ম্যা. সা. পড়ে গিয়ে আর ওঠেন না। যদিও তার পতনের ব্যাপারে আমার কোনও দায়িত্ব নেই কিন্তু আমিই তার কারণ, মনে মনে দুশ্চিন্তা বোধ করতে লাগলাম। ময়দানের চারপাশে ম্যা. সার। শুভানুধ্যায়ীর অভাব নেই, চারদিক থেকে তারা ছুটে এলেন, এসে আমার দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন।
বেশ ভিড় হয়ে গেল। আমি রীতিমতো শঙ্কিত বোধ করতে লাগলাম। যখন ম্যা. সা-র পতনের ঘটনাটি ঘটে, তখন দুঃখের বিষয় আমাদের দুজনের কাছাকাছি কোনও লোক ছিল না। আসলে ম্যা, সা. সম্ভবত তার নিরুপদ্রব পশ্চাদ্দৌড়ের প্রয়োজনে একটু ফঁকা জায়গাই বেছে নিয়েছিলেন। আমি ভুলক্রমে তার মানসিক সীমানায় ট্রেসপাস করেছিলাম। সেটুকু অবশ্যই আমার দোষ, ম্যা. সা. কিন্তু পড়েছেন নিজ গুরুত্বে এবং নিজ দায়িত্বে। তাঁকে আমি কোনও মুহূর্তেই বিন্দুমাত্র স্পর্শ করিনি।
যা হোক, এর মধ্যে বেশ ভিড় জমে গেছে। দু-একজন বুঝদার লোকও এঁদের মধ্যে আছেন সেটাই ভরসা। বুঝদার মানে, আমার মতো সামান্য শক্তির কোনও লোক যে ম্যা. সা.-র মতো অতিকায় প্রাণীকে ধরাশায়ী করতে পারে না সেটা তারা অনায়াসেই উপলব্ধি করেছেন।
বিপদ হল দু-একজন অত্যুৎসাহী লোক নিয়ে। তারা কিন্তু আমার বিপদের লোক নয়, বরং প্রশংসিত দৃষ্টিতে তারা আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে আপাদমস্তক অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছিল। কী করে তাদের মনে ধারণা হয়েছে যে আমি ক্যারাটে কিংবা ওই জাতীয় কোনও গুপ্ত বা গুহ্য শারীরবিদ্যা জানি এবং সেই মারাত্মক ক্ষমতায় আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এই বিপুল বপুকে সামান্য অঙ্গুলিহেলনে কাটা কলাগাছের মতো ধরাশায়ী করা।
আমি আর কী বলব? কাকেই বা বোঝাব? এমনকী আমার দাঁড়িয়ে থাকা উচিত হচ্ছে কি না, নাকি মুহূর্তের মধ্যে স্থানত্যাগ করা উচিত, কোনটা আমার পক্ষে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক আমি কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারছিলাম না।
এদিকে ম্যা. সা. সেই যে পড়েছেন একবার গড়িয়ে চিত হয়ে গিয়ে আর ওঠেন না। নড়াচড়া পর্যন্ত বন্ধ। আশঙ্কা হল মারা গেল নাকি? তা হলে রীতিমতো কেলেঙ্কারি; তখন পুলিশ আর আদালতের কাছে বোঝাতে হবে আমার কোনও দোষ নেই, নিতান্ত পৈতৃক প্রাণ বাঁচানোর জন্যে আমি আর্তনাদ করে উঠেছিলাম এবং প্রয়োজনে আর্তনাদ নিশ্চয়ই ফৌজদারি আইনের আওতায় আসে না, ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে নির্দিষ্ট কারণে আর্তনাদ করাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে না। আর তা ছাড়া ম্যা. সা.-কে ঠিকমতো পোস্টমর্টেম করলেই ধরা পড়বে তাকে আমি কিংবা কেউই কোনও রকম আঘাত করিনি।
