হুলোঝুলোও তখন নীচের লনে ঘাসের উপরে পড়ে কোনওরকমে সম্বিত ফিরে পেয়ে, ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে এখন বারোতলার ফ্ল্যাটের দিকে উঠছে। এবার রাজলক্ষ্মী যেভাবে পারে সামলাক।
লাথ্যৌষধি
ভদ্রলোককে ভোরবেলায় ময়দানে বেড়ানোর সময় কখনও কখনও দুর থেকে দেখেছি। দেখার মতো, সমীহ করার মতো চেহারা। সাড়ে ছফুটের চেয়ে কম নয় লম্বায় এবং তদনুপাতিক ছড়ানোবাড়ানো দশাসই কলেবর।
অনেককেই সকালে ময়দানে দেখি। কেউই ঠিক সাধারণ পর্যায়ের লোক বোধহয় নয়। তা না হলে চমৎকার সুন্দর ভোরবেলায় বিছানার আরাম ছেড়ে মাঠে দৌড়াতে আসবে কেন? এদের মধ্যে একেকজন বেশ বিপজ্জনক। আমি যখন প্রথম প্রথম ময়দানে হাঁটা শুরু করি, কাউকে কাউকে দেখে রীতিমতো ভয় হত। একজন আছেন দুপায়ের জুতো দু হাতে নিয়ে, ধুতি মালকোঁচা বেঁধে, দুপাশে দুটো হাত পাখির মতো ছড়িয়ে দিয়ে বিকট গগনভেদী আ-আ-আ চিৎকার করতে করতে মাঠের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে যান। উনি নাকি কোন সাবানের কারখানার মালিক, কোটিপতি। এইভাবে আ-আ-আ করে ছুটে প্রতিদিন তিনি শরীর ও মনের গ্লানি দূর করেন। অন্য এক বৃদ্ধ। আছেন, আজ চল্লিশ বছর নাকি ময়দানে আসছেন, ছত্রিশ বছর হল আবগারির বড় দারোগা পদ। থেকে অবসর নিয়েছেন। ভদ্রলোকের অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা, কাঁধের দুপাশে দুটো হাতকে শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রের মতো বোঁ বোঁ করে ঘোরাতে পারেন, সত্যিই বোঁ বোঁ শব্দ হয়, আমি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে শব্দ স্বকর্ণে শুনেছি।
হাফপ্যান্ট পরিহিতা এক তাড়কাকায়া ভদ্রমহিলা আসেন। কোনও একজন দরজির পক্ষে যে তাঁর হাফপ্যান্টের মাপ নেওয়া সম্ভব হয়নি, একজন ফিতে ধরে ছিল এবং অন্যজন চারপাশ ঘুরে এসেছিল, এ বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই, ইনি অবশ্য বিশেষ দৌড়ঝাঁপ করেন না। করা সম্ভব নয় তার পক্ষে। মাঠের পাশের একটা সিমেন্টের বেঞ্চিতে শরীরের ভার ফেলে সেই বেঞ্চিটা ভাঙার চেষ্টা করেন আর সেই বেঞ্চি থেকে উঠতে কী কঠোর পরিশ্রম হয় তাঁর, বহু কষ্টে দম নিয়ে। যেন কোনও খাড়া পাহাড়ে উঠছেন এইভাবে দেহ উত্তোলন করেন।
এসব যা হোক, আমি প্রথমে যে দীর্ঘদেহী ভদ্রলোকের কথা বলেছি, যাঁর জন্যে আমাদের এই গল্প, তাঁর কাছে ফিরে আসি। ভদ্রলোক কাছাকাছি কোনও বহুতল অট্টালিকার বাসিন্দা, কোনও কোম্পানি বা কারখানার সম্ভবত ম্যানেজার হবেন। কোনও কোনও পরিচিত বায়ুসেবনকারী তাকে ওই নামেই সম্বোধন করেন শুনেছি এবং তিনিও সাড়া দেন। এই গল্পে আমরাও তাকে আপাতত ম্যানেজার সাহেব (ম্যা. সা.) বলব।
