আমাদের এই গল্প আরম্ভ হচ্ছে এসবের চার বছর পরে। তখন লালমোহন একজন অভিজ্ঞ পুলিশ কনস্টেবল। পোস্টিং মেদিনীপুর অঞ্চলের উড়িষ্যা এবং বিহার সন্নিহিত একটি থানায়।
হারাধন সারকেল
সেদিন সকালবেলা খাঁটি সরষের তেল দিয়ে বড়বাবুকে ম্যাসাজ করছিল লালমোহন, এটাই তার প্রাত্যহিক মর্নিং ডিউটি। ঘণ্টাখানেক দলাই-মলাই না করলে বড়বাবু উঠে দাঁড়াতে পারেন না।
বড়বাবুর নাম হারাধন সারকেল। বড়বাবুর বয়েস পঞ্চান্ন হয়েছে। কৃষ্ণবর্ণ, নাদুসনুদুস, মাথায় টাক, চমৎকার নেয়াপাঁতি ভুড়ি। হারাধনবাবু একদম বাংলা সিনেমার দারোগাবাবুর মতো দেখতে। হারাধন নিজেও সে কথা জানেন। মধ্যে মধ্যে কথায় কথায় অহংকার করেন, লোকে দারোগা দেখে চিনতে না পারলে হবে? তার জন্যে সবসময় উর্দি পরে থাকতে হবে নাকি। এই বলে হুম বলে একটা শব্দ করেন, যেমন করতেন সুন্দরবাবু পুরাকালের হেমেন রায়ের সেইসব গোয়েন্দা কাহিনিগুলোর দারোগা চরিত্রে।
হয়তো হারাধন কিশোর বয়েসে অন্যান্যদের মতো হেমেন্দ্রকুমারের ভক্ত ছিলেন, পরে দারোগাজীবনে হুম শব্দটা রপ্ত করে নিয়েছেন।
এবং, এ কথা অনস্বীকার্য যে হুম শব্দটি বহুবার্থক (বহু + অর্থক) এবং একজন উঁদরেল। দারোগা অর্ধেক কথা না বলে শুধু হুম করেই বাক্যালাপ সারতে পারেন।
ইংরেজিতে হোম সিক (Home Sick) বলে একটা কথা আছে, যার মানে হল বাড়ির জন্যে মন। খারাপ। শীতের দিনে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়লে কলকাতার সেকালের ইংরেজরা বলতেন হোম ওয়েদার, তারা হোম সিক হয়ে পড়তেন।
হারাধন সারকে বর্তমান থানায় বড়বাবু হয়ে যোগদান করার পরে অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্থানীয় ফৌজদারি আদালতে একটা কথা চালু হয়েছে, লোকটা হুম সিক হয়েছে।
আদতে ব্যাপারটা হল, আরও বিস্তর সহকর্মীর মতো হারাধন আসামিদের পেটাতে ভালবাসেন। এদিকে ইতিমধ্যে তাঁর হুম কুখ্যাত হয়ে গেছে। আদালতে হারাধন প্রহৃত আসামিদের সেই জন্যে হুম সিক নামকরণ হয়েছে।
সে যা হোক, বহুকাল আগে, স্বাধীনতার দ্বিতীয় দশকে হারাধন পুলিশের কাজে ঢুকেছিলেন। কাজটা ছিল লিটারেট কনেস্টেবলের। তখন বলা হত এল.সি.। অর্থাৎ শিক্ষিত সেপাই। সেখান থেকে তিনি ধীরে সুস্থে ছোট দারোগা, বড় দারোগা হয়েছেন।
.
