সেই সময় দিলীপবাবু দেখতে পেলেন, মোড়ের দিকের একটা বাড়ির নতুন গাড়িটা ব্যাক। করছে। আর সেই গাড়ি থেকেই এই শব্দ একটু বিলম্বিত লয়ে এবং উচ্চ গ্রামে নির্গত হচ্ছে। ধুত্তোরি বলে তিনি টেলিফোনটা নামিয়ে রাখলেন। সেই সময়েই দাঁত লাগানোর এই অঘটনটা ঘটেছে।
এ গলিতে কোনও গাড়ি ঢুকলে বেরোতে গেলে গলির শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ দিলীপবাবুর বাড়ির কাছে এসে ব্যাক করে বেরোতে হয়।
এই সেদিন পর্যন্ত এ গলিতে একটাও গাড়ি ছিল না। অথচ গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ পাড়ার বাসিন্দারা অন্তত তিন-চারটে নতুন গাড়ি কিনেছে এবং প্রত্যেকটি গাড়িই ব্যাক করার সময় কোনও-না-কোনও রকম ধ্বনিমাধুর্য রচনা করে। একটিতে নূপুর নিক্কন শোনা যায়, একটিতে বেহাগের সুর, অন্য একটি রীতিমতো ঢাক-ঢোল বাজায়। টেলিফোন বা সাইরেনের বাজনা তো আছেই। একসঙ্গে একাধিক গাড়ি ব্যাক করলে একটা ঐকতান, বিরল সুরের মূর্ধনা তৈরি হয়। ব্যাক করার সময় কখনও কখনও দুর্ঘটনা ঘটে, পথচারী বুঝতে না পেরে চাপা পড়ে। তাদের সতর্ক করে দেওয়াই বোধ হয় এসব গান-বাজনার উদ্দেশ্য।
জীবনের বেশ কয়েক বছর গাড়ির হর্নের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হতে হয়েছিল দিলীপবাবুকে। এখনও সে বিভীষিকার ঘোর কাটেনি। তবে এখনকার অবস্থাটা এখনও বিভীষিকার পর্যায়ে যায়নি।
এদিকে রামশ্যাম পিতামহের খাটের নীচ থেকে তার চটি জোড়া বার করে নিবিষ্ট চিত্তে, মনের আনন্দে দুজনে দুটো চটি চিবোচ্ছে। তাদের মুখ থেকে সে দুটো ছাড়িয়ে ভাল করে তাদের মুখ ধুইয়ে দিলীপকুমার ভাবতে লাগলেন, এদের তো অন্নপ্রাশন এসে গেল।
রোশনচৌকির ব্যবস্থা এখনও হয়নি। ব্যান্ড পার্টি, সানাই এসবের খোঁজ পাওয়া যায় কিন্তু রোশনচৌকির খোঁজ কেউ দিতে পারে না। দূরসম্পর্কের এক তালেবর শ্যালক বলেছিল, বৈদ্যবাটি শেওড়াফুলি, কোথায় যেন রোশনচৌকির দল আছে, সে খোঁজ করবে। সেই শ্যালক গতকালই এসে বলে গেছে তারা উত্তরবঙ্গে কোথায় লোক উৎসবে গেছে। আসাম হয়ে ফিরবে অন্তত দুমাস পরে।
কিন্তু অন্নপ্রাশন তো পিছোনো যাবে না। কুলাচার বলে কথা তা ছাড়া পৌত্রদ্বয় এর মধ্যে চটি চিবোনো শুরু করেছে, এদের এখনই ভাত ধরানো দরকার।
.
