ত্রিবেদী সাহেব এতক্ষণ চিত হয়ে অজ্ঞান হয়ে ছিলেন। এবার আবার উপুড় হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সেটা যতটা গুরুতর তার অধিকতর গুরুতর সেই হৃৎপিণ্ড অনুসন্ধানী স্বর্ণহার স্পর্শক ব্যক্তিটি মহামতি ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর অকস্মাৎ উপুড় হয়ে যাওয়া বিরাট দেহের নীর্চে বিনা বাক্যব্যয়ে চাপা পড়ে গেলেন। ক্ষীণতনু উক্ত ভদ্রলোক পিষ্ট হয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেও ত্রিবেদী সাহেবের নীচ থেকে নির্গত হতে পারলেন না, শুধু মাঝে মাঝে তার মুখ থেকে উঃ, আঃ, বাবা, মা ইত্যাদি অক্ষর ও শব্দ নির্গত হতে লাগল।
অপেক্ষমাণ জনতার, এমন কী আমার নিজেরও এবার প্রধান সমস্যা হল ঘনশ্যাম ত্রিবেদী নয়, ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর পিষ্ট পরোপকারী ব্যক্তিটি। এতক্ষণে সবাই বুঝে গেছেন, ঘনশ্যাম মারা যাননি, মারা যাবার ব্যক্তি নন। কিন্তু এই নতুন লোকটি যিনি ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর নীচে পড়েছেন, তাঁর তো সাংঘাতিক অবস্থা।
দু-একজন অসম সাহসী ব্যক্তি ঘনশ্যামজিকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু যতদূর বোঝা গেল উপুড় হয়ে পড়েই তিনি আবার সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি সংজ্ঞা হারালেও যে ব্যক্তিটি অধঃপাতিত রয়েছেন তার কিন্তু জ্ঞান রয়েছে, তিনি প্রাণান্তকর কোঁ-কোঁ-কোঁ করে চলেছেন।
ঘটনাবলির আকস্মিক মোচড়ে আমার ভূমিকা ইতিমধ্যে লোকচক্ষে গৌণ হয়ে এসেছে। কৌতূহলী জনতার সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে, তারা প্রথম থেকে ব্যাপারটা জানে না। এই নবাগতদের ধারণা মারামারি বা কুস্তি কিছু হচ্ছে, বোধহয় সৌজন্যমূলক প্যাঁচের লড়াই। আধুনিক সিনেমার তুঙ্গমুহূর্তে যেমন ফ্রিজ শট দেওয়া থাকে, সেই রকম নট নড়নচড়ন অবস্থা দেখে নবাগত জনতা কিঞ্চিৎ অভিভূত।
আমি এই সুযোগে গুটিগুটি কেটে পড়ার কথা ভাবছিলাম। কারণ সত্যি আমার কিছু করার নেই। আর তা ছাড়া বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই প্রাতঃভ্রমণ সেরে বাড়ি ফেরার একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে, সেটা উত্তীর্ণ হয়ে গেলে চিন্তার ব্যাপার ঘটে।
এদিকে নতুন একটা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ঘনশ্যামজির বিশেষ ঘনিষ্ঠ দু-চারজন লোক যাঁরা ময়দানের অপর প্রান্তে এতক্ষণ হাওয়া খাচ্ছিলেন তারা এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাদের মুখেই শোনা গেল রাস্তার ওপারে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উদ্যানের ভিতরে ঘনশ্যামজির স্ত্রী নাকি ভ্রমণ করছেন। তবে তাকে খবর দিতে এঁরা একটু ইতস্তত করতে লাগলেন।
