হারাধনবাবু এই একচালা ঘরের মেয়েদের প্রায় নিজের হারেমের রমণীর মতো ব্যবহার করেন। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ওপরওলা বা ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে ভেট দেন। নিজেকেও বঞ্চিত করেন না।
হারাধন ও লালমোহন
সন্ধ্যার পর হারাধন ঘণ্টা দুয়েক নিভৃতে দুয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু বা সাকরেদদের সঙ্গে বেশ কিছু পরিমাণ ভারতে উৎপন্ন বিলাতি মদ্য (I.M.F.L.) পান করেন তারপর স্নান-খাওয়া। অবশেষে মধ্যরাত নাগাদ রোঁদে বেরোন।
দু-চারজন লোককে ভাল করে না পেটালে তার রাতে ঘুম হয় না। লাঠি বা চাবুক নয়, স্রেফ খালি হাতে ঘুষি, চড়; কখনও বুটসুদ্ধ পায়ে সজোরে লাথি; শারীরিক ব্যায়াম ভালই হয়। এ বয়েসে এটুকু ব্যায়াম স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যে প্রয়োজন।
.
এর পরে যেদিন শরীর চায়, প্রমীলাসঙ্গ করতে যান। প্রমীলাসঙ্গ মানে সেটাকে তিনি সরকারি ডিউটির মধ্যে ফেলেন। রীতিমতো ধড়াচূড়া পড়ে, হুইসিল নিয়ে সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে তার নিজেরই একচালা হারেম রেইড করতে যান। দু-চারটে এ পাড়া ও পাড়ার ভদ্রলোক, আধা ভদ্রলোক ধরা পড়ে। তবে তিনি তাদের কিছু বলেন না, ছেড়ে দেন। না হলে, ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে।
এরপরে তিনি পড়েন মেয়েদের নিয়ে। যে মেয়ে যত নতুন আমদানি, তার তত বেশি ঝামেলা। তারা কী আর করবে, ভালবাসার অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে।
তা সহ্য করলে কী হবে গতকাল রাতের ধকল হারাধনবাবুর পক্ষে একটু বেশি হয়েছে। দুদিনের। বাজারে একাধিক আনকোরা মেয়ে এসে গেছে তাই এই বিপত্তি।
এদিকে দুদিন আগে একটা অন্য গোলমাল হয়েছে। একটা ট্রাকের ক্লিনার, অল্পবয়েসি যুবক, সে নাকি বি.এ. পাশ ছিল, অন্য কোনও কাজ জোগাড় করতে না পেরে ট্রাকে কাজ নিয়েছিল। সে ভয়ংকর তাঁদড়, কিছুতেই তোলা দেবে না, বলে কিনা, শুধু শুধু পুলিশকে ঘুষ দেব কেন?
সেই যুবকটি ধর্মদাস চক্রবর্তী তাকে ট্রাক থেকে লালমোহন থানায় নিয়ে এসেছিল। থানায় এসেও ধর্মদাসের তড়পানি কমেনি। তার ওপরে সে বারবার বহুস্বীকৃত এবং ন্যায়সঙ্গত তোলা আদায়কে ঘুষ বলায় হারাধনের মাথায় রক্ত উঠে যায়। হারাধন দৌড়ে এসে প্রায় হঠাৎ ধর্মদাসের বুকে সজোরে লাথি মারেন।
.
দুঃখের বিষয় ধর্মদাস যুবকটি বড়ই কমজোরি ছিল। হতদরিদ্র টুলোপণ্ডিতের বাড়ির ছেলে, টিউশনি করে গ্র্যাজুয়েট, তারপরে চার বছর বেকার, গায়ে গতরে অতীব দুর্বল।
লাথি খাওয়ার পরে সেই যে একবার ক করে চোখ উলটিয়ে থানার মেঝেতে পড়ে গেল ধর্মদাস আর উঠল না। লালমোহন চেঁচিয়ে উঠল সর্বনাশ! কী করলেন স্যার?
