এই দেখে বাড়ির পুরনো চাকর নীলমণি একটা লাঠি দিয়ে হুলোঝুলোর পিঠে মারল এক ঘা। লাঠি হুলোঝুলোর পিঠে পড়তে দুটি কাণ্ড ঘটল। হুলোঝুলো লেজ উঁচু করে এক দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে দোতলায় উঠে গেল এবং প্রাণপ্রতিম হুলোর এই নির্যাতন দেখে নববধূ রাজলক্ষ্মী আমার হুলো, আমার হুলোঝুলো বলতে বলতে চোখ উলটিয়ে ভূমিতলে শায়িতা পিসিশাশুড়ির কোলের উপর গিয়ে পড়ল।
সেইসঙ্গে জোড়ে বাঁধা বিক্রমাদিত্য হুমড়ি খেয়ে পড়ল দুজনেরই উপরে। কেলেংকারি কাণ্ড, শুধু বাড়ির লোকজন নয়, আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী, রাস্তার লোকজন সবাই ছুটে এসে কী হয়েছে। কিছু বুঝতে না পেরে শোরগোল আরও বাড়িয়ে দিল।
ব্যাপারটা কোথায় গড়াত তা বলা কঠিন। তবে বিক্রমাদিত্যের জ্যাঠামশাই প্রেমাদিত্যবাবু স্থিতধী মানুষ, কলেজে অঙ্কের অধ্যাপক। তিনি বললেন, যা হবার তা হয়েছে। আগে নতুন বউকে ঘরে ভোলো। বউমা আমাদের একাধারে মা লক্ষ্মী ও ষষ্ঠী। একেবারে বেড়াল বাহন নিয়ে এসেছেন।
দোতলায় উঠে দেখা গেল, হুলোঝুলো দোতলার একটা ঘরের সামনে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তাকে দেখে রাজলক্ষ্মীর কান্না থামল, সে হুলোঝুলোকে কোলে নিয়ে চোখের জল মুছতে লাগল।
হুলোঝুলো কিন্তু নির্বিকার, এর পরের ঘটনাবলি আরও বিচিত্র এবং রোমাঞ্চকর। এ কাহিনিতে তার প্রয়োজন নেই। আবার পরের দিন ফুলশয্যার রাতে যাচ্ছি।
.
ফুলশয্যার দিন খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে অতিথি-অভ্যাগতদের বিদায় করে বিক্রমাদিত্য যখন শোওয়ার ঘরে প্রবেশ করল, তখন সে যা দেখল তা দেখে তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল।
এমন একটি সুন্দর স্বপ্নের রাত। সুন্দরী নববধূ বালিশে মাথা দিয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে, আর তারই ডানপাশে বালিশে শুয়ে রয়েছে হুলোঝুলো। যে বালিশটায় আসলে বিক্রমাদিত্যের শোয়ার কথা। স্বভাবতই বিক্রমাদিত্য হুলোঝুলোকে টুটি ধরে বিছানা থেকে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। হুলোঝুলো ফোঁস করে উঠে মাথা ঘুরিয়ে বিক্রমাদিত্যের কবজিতে কামড়ে দিল। বিক্রমাদিত্যের তা সহ্য হল না। সে সামনের জানলা গলিয়ে হুলোঝুলোকে সদর রাস্তার দিকে ছুঁড়ে দিল।
ইতিমধ্যে রাজলক্ষ্মীর ঘুম ভেঙেছে। সে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। বিক্রমাদিত্য কিছু না বলে কবজির ক্ষতে একটু ডেটল লাগিয়ে বিছানা থেকে একটা বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল।
