টক দই বিক্রমাদিত্যের অতি প্রিয়। বিলেতে থাকতে রাশিয়ার যোগার্ট খাওয়া তার অভ্যেস হয়ে। গিয়েছিল। এখানকার টক দই অবশ্য খুব ভাল। সকালবেলা অল্প নুন চিনি আর লেবুর রস মিশিয়ে বড় এক গেলাস টক দইয়ের ঘোল খেয়ে নেয়। আর কিছু পরিমাণ দই মিশিয়ে শসা কুচি, টমাটো কুচি, আম-আপেলকলা যখন যে ফল পাওয়া যায় তা দিয়ে একটা রায়তা বানায়। বিক্রমাদিত্যের সারা দিনে এই দুটিই প্রধান খাদ্য। সঙ্গে কখনও এক চামচ ভাত, দু-টুকরো পাঁউরুটি কিংবা ভাজা মাছ। বেশ ভালই চলছিল তার।
আজ কয়েকদিন হল হয়েছে কী, সকালে দই এনে খাবার টেবিলের উপর রেখে বিক্রমাদিত্য যখন স্নানে যায়, তখন কী করে যেন ভাঁড়ের দই নিঃশেষ হয়ে যায়। রীতিমতো ভৌতিক ব্যাপার। রহস্যটা কিছুতেই উন্মোচন করতে পারে না বিক্রমাদিত্য। এসব দিনে তাকে প্রায় অভুক্তই থাকতে হয় আর বেরিয়ে গিয়ে দুই কিনে আনতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু একদিন ব্যাপারটা ধরা পড়ল। বাথরুমে স্নান করতে সবে ঢুকেছে বিক্রমাদিত্য, এমন সময় টেলিফোন বাজতে সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে একটা সাদা-কালো, কানকাটা, লেজ ছেঁড়া হুলো বেড়াল দইটা চোখ বুজে পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছে। তাকে দেখেই বিড়ালটা দৌড়ে গিয়ে জানলা দিয়ে মহাশূন্যে একটা লাফ দিল। বিক্রমাদিত্য ভাবল নির্ঘাৎ মারা পড়বে। কিন্তু তা হবার নয়। বারো ফুট দূরে সামনের ফ্ল্যাটের খোলা জানলায় সে অবতীর্ণ হল এবং মুহূর্তের মধ্যে ফ্ল্যাটের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ওই ফ্ল্যাটটা এই তলাতেই। ফ্ল্যাটের দরজায় নেমপ্লেট লাগানো আছে। ইংরেজিতে লেখা লখমি দেবী। ভদ্রমহিলাকে দু-চারবার যাতায়াতের পথে এবং লিফটে বিক্রমাদিত্য দেখেছে। সুডৌল, মধ্যবয়সি, সুন্দরী মহিলা। হাসি বিনিময় হয়েছে, তবে আলাপ হয়নি।
আজ বিক্রমাদিত্য ভাবল, বেল দিয়ে ভদ্রমহিলাকে ডেকে বলে আসে যে আপনার বেড়াল সামলান। সে দৈনিক আমার দই খেয়ে যায়। তারপর ভাবল, কী দরকার কাল থেকে দই ফ্রিজে রেখে দেব। বেড়াল তো আর সেখান থেকে খেতে পারবে না।
কিন্তু এরপরেও মাঝেমধ্যে গোলমাল হতে লাগল। বেড়ালের সাহস বেড়ে গেছে। মাঝেমধ্যে জানলা দিয়ে ঢোকে, ভুল করে দুই টেবিলে রাখলেই নিঃশব্দে মুহূর্তের মধ্যে এসে খেয়ে যায়। একদিন কী ভেবে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ-র যে দোকান থেকে সে নিয়মিত দই কেনে, সেই প্রবীণ দোকানিকে বিক্রমাদিত্য তার সমস্যা বলল। বিচক্ষণ মিষ্টান্ন বিক্রেতা সব শুনে খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, এটা কোনও সমস্যাই নয়।