ব্যাপারটা এর পরে বেশি দূর গড়ানোর কথা নয়। ঘটনা ঘটেছিল সন্ধ্যার মুখে। আর ঘণ্টাখানেক পরে ডেডবডিটা তুলে নিয়ে বুনোপাড়ার ভাগাড়ে ফেলে দিলেই রাতের মধ্যে শেয়ালেরা আপাদমস্তক সাবাড় করে দিত। এদিকে শেয়ালের সাইজ একেকটা অ্যালসেসিয়ান কুকুরের মতো।
হারাধনবাবুর হাতে বা পায়ে মৃত্যু হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এবারে একটু গোলমাল হয়ে গেল।
ধর্মদাসের ট্রাকের বোকা ড্রাইভারটা ঘটনার সময় থানায়, বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। সে এই দৃশ্য দেখে দৌড়ে ট্রাকে উঠে দ্রুত চালিয়ে সদরে পৌঁছে যায়। তবে সেই ড্রাইভারও বুঝতে পারেনি যে ধর্মদাস মরে গেছে।
তার পরের দিন, মানে গতকাল সকাল থেকে ট্রাক চালক এবং ক্লিনার সমিতি থানায় এসে হল্লা করেছে, ধর্মদাস কোথায়? লেখাপড়া জানা, নম্র ধর্মদাসকে অনেকেই ভালবাসত।
কিন্তু হারাধন বোকা লোক নন। তিনি ড্রাইভার সদরে চলে যাওয়ার খবর পেতেই ধর্মদাসের লাশ স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চালান করেছিলেন। বিশ্বাস ছিল, একটা হার্টফেলের ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করতে পারবেন। প্রথমে লালমোহন এবং তারপরে হারাধন যথেষ্ট চেষ্টা করলেন। কিন্তু সম্ভব হল না। হেলথ সেন্টারের দায়িত্বে রয়েছেন নতুন ডাক্তার দিদিমণি স্বর্ণকুন্তলা। অনুরোধ, উপরোধ, প্রলোভন, ভয় কিছুতেই কিছু হল না দিদিমণি বললেন, অস্বাভাবিক মৃত্যু। পোস্টমর্টেম করাতে হবে।
এদিকে ব্যাপারটা অনেকদূর পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে। কাল ট্রাক ধর্মঘট হয়ে গেছে। ধর্মদাসের মৃত্যুর ঘটনাটা সদরে পার্টিওয়ালারা জেনে গেছে। তিনটে রাজনৈতিক দলের লোক দাবি করছে ধর্মদাস তাদের দলের লোক।
মানবাধিকারের নেতারাও খবর পেয়েছেন। আজ সকালেই হয়তো তারা থানায় আসবেন।
হারাধনের বুদ্ধি
কিন্তু হারাধন ঠান্ডা মাথার লোক।
আজ সকালে বিশ্বস্ত অনুচর লালমোহনের দলাই-মালাই উপভোগ করতে করতে নানারকম ফন্দিফিকির করতে লাগলেন।
এরকম অবস্থায় মানুষ প্রথমে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কথা ভাবে। ঠিক তাই হল, দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বললেন, ওই ডাক্তারনি মেয়েছেলেটাকে আমি একচালা ঘরে ঢোকাব। লালমোহন চুপ করে রইল, হারাধন দারোগার যতই ক্ষমতা থাক, এ কাজটা মোটেই সহজ হবে না। কিন্তু হারাধন দারোগার আত্মবিশ্বাস খুব। খঙ্গাপুরে ছোট দারোগা থাকার সময়ে এক উকিলের বউকে তিনি লাইনের বস্তিতে তুলেছিলেন, সে অহংকার আজও করেন।
সে যা হোক, কিছুটা দাঁত কিড়মিড় করার পর আসল কথাটা পাড়লেন, লালমোহন তোকে আজ সাসপেন্ড হতে হবে।
লালমোহন আর্তকণ্ঠে বলল, কেন স্যার?
হারাধন বললেন, ধর্মদাসের মৃত্যুর জন্যে।