হারাধনবাবুর বিশ্বাস রিটায়ার করার আগে তিনি সার্কেল ইন্সপেক্টর হবেন। সেই কবে প্রথম যখন চাকরিতে ঢুকেছিলেন এক বাটপাড়ির মামলায় নামজাদা এক জ্যোতিষীকে জেরা করেছিলেন। সেই সময়ে জ্যোতিষী তার হাত ও কপাল দেখে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বলেছিলেন, আপনার সারকেল উপাধি বৃথা যাবে না। ভবিষ্যৎবাণী করছি, আপনি একদিন অবশ্যই সার্কেল ইন্সপেক্টরও হবেন।
সেই আজ থেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে সার্কেল ইন্সপেক্টর সোজা ব্যাপার ছিল না। তখনও দেশে এত আই জি, ডি আই জি গিজগিজ করত না। ডিজি-টিজি বলে কিছু ছিল না।
হারাধনবাবু যেমন নিশ্চিত যে রিটায়ার করার আগে তিনি সার্কেল ইন্সপেক্টর হবেনই, তেমনিই মনের মধ্যে একটা চিন্তা আছে যে দারোগার ওপরে উঠে গেলে এখন যেমন আসামিদের, সন্দেহভাজনদের পিটিয়ে লাথিয়ে হাতের সুখ পায়ের সুখ করেন তখন তা করা যাবে না।
যা তোক ভবিষ্যতের জন্যে ভেবে লাভ নেই। এখন হারাধন সারকেল ভালই আছেন। এই রতনপুর থানায় তার তিন বছর হতে চলল।
রতনপুর থানাটি ন্যাশনাল হাইওয়ের একপাশে। হাইওয়ে দিয়ে রাতদিন বাস-ট্রাক, প্রাইভেট গাড়ি, ট্রেকার, অটো যাতায়াত করে, করিৎকর্মা পুলিশের পক্ষে একেবারে যাকে বলে চলন্ত সোনার খনি. অথবা জীবন্ত টাকশাল।
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা এ তিন রাজ্যের মধ্যে বেআইনি অস্ত্র, দাগি আসামি, নিষিদ্ধ মাদক এই সব নিয়ে হাইওয়ে পথে গাড়ির যাতায়াত। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভোলা আছে। যথাসময়ে থানা থেকে ডাকবাবু যথাস্থানে গিয়ে এটা সংগ্রহ করে আনেন।
আদায়পত্র ভালই হয়। কিন্তু নীচে-উপরে অন্য অনেকের সঙ্গে ভাগেজোকে টাকাটা খেতে হয়, সেটাই নিরাপদ।
.
হারাধনবাবুর খাঁই বড় বেশি। এতে তাঁর পোষায় না। তার তারকেশ্বরে একটা আলুর কোল্ড স্টোরেজ আছে, জি টি রোডে একটা সিনেমা হল আছে। বিশ্বস্ত শালারা সেসব দেখাশোনা করে। এতদূরে মেদিনীপুর জেলার শেষ সীমা থেকে তিনি নিজে খুব বেশি খোঁজখবর রাখতে পারেন না।
তবে ওই হাইওয়ের তোলা আদায় ছাড়াও তিনি স্থানীয়ভাবে একটু উপরি-আয়ের বন্দোবস্ত করেছেন।
থানা থেকে পঞ্চাশ গজ এগিয়েই পুরনো বটতলা। হাইওয়ের দূরপাল্লার বাসও ওখানে দাঁড়ায়। দুয়েকটা হোটেল, চায়ের দোকান, মুদির দোকান, একটা হোমিওপ্যাথি ডাক্তারখানা। সকাল সন্ধ্যায় কিছু লোক রাস্তার ওপরে ছোটখাটো কুচো মাছ, তরি-তরকারি, ঋতু বিশেষে মহুয়ার ফুল নিয়ে বসে। একটা হাড়িয়া মানে ধেনোপানীয়ের দোকানও কাছেই আছে।
সেই হাড়িয়ার আড্ডার অনতিদূরে হাইওয়ে থেকে একটু নাবালে কয়েকটা একচালা ঘর। তার সামনে সকাল-সন্ধ্যা কয়েকজন পথবণিতা সস্তার পাউডার আর ফুলেল তেল মেখে দয়িতের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।
এটা সম্পূর্ণ হারাধন সারকেলের কীর্তি। আড়ালে-আবডালে হয়তো চলত, কিন্তু প্রকাশ্যে মেয়েদের এই ব্যবসাটা এখানে চালু ছিল না। হারাধনই চালু করেছেন। মেদিনীপুর সদর থেকে এক বৃদ্ধা কুটনিকে এনে তারই মাধ্যমে ব্যবসা চালাচ্ছেন তিনি। বৃদ্ধা দিন দিন হারাধনের ভাগের টাকা মিটিয়ে দেন।
