এত বড় একটা হিংস্র কুকুরকে কে ঠেকাবে? তার লকলকে জিব, কস্তু কণ্ঠ এবং ধারালো, বিকশিত দন্তরাজি কৌতুক উপভোগী জনতাকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এই শোচনীয় পরিস্থিতিতে দু-একজন দর্শক মাউন্ট পুলিশকে ডেকে আনার কথা বলছে, ঘোড়সোয়ার পুলিশ মাঠের ওপ্রান্তেই টগবগ করে ছুটছে, ডাকলেই হয়তো আসবে।
কিন্তু পুলিশ ডাকার প্রয়োজন হল না। তার পূর্বেই মিসেস ত্রিবেদী রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন। আর সে কী প্রবেশ! যে ভাবে মেঘ আসে ঝড়ের আগে ঈশান কোণে, যে ভাবে পাগলা হাতি ঢোকে ডুয়ার্সের গ্রামে, যে ভাবে মিনিবাস ওঠে ফুটপাথে নাকি এসব উপমাও তুচ্ছ! প্রায় একশো মাইল বেগে ছুটে এসে, তারপর ঘটনাস্থলের দশফুট আগে স্থিরভাবে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটি অনুধাবন করলেন তিনি, তারপরে ধাঁই করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর পিঠের পাশে। এরই মধ্যে বাঁ পায়ে একটি কিক চালিয়েছেন কুকুরটির মুখে এবং ডানপায়ে একটি কিক স্বামীর পৃষ্ঠদেশে।
কুকুরটি আচমকা আহত হয়ে কয়েক হাত পিছিয়ে গিয়ে আরও জোরে চেঁচাতে লাগল। আর মিসেস ত্রিবেদী মুষলধারে দু পায়ে কিক চালাতে লাগলেন স্বামীর পিঠে এবং পিঠের নীচে কোনও কোনও বিশেষ খারাপ জায়গায়।
আমরা ভুল বুঝেছিলাম। লাথিতে কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজ হল। দেখা গেল এই লাহৌষধির সঙ্গে ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর পরিচয় আছে। দু-চারটে লাথির পরেই একটা শক্ত জোড়া লাথির মাথাতে তাঁর গলা থেকে অস্ফুট স্বর বেরোতে লাগল, তারপর স্পষ্ট শোনা গেল, কে রোমিলা?
অজ্ঞান অবস্থায় চোখ বুজে উপুড় হয়ে শুধু লাথি খেয়ে জ্ঞান ফিরে এসেছে আর জ্ঞান আসা মাত্র ধরতে পেরেছেন এটা পরিচিত লাথি, এটা তার স্ত্রীর লাথি, ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর এই আশ্চর্য যোগ্যতা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমরা বাইরের লোক, কিছুই জানি না এঁদের দাম্পত্য আহ্লাদের, কিন্তু লাথির ক্ষমতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
নীচের ব্যক্তিটিকে ছেড়ে দিয়ে এবার চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন ঘনশ্যাম ত্রিবেদী, চিত হওয়ার মুখে রোমিলার একটা লাথিময় পা দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অনুনয় জড়িত কণ্ঠে বললেন, আঃ রোমিলা, কতদিন তোমার লাথি খাইনি!
