কিন্তু এর পরেও একটা বিষয় উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এতাদৃশ গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও বিক্রমাদিত্যের একটা ত্রুটি ছিল। তিনি ছিলেন আংশিক তোতলা।
তোতলা কিংবা আংশিক তোতলা এসব কথা হয়তো আজকের পাঠক বুঝবেন না। আজকাল তো তোতলা দেখাই যায় না। নতুন যুগের কী সব চিকিৎসা বেরিয়েছে, মানসিক চিকিৎসা। আত্মবিশ্বাসের অভাবেই নাকি তোতলামি দেখা দেয়, যে মানুষ বড়বাবুর সামনে তোতলা, সেই আবার ছোটবাবুকে স্বতঃস্ফুর্ত গালাগাল দেয়, অনর্গল। কার সঙ্গে কথা বলছি, কী কথা বলছি, কেন কথা বলছি–এসব চিন্তা মাথায় ঢুকলে অতিশয় সাব্যস্ত ব্যক্তিও কথায় কথায় তোতলা হয়ে পড়ে। হাত কচলায়, আজ্ঞে-আজ্ঞে করে।
আমরা শৈশবে এবং কৈশোরে অনেকরকম তোতলা দেখেছি। আগে বাংলা সিনেমায় তোতলার চরিত্র ছিল বাঁধা, যাত্রা-থিয়েটারেও প্রায় তাই। আমাদের কলেজ-জীবনে বাৎসরিক সোশ্যাল ফাংশনে একবার শীতল চট্টোপাধ্যায় নাকি সন্দীপ স্যানাল (এঁদের কি এখন আর কেউ মনে রেখেছে?) একটা কমিক করেছিলেন।
শিয়ালদা স্টেশনে নৈহাটি লোকালের কামরায় জানলার ধারে এক ব্যক্তি বসে রয়েছেন, এমন সময় জনৈক তোতলা ভদ্রলোক তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, খুব কষ্ট করেই জিজ্ঞাসা করলেন, ভা-ভা-ভা-ভা-…ই, ন-ন-ন-ন-… ওই হাটি? জানলার ভদ্রলোক কোনও কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, এদিকে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। এই ব্যাপার দেখে পাশের এক ভদ্রলোক দয়া পরবশ হয়ে গলা চড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ নৈহাটি। উঠে পড়ুন, তারপর সেই নীরব জানলাধারীকে বললেন, আপনি তো আশ্চর্য লোক মশাই, ট্রেনটা যে নৈহাটি যাচ্ছে এ কথা বলতে কী খুব কষ্ট হচ্ছিল?
ভদ্রলোক বললেন, খু-উ-উ-উব কষ্ট। আ-আ-আ-মি তোতলা। পরে বোঝা গেল এই বুদ্ধিমান। তোতলা অন্য তোতলার সঙ্গে কথা বলেন না। পাছে সে ভাবে যে সে তাকে ভ্যাঙাচ্ছে। এটা তার অভিজ্ঞতা, ইতিপূর্বে অপরিচিত তোতলার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার নির্যাতিত হয়েছেন।
তোতলা বৃত্তান্ত একটু দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ গল্পে তার প্রয়োজন আছে।
তবু গল্পেই ফিরে যাচ্ছি। তার আগে সামান্য একটু বাঁয়ে। বাঁয়ে মানে কম্যুনিস্ট নেতা নাম্বুদ্রিপাদ, এই তীক্ষ্ণধী দক্ষিণ ভারতীয় ব্রাহ্মণ সুবক্তা ছিলেন এবং তোতলা ছিলেন। বক্তৃতার মধ্যে কদাচিৎ তোতলামি করেছেন, তবে করতে হলে দ্বিধা করতেন না।
একদা এক দুঃসাহসী অর্বাচীন সাংবাদিক এই নেতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, স্যার আপনি বোধহয় একটু তোতলান?