বিক্রমাদিত্য বলল, কোনও সমস্যা নয়! ভদ্রলোক বললেন, ওই যে সামনে পানের দোকান দেখেছেন, ওই দোকান থেকে পানে খাওয়ার চুন কিনে নিয়ে যান। তারপর একটা প্লেটের মধ্যিখানে চুনটা রেখে চারপাশে দই দিয়ে দিন। এবার দই খেতে গিয়ে মজা বুঝবে বেড়াল।
সত্যিই মজা বুঝেছিল সেই বেড়াল। দই খেতে খেতে চুনে মুখ পড়তেই সে বিদাৎ বেগে জানলার দিকে ছুটে গেল, যথারীতি প্রতিদিনের মতো মহাশূন্যে লাফ দিল নিজের বাড়ির জানলার দিকে কিন্তু আজ চুনে মুখ পুড়ে যাওয়ায় তার অঙ্কে সামান্য ভুল হয়েছিল। সে জানলার নীচে গুঁতো খেয়ে সরাসরি নীচে পড়ে গেল।
বাথরুমের দরজার আড়াল থেকে দৃশ্যটা উপভোগ করছিল বিক্রমাদিত্য। হঠাৎ বেড়ালটার ক্রুদ্ধ, বিকৃত মুখ, কাটা কান, ছেঁড়া লেজ, সাদাকালো লোম–সব দেখে বিক্রমাদিত্য হৃদয়ঙ্গম করল, সর্বনাশ। এই তো সেই হুলোঝুলো। যে তার জীবন ব্যর্থ করেছে।
মুহূর্তের মধ্যে এটাও অনুমান করতে পারলে, পাশের ফ্ল্যাটে লক্ষ্মী দেবীই হল রাজলক্ষ্মী। সামান্য চেনা হলেও সাত পাকে বাঁধা সম্পর্ক, সেকি ভোলা যায়? আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। বিক্রমাদিত্য। সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বাথরুমের তোয়ালে জড়ানো অবস্থাতেই একইসঙ্গে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার বেল বাজাতে ও কড়া নাড়তে লাগল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। লক্ষ্মীদেবী দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বিক্রমাদিত্য সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসা করতে গেল, কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে পারল না। বহুদিন পরে আবার তার তোতলামি ফিরে এসেছে, একবার আপনি লক্ষ্মী বলতে গিয়ে আ-আ-আ… করে ঠেকে যায়। আরেকবার তুমি রাজলক্ষ্মী প্রশ্ন করতে গিয়ে তু-তু-তু.. করতে থাকে।
সেই কতদিন আগের তু-তু-তু-তু.. ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে আর তু-তু করতে হবে না। আমি রাজলক্ষ্মী, রাজ কেটে দিয়ে লক্ষ্মী হয়েছি।আর একটাই প্রশ্ন ছিল হুলোঝুলো বিড়াল এতকাল বাঁচল কী করে? প্রশ্নটা মুখে করার সাহস পেল না। ঘরের ভিতরে ড্রেসিং টেবিল, সেখানে এগিয়ে গিয়ে একটা লিপস্টিক তুলে নিয়ে আয়নায় লিখে প্রশ্ন করল। রাজলক্ষ্মী বলল, একটা হুলোঝুলো তো নয়, একটা হুলোঝুলো গেছে, আবার একইরকম দেখতে আরেকটা কুড়িয়ে এনেছি। আমার জীবনে তো আর কিছু নেই। বিক্রমাদিত্য আয়নার নীচের দিকে ছোট ছোট করে লিখল, এ হুলোৰুলোও তো গেছে। একটু আগেই বারোতলার জানলা থেকে নীচে পড়ে গেল। রাজলক্ষ্মী বলল, তা যাক, এই শেষ, এখন তো তোমাকে পেয়ে গেছি। রাজলক্ষ্মী বিক্রমাদিত্যকে বাহুপাশে আবদ্ধ করল।
গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু বারোতলা, চোদ্দতলা থেকে পড়ে গেলে বিড়াল মরে না। কথায় বলে বিড়ালের নয়টা জীবন।