রাজলক্ষ্মী অঝোরে কাঁদতে লাগল। শুধু হুলোঝুলো নয়, সে ইতিমধ্যে জেনে গেছে তার বর তোতলা। বাসরঘর থেকে শুরু করে আজ এই ফুলশয্যার রাত পর্যন্ত তোতলামি এবং স্বাভাবিক উত্তেজনাবশত বিক্রমাদিত্য রাজলক্ষ্মীকে একটিও সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পারেনি। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে কিন্তু আ-আ-আমি তো-তো-তো… এই পর্যন্ত এসে থেমে গেছে। আজ সন্ধ্যাতেই সুসজ্জিতা নববধূকে দেখে তুমি কী সুন্দর জাতীয় কিছু কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু পরপর সাত আটটা তু-তু-তুতু করা ছাড়া এগোতে পারেনি, রাজলক্ষ্মী হেসে ফেলেছিল। বলেছিল, তু-তু-তু-তু আবার কী? আমি কী কুকুর না বেড়াল যে আমাকে তু-তু করে ডাকতে হবে।
তখন হেসেছিল, কিন্তু এখন আর রাজলক্ষ্মী হাসছে না, হুলোক্সলোর শোকে এবং সেইসঙ্গে তোতলা স্বামীর কথা ভেবে সে নীরবে কাঁদতে লাগল।
রাতে বিক্রমাদিত্যের ভাল করে ঘুম হল না, ঘুম হওয়ার কথাও নয়। ভোরবেলার দিকে আধো তন্দ্রায় মনে হল রাজলক্ষ্মী ঘর খুলে কোথায় যেন যাচ্ছে।
যেখানে খুশি যাক, বিক্রমাদিত্য কোনও কথা বলল না, এরপরে যখন অনেক বেলাতে ঘুম ভাঙল, তখন সে দেখল তার মাথার কাছে একটা কাগজের টুকরো, তাতে লেখা,
আমি হুলোঝুলোকে খুঁজতে চললাম। তাকে না পাওয়া পর্যন্ত ফিরছি না।
না, রাজলক্ষ্মী আর ফেরেনি। বিক্রমাদিত্যের বিয়ের শিক্ষা তো হয়েই গিয়েছিল, এমনকী কয়েকমাসের মধ্যে সে একটি বিলিতি কোম্পানিতে চাকরি জোগাড় করে ইংল্যান্ডে চলে গেল।
০৩. পুনর্মিলন
বিশ বছর পরে বিক্রমাদিত্য আবার দেশে ফিরে এসেছে। দীর্ঘকাল দেশের সঙ্গে প্রায় কোনও যোগাযোগ ছিল না। অবশ্য এর মধ্যে মা-বাবা, প্রবীণ আত্মীয়েরা সবাই বিগত হয়েছেন। তাই দেশে ফেরার খুব একটা টানও তার ছিল না। পুনরায় বিয়ের কথাও ভাবেনি। বিলেতে প্রেম, লিভ টুগেদার, এরকম খুচরো ব্যাপার অবশ্যই ঘটেছে, তবে তা গণ্যের মধ্যে নয়।
বিশ বছর নিঃসঙ্গ প্রবাসে বিক্রমাদিত্য বিলিতি পাউন্ডে যে টাকা জমিয়েছে, ভারতীয় অঙ্কে সে অন্তত দু-চার কোটি হবে। বিলেতে গিয়ে বিক্রমাদিত্যের সবচেয়ে বড় উপকার হল যেটা কোনওরকম ডাক্তার, ওষুধ, চিকিৎসা ছাড়াই তার তোতলামি সেরে গেল।
অবশ্য একদিন তার দেশে ফেরার বাসনা হল, ওখান থেকেই দালালের মারফতে সাদার্ন অ্যাভিনিউতে বিলাসবহুল বহুতল বাড়ির একটি দক্ষিণ খোলা ফ্ল্যাট কিনল।
এতকাল বিদেশে থাকার পর এখানকার শব্দদূষণ, বায়ুদূষণে বিক্রমাদিত্যের অবশ্য কিছু অসুবিধে হচ্ছিল, তবে সে রাস্তায় বেরোলে। এই বারোতলার ফ্ল্যাটে দূষণ ঢের কম।
কাজের লোক কাউকে রাখেনি। বিলেতে থেকে রান্না করা, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজা সব অভ্যেস হয়ে গেছে। কাজের লোক মানেই বাড়তি ঝামেলা, সকালের দিকে একবার রাসবিহারী অ্যাভিনিউ-এর একটা পুরনো মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে পাঁচশো গ্রাম দই কেনে। লেকমার্কেট থেকে কিছু শাকসবজি ও ফল। আর কাটাপোনা বা ওই জাতীয় কয়েক টুকরো মাছ।