সুরসিক নাম্বুদ্রিপাদ মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, সবসময় নয়। শুধু যখন কথা বলি তখন।
০২. ফুলশয্যা
ওই ছাব্বিশ বছর বয়েসেই বিয়ে হয়েছিল তখনকার সুযোগ্যতম পাত্র বিক্রমাদিত্য মিত্রের। রীতিমতো পালটি ঘরে, সম্বন্ধ করে, কনে দেখে শুভদিনে, শুভ লগ্নে, শুভ বিবাহ। কন্যার নাম রাজলক্ষ্মী। কন্যা রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। শ্রীরামপুরের বনেদি বংশের মেয়ে শৈশবে মাতৃহীনা হয়ে দিল্লিতে মাতুলালয়ে মানুষ হয়েছে। বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে শ্রীরামপুরে চলে আসে। সেখান থেকেই বিয়ে হয়।
এর আগেই আবাল্য দিল্লিতে মাতামহীর উদার প্রশ্রয়ে রাজলক্ষ্মীর একটু অদ্ভুত ধরনের মেজাজ তৈরি হয়। আদুরে বড়লোকের মেয়েরা এরকম হয়। যা ভাবা তাই করা, সঙ্গে সঙ্গে করা, রাজলক্ষ্মীর আদুরে চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
শ্রীরামপুরের বাড়িতে এসে রাজলক্ষ্মী একটি হিংস্র চেহারার হুলো বেড়ালকে আদর যত্ন করে পোষ মানায়। বেড়ালটি সাদা কালো রঙের এবং নিশ্চয়ই খুব ঝগড়াটে এবং মারামারি পরায়ণ, যার প্রমাণ হল তার একটি কান কাটা এবং লেজের কিয়দংশ ঘেঁড়া। এই বেড়ালের নাম হুলোঝুলো। এই হুলোঝুলোই কিন্তু কাল হল।
বিয়ের পর নববধূ যে শুধু শাড়ি-গয়না, বাসন-কোসন, বিছানাপত্র নিয়েই এল তা নয়, তার সঙ্গে কোলে চড়ে এই হুলোঝুলোও বিক্রমাদিত্যের বাড়িতে এল।
প্রবীণারা বধূমাতাকে বরণ করতে গিয়ে দেখলেন নববধূর সঙ্গে একটি হুলো বেড়ালকেও বরণ করে নিতে হচ্ছে। রাজলক্ষ্মীর আঁচলের নীচেই হুলোঝুলো ছিল। বিক্রমাদিত্যের বৃদ্ধা পিসিমা যখন আদরণীয়া বউমাকে ধান-দুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে চিবুকে একটি আলতো চুমু খেতে গেলেন, তখন হুলোঝুলো ফাঁস করে উঠে বৃদ্ধার গলদেশ আঁচড়ে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।
হই-হই কাণ্ড। কেউ ডাক্তার ডাকতে গেল। কেউ টিটেনাস ইঞ্জেকশন কিনতে গেল। বিক্রমাদিত্যের অতি সাবধানী পিতৃদেব কয়েক হাজার নগদ টাকা দিয়ে বিক্রমাদিত্যের এক মামাকে, অর্থাৎ তাঁর এক শালাকে পাঠালেন যে কটা পারা যায়, অ্যান্টি র্যাবিজ ইঞ্জেকশন কিনতে। জলাতঙ্ক রোগের এই ওষুধ সবসময় পাওয়া যায় না।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিয়ের জোড়ের দক্ষিণ প্রান্তে বিক্রমাদিত্য হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে, রাজলক্ষ্মী নির্বিকার। আর এর মধ্যে হুলোঝুলো আরেক কাণ্ড করেছে। পিসিমাকে আঁচড়ে দিয়েই রাজলক্ষ্মীর কোল থেকে এক লাফে নেমে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। সেখানে একটি নতুন কাঁসার থালায়, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা মাঙ্গলিক জোড়া ইলিশ নববধূকে অভ্যর্থনা করার জন্য সাজানো ছিল।
শুঁকে শুঁকে সেই থালার কাছে গিয়ে একটি ইলিশকে লেজ ধরে টানতে টানতে হুলোঝুলো তখন রাস্তার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
