটে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে লাগল লালমোহন, কোনওরকমে একটু উঠে আস্তানায় ফিরে যাওয়া।
কিন্তু বৃথা চেষ্টা। একটি গাড়িও দাঁড়াল না। যথারীতি তারা লালমোহনের প্রসারিত হাতে একটি করে পাঁচ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে দ্রুত চলে গেছে। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে, ঝোড়ো হাওয়ায় তার কাতর অনুরোধ কোনও গাড়িচালকের কানে পৌঁছয়নি।