ম্যা. সা. একদিন আমাকে চাপা দিতে যাচ্ছিলেন। কোনও গাড়ি দিয়ে নয়, তার বিশাল বপু দিয়ে। আর আমি যদি ক্ষিপ্র না হতাম, এড়াতে না পারতাম তাহলে ওই চারমনি শরীরে চাপা পড়া গাড়ি চাপা পড়ার চেয়ে কম মারাত্মক হত না।
ম্যা. সা. সকালবেলা ময়দানে উলটোদিকে দৌড়ান। আগে কখনও এ জিনিস দেখিনি, ময়দানে উলটোদৌড়ের কারিগর অনেক। মুখটা সামনের দিকে রয়েছে অথচ পা দুটো পিছন দিকে চরম গতিতে ছুটছে। এতে নাকি শিরদাঁড়া সোজা থাকে। তা নিয়ে আপত্তি নেই কিন্তু অসুবিধা হল এই মাথার পিছনে চোখ না থাকায় যিনি দৌড় দিচ্ছেন তিনি ধরতে পারছেন না কোথায় পৌঁছাচ্ছেন। একজনকে দেখেছিলাম পশ্চাদ্ধাবন করতে করতে শেষে একটি ঘোড়ার উপরে গিয়ে পড়েন। ঘোড়াটিও পিছন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ফলে সে কিংবা তার আরোহী কেউই উলটো দৌড়বীরকে দেখতে পায়নি। ময়দানের মাউন্ট পুলিশের শিক্ষিত ঘোড়া, মুহূর্তের মধ্যে একটা ব্যাকভলি করে দৌড়শীল ভদ্রলোককে ভূপাতিত করল। ভদ্রলোক অতঃপর তিনমাস ময়দানে আসেনি। আজকাল আসেন। সামনে, পিছনে কোনওদিকে দৌড়ান না। মাঠের উলটোদিকে বটতলায় যোগব্যায়াম করেন কোমর সোজা করার জন্যে।
এ ঘটনার ঢের আগে বিপদে পড়েছিলাম আমি। তখন ময়দানে আমি প্রথম প্রথম যাচ্ছি। আগের অনুচ্ছেদে বর্ণিত ভদ্রলোকের অনুরূপ ভঙ্গিতে ঘটনার দিন ম্যা. সা. পিছনপানে ছুটছিলেন। আমি খালি পায়ে ভেজা ঘাসের ওপর খুব আলতো ভাবে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পর্বতের মতো বিশাল কী একটা বস্তু আমার ওপরে এসে পড়ল, বস্তুটি ওই ম্যা. সা.। তিনিও আমাকে দেখতে পাননি, পেছন দিকে কী করে দেখবেন?
ভগবান আমাকে একটি অসামান্য ক্ষমতা দিয়েছেন। কোনও বিপদে পড়লেই আমি বাঁচাও, বাঁচাও করে চেঁচাই, এর জন্যে আমাকে কোনও চিন্তা করতে হয় না। বিপদের আভাস পাওয়া মাত্র। একা একাই আমার কর্কশ কণ্ঠ দিয়ে এই অন্তিম আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। আমার এই আর্তনাদ শুনে ইতিপূর্বে খ্যাপা কুকুর কামড়াতে এসে থমকে থেমে গেছে, উদ্যত শৃঙ্গ ষণ্ড হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে ছুটে গেছে, এমনকী বস্তির মাস্তানরা চাদার খাতা রাস্তায় ফেলে দৌড়ে পাশের গলিতে ঢুকে গেছে। এবারেও তাই হল, যখন ম্যা. সা. এবং আমার মধ্যে ব্যবধান মাত্র এক সেন্টিমিটার, আমার গলা থেকে আমার প্রায় অজান্তেই বেরিয়ে এল সেই বহু পরিচিত বুকের রক্ত হিম করা, কর্কশ আকৃতি, বাঁচাও বাঁচাও।
আচমকা শরীরের ব্রেক কষতে গিয়ে ম্যা, সা, সামনের দিকে মুখথুবড়ে পড়ে গেলেন। আর এ কী আর যা-তা পড়া, পড়তে গেলে এভাবেই পড়তে হয়, মহীরূহ পতন কাকে বলে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম। এই মহীরূহ যদি আমার উপরে পতিত হত, বাঁচতাম কী মরতাম বলতে পারি না তবে চিতল মাছের মতো চ্যাপটা হয়ে যেতাম।