এঁদের চাপা কথাবার্তা এবং টুকরো টুকরো আলোচনা শুনে বোঝা গেল শ্রীমতী ঘনশ্যাম ত্রিবেদী–যাঁর নাম হল রোমিলা ত্রিবেদী, যাঁকে এরা মিসেসজি বলে থাকেন, তিনি একটি মারাত্মক বিপজ্জনক মহিলা! আজ বেশ কিছুদিন হল তার সঙ্গে তাঁর পতিদেবতার বাদবিসম্বাদ, হস্তাহস্তি এবং অবশেষে ছাড়াছাড়ি চলছে। মিসেসজি বর্তমানে পিত্রালয়বাসিনী। তাকে ঘনশ্যাম ত্রিবেদী বাঘিনীর মতো ভয় করেন। তিনি প্রভাতে ভিক্টোরিয়া উদ্যানে চড়েন বলেই নিরাপদ ব্যবধানে এই ব্রিগেড প্যারেডের ময়দানে মাউন্ট পুলিশের নিরাপত্তার আড়ালে ঘনশ্যাম সকালে দৌড়াতে আসেন।
ছাড়াছাড়ি হলেও আসলে স্ত্রী তো, সাতজন্মের সাত পাকের বন্ধ, ডিভোর্স-টিভোর্স হয়নি। আজ ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর এই দুঃসময়ে তাকে একটু খবর জানানো দরকার, তা ছাড়া মিসেসজি যখন হাতের কাছেই রয়েছেন।
দ্রুত শলাপরামর্শ করে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দিকে তিনজন ছুটলেন মিসেসজিকে আনতে। আমি চলে আসছিলাম, শুধু রয়ে গেলাম কৌতূহলবশত মিসেসজিকে চাক্ষুষ করার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না।
একটু পরেই সংবাদদাতাদের ভিক্টোরিয়ার প্রান্ত থেকে ফিরতে দেখা গেল তাদের মধ্যমণি হয়ে আসছেন এক মহিলা, স্পষ্টতই তিনি মিসেস রোমিলা ত্রিবেদী।
কাছে আসতে মিসেস ত্রিবেদীকে দেখে বুঝলাম ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর জীবনসঙ্গিনী হবার উনি যোগ্য নন। যদিও কোমরে ফের দিয়ে শাড়ি পরা, পায়ে কাপড়ের ফিতেওলা জুতো, তবু এই মহিলা আরও দশজন প্রাতঃভ্রমণের দশাসই কলেবরধারিণীদের মতো নন। ঘনশ্যামজির সঙ্গে রীতিমতো বেমানান।
মিসেসজি দ্রুতগতিতে অকুস্থলে এগিয়ে এলেন। তখনও তার স্বামী উপুড় হয়ে সেই উদ্ধারকর্তাকে ভূমিতে নিষ্পিষ্ট করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছেন। নীচের ব্যক্তিটি প্রথম দিকে আর্তনাদের সঙ্গে শরীরের মুক্ত অংশ হাত পা ইত্যাদি ছোঁড়াছুড়ির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এখন তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তবে জ্ঞান রয়েছে, সেটা অসহায় চিঠি ধ্বনিতে পর্যবসিত হয়েছে।
মিসেস ত্রিবেদীর উচ্চতা পাঁচ ফুটের বেশি নাও হতে পারে। স্বাস্থ্যও অতি সাধারণ, রোগা বলা চলে! তবে কাছ থেকে দেখলাম, তার মুখ অতি চোয়াড়ে, চোখের ভাষা অতি তীব্র। হাত-টাত ইত্যাদিও বেশ শক্ত মনে হল–সব মিলে যাকে সাদা বাংলায় পাকানো চেহারা বলা যায়, একেবারে ঠিক তাই।
মিসেস ত্রিবেদী এসে যেতে একটা অস্ফুট গুঞ্জন উঠল। ইতিমধ্যে অন্য একটা ঘটনা ঘটে গেছে। যে ভদ্রলোক ঘনশ্যামজির নীচে চাপা পড়েছিলেন তার সঙ্গে যে একটা কুকুর ছিল, বেশ বড়সড় বিলিতি কুকুর, সেটা এতক্ষণ কেউ খেয়াল করেনি। কুকুরটা এতক্ষণ কাছাকাছি কোথায় দাঁড়িয়ে প্রভুর জন্যে প্রতীক্ষা করছিল। এইবার মিসেসজির আগমনে চারদিকের ভিড় একটু চঞ্চল এবং এলোমেলো হতেই সে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গন্ধ শুকে প্রভুর সন্ধান পেয়ে গেছে এবং তার প্রভুর এই শোচনীয় পরিণতি তার মোটেই পছন্দ নয়। সে উত্তেজিত হয়ে গর্জন শুরু করে দিয়েছে। আশঙ্কা। হচ্ছে যেকোনও মুহূর্তে ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর উপরে কুকুরটি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