অবশ্য কৌতূহলী জনতার মধ্যে আমার চেয়ে বেশি তৎপর একাধিক ব্যক্তি ছিলেন। তারা ইতিমধ্যে ম্যা. সা-র পাশে বসে পড়েছে। এঁরা অন্তত এঁদের মধ্যে কেউ কেউ, বোঝা যাচ্ছে, ম্যা. সা-র পূর্ব পরিচিত। একজন তো রীতিমতো ম্যা, সা-র নাম পর্যন্ত জানেন। তিনি ম্যা, সা-র কানের কাছে মুখ নিয়ে হ্যালো মিস্টার ত্রিবেদী, হ্যালো ঘনশ্যামজি বলে ডাকতে লাগলেন। অন্য এক উদ্যোগী ব্যক্তি ঘাসের নীচ থেকে এক টুকরো শুকনো মাটির ডেলা নিয়ে খইনি ডলার মতো করে বামহাতের তালুতে রেখে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে চিপে চিপে গুঁড়ো করে ফেলছেন, এবার সেই গুঁড়ো মিস্টার ত্রিবেদী ওরফে ম্যা. সা.-র নাসিকারন্ধ্রের সামনে আস্তে আস্তে ফেলা হল। পতনোম্মুখ ধূলিকণার মধ্যে কিঞ্চিৎ আলোড়ন দেখে আশ্বস্ত হওয়া গেল যে শ্রীযুক্ত ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর প্রাণবায়ু এখনও বইছে, সেটা অন্তর্হিত হয়ে যায়নি।
ইতিমধ্যে ঘনশ্যাম ত্রিবেদী একবার ঘোরের মধ্যে যে ব্যক্তি তার কানের কাছে মিস্টার ত্রিবেদী, মিস্টার ত্রিবেদী বলে ডাকছিলেন তাঁকে বিশাল বাহুর এক ধাক্কায় প্রায় চার হাত দুরে ছিটকে ফেলে দিলেন। পরোপকারী ভদ্রলোক এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি ওই চার হাত দূরে ছিটকে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন। আমার কেমন মায়া হল। আমি পতিত ভদ্রলোককে নিচু হয়ে তুলতে গেলাম এবং তখনই বুঝতে পারলাম ঘনশ্যাম ত্রিবেদীর অজ্ঞান অবস্থাতেও অতর্কিত আক্রমণের কারণ। ভদ্রলোকটির মাথায় মধ্যমনারায়ণ অথবা ওই জাতীয় কোনও আয়ুর্বেদীয় তেলের বিকট গন্ধ। এই ভোরবেলাতেই লোকটি জবজবে করে একবাটি মধ্যমনারায়ণ তেল মাথায় মেখে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে। এই রকম গন্ধের যেকোনও তেলই পাগলের আইডেনটিটি কার্ড, অজ্ঞান অবস্থাতেও মাথার কাছে পাগলের আগমনে ত্রিবেদী সাহেবের যথেষ্ট আপত্তি আছে, অন্তত তাই বোঝা যাচ্ছে।
এবং আরেকটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, ত্রিবেদী সাহেব মারা যাননি। জ্ঞান-অজ্ঞানের মধ্যবর্তী পর্যায়ে আছেন। তবে অজ্ঞানের চেয়ে জ্ঞান বেশি টনটনে। তার প্রমাণ পাওয়া গেল এক সরল প্রকৃতির ব্যক্তি ত্রিবেদী সাহেবের হৃৎপিণ্ড এখনও ধুকধুক করছে কিনা সেটা অনুধাবন করার জন্যে এবং সম্ভবত অনুসন্ধানের সুবিধের জন্যে ত্রিবেদী সাহেবের জামার নীচে বুকের ওপর হাত দিয়েছিল। ত্রিবেদী সাহেবের গলায় মোটা বিছে হার, আগেকার দিনে সচ্ছল সংসারে ঠাকুমারা যেমন গলায় দিতেন। হৃৎপিণ্ড-সন্ধানী ভদ্রলোক ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় জামার নীচের সেই বিছে হারটি যে মুহূর্তে স্পর্শ করেছেন ত্রিবেদী সাহেব চমকে উঠে উপুড় হয়ে গেলেন।