মুহূর্তের অবকাশে নীচে পড়া চিড়ে চ্যাপটানো ব্যক্তিটি, এখনও তার ধড়ে প্রাণ ছিল, এক লাফে উঠে কুকুরটিকে সংগ্রহ করে সামনের দিকে দৌড় দিলেন। অন্যদিকে ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর সবল বাহুর আকর্ষণে রোমিলা ত্রিবেদী পা হড়কিয়ে ঘনশ্যামের বুকের ওপর পড়ে গেছেন, আর ঘনশ্যাম বলে যাচ্ছেন, রোমিলা, আমাকে তুমি লাথি মারো, আমাকে তুমি একশো লাথি মারো।
উন্মুক্ত নীল আকাশের নীচে সবুজ ঘাসের গালিচায় দাম্পত্য পুনর্মিলন নাটক দেখতে যেটুকু চক্ষুলজ্জাহীনতার প্রয়োজন তার অভাব থাকায় আমি গুটি গুটি বাড়ির দিকে ফিরে এলাম। দেরি হয়ে গেছে, বাড়িতে যথেষ্ট রাগারাগি করবে কিন্তু আমাদের গৃহে লাহৌষধির প্রচলন নেই, সেটাই ভরসা।
লালমোহনের বিপদ
লালমোহনের কোনওদিন কিছু হবে, এমন কেউই আশা করেনি।
সবাই ধরে নিয়েছিল, লালমোহনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, বিশেষ করে সে যখন মাধ্যমিক পরীক্ষায় অঙ্কে ব্যাক পেল।
অবশ্য লালমোহনের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার সেটা ভাববার কারণ ওই শুধু ব্যাক পাওয়া নয়। মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই আঠারো-উনিশ বছর বয়েসের মধ্যে তার নানাবিধ গুণ দেখা গিয়েছিল। মারামারি, ভীতি প্রদর্শন, ইভটিজিং, ছিনতাই ইত্যাদি ছোটখাটো গোলমালে পড়ে থানার রাফলিস্টে তার নাম উঠে গিয়েছিল। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সে স্থানীয় সাট্টা পেনসিলার রূপে জীবিকা অর্জন শুরু করে।
.
ছোটখাটো অপরাধ করে লালমোহন অনায়াসেই পার পেয়ে যেত। তার প্রধান সহায় ছিলেন তার বাবা ভুবনমোহন পাল।
ভুবনবাবু ফৌজদারি আদালতের মুহুরি ছিলেন। স্থানীয় থানার টাউট এবং খুজিলদার হিসেবেও পার্টটাইম কাজ করতেন। পুলিশ ও দুষ্কৃতীরা এদের যথাক্রমে সোর্স এবং খেচর বলে।
সুতরাং সাট্টা পেনসিলার তথা স্থানীয় মাস্তান রূপে জীবিকা অর্জন করতে লালমোহনের কোনও অসুবিধে হয়নি। সদর কলকাতা থেকে অল্প কিছুটা দূরত্বে আধা মফসসল শহরতলিতে তার কারবার, বাপের দৌলতে ভালই চলছিল।
কিন্তু কলকাতায় বউবাজারে প্রাতঃস্মরণীয় রশিদ খানের বোমা-বিপর্যয়ের পরে যখন চারদিকে খানাতল্লাসি, গ্রেফতারি ইত্যাদি হল সেই সময় ভুবনমোহনের পুত্র লালমোহনকেও আত্মগোপন করতে হয়।
তবে বেশি দূরে যেতে হয়নি। ভুবনবাবুর বাড়ি রথতলায়, পাশের এলাকাই থানা পাড়া। থানার ছোটবাবুর বাড়িতে লালমোহন আশ্রয় গ্রহণ করে। ভালই চলে সেখানে কিন্তু অসতর্কতাবশত ছোটবাবুর শ্যালিকা গর্ভবতী হয়ে পড়ায় লালমোহনকে সেখান থেকে চলে আসতে হয়।
ভুবনবাবু পাকা লোক। তিনি এরকম যোগ্য পুত্রের জন্য সুব্যবস্থা করেছিলেন। দুটি কাজ তিনি করেছিলেন, অঙ্কের সেই পরীক্ষা এবং পুলিশের চাকরি। দুটোতেই পার পেয়েছিল লালমোহন, তবে তাকে উপস্থিত হতে হয়নি। সব ব্যবস্থা নির্ভুল করেছিলেন, কোনও পরীক্ষাই তাকে দিতে হয়নি, এমনকী তার উচ্চতা যে পুলিশের চাকরির প্রয়োজনীয় উচ্চতার চেয়ে এক ইঞ্চি কম, সেটাও কোনও বাধা হয়নি, তার হয়ে অন্য এক যুবক শারীরিক পরীক্ষা দিয়েছিল। বলাবাহুল্য, উক্ত যুবকটি ছিল ভুবনবাবুর মক্কেল। ডাকাতি মামলার জামিন প্রাপ্ত আসামি।