সহসা দিলীপবাবুর চিন্তাজাল ছিন্ন হল কীর্তনের সুরে। আরেকটি গাড়ি ব্যাক করছে। একেবারে নতুন গাড়ি, আজকালের মধ্যে কেনা। প্রতিবেশীদেরই কারও হবে।
কীর্তনের সুরে গাড়ির ব্যাক করা দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা আশ্চর্য বুদ্ধি ঝিলিক দিয়ে গেল দিলীপবাবুর মাথায়।
রোশনচৌকির দরকার কী? এই সব গাড়ি ব্যবহার করলেই হয়।
সেদিনই সন্ধ্যায় করিৎকর্মা দিলীপবাবু নতুন গাড়ি কেনা প্রতিবেশীদের বাড়িতে গেলেন। নাতিদের অন্নপ্রাশনের কথা বললেন, নিমন্ত্রণ করলেন। তারপর অন্নপ্রাশনের দিন সকালবেলা দুঘণ্টা এবং সন্ধ্যায় তিন ঘণ্টার জন্যে তাঁদের গাড়িগুলি চাইলেন।
উৎসবে-অনুষ্ঠানে প্রয়োজনবশত আত্মীয়, প্রতিবেশীর কাছে লোকে এমন গাড়ি চায়। সবাই রাজি না হলেও দু-তিনজন রাজি হলেন। শুধু একজন জিজ্ঞাসা করলেন, কতদূর যাবে?
ব্যাপারটা না ভেঙে দিলীপবাবু বললেন, এই কাছেই। বলতে গেলে পাড়ার মধ্যেই।
রোশনচৌকির বন্দোবস্ত হয়ে গেল। হৃষ্টচিত্তে প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করে দিলীপবাবু বাড়ি ফিরে এলেন।
.
আমিও দিলীপবাবুর একজন প্রতিবেশী। একই গলিতে থাকি। নতুন-পুরনো কোনও রকম গাড়িই আমার নেই। কিন্তু দিলীপবাবু আমাকে ভালবাসেন, পছন্দ করেন। রাতের দিকে এসে আমাকেও নিমন্ত্রণ করে গেলেন। অনেকক্ষণ বসলেন। অনেক কথা বললেন। তার মধ্যে এই গল্পের ঘটনাটি রয়েছে। গল্পের খাতিরে কিছু হেঁটেছি, কিছু জুড়েছি।
এখন অপেক্ষা করছি, রাম-শ্যামের শুভ অন্নপ্রাশনের দিনের জন্যে। না, ভুরিভোজনের লোভে নয়। গাড়িগুলির রোশনচৌকি কেমন জমজমাট হয়, গাড়ির মালিকেরা তাদের নতুন মোটর গাড়ির বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটা কেমন ভাবে গ্রহণ করেন–সেসব ব্যাপার তো থাকছেই।
তা ছাড়া দিলীপবাবুর পরিকল্পনা যদি সামান্য মাত্রও সফল হয়, সিনেমা-থিয়েটার-দূরদর্শনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যাকে বাংলায় বলে নেপথ্য সংগীত, তার বন্দোবস্ত, এমনকী আবহসংগীতের বন্দোবস্তও অতঃপর কয়েকটি সংগীতময় গাড়ি পর পর ব্যাক করিয়ে করা যাবে।
দিলীপবাবু রাজি হলে তার সঙ্গে যুগ্মভাবে আমি এই বাজনার পেটেন্ট নেব এবং সেই। পেটেন্টের নাম দেব রোশনচৌকি।
লক্ষ্মীর প্রত্যাবর্তন
০১. তোতলামি
ইংরেজিতে এলিজিবল ব্যাচেলর বলে একটি কথা আছে, যার সরাসরি মানে হল যোগ্য কুমার অর্থাৎ যোগ্য পাত্র।
বিয়ের বাজারে সুপাত্রের এইভাবে পরিচয় দেওয়া হয়। তবে এর পরেও আছে মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর যার মানে হল সবচেয়ে যোগ্য পাত্র।
একদা কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে, নব যৌবনে বিক্রমাদিত্য মিত্রকে অনায়াসে মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর বলা যেত। কুলীন কায়স্থ, উচ্চ বংশ। লম্বা, ফরসা, ঠিক উত্তমকুমারের মতো দেখতে না হলেও বেশ সুদর্শন। শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ার, ভাল রেজাল্ট। একটা বিলিতি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে পাশ করতে না করতে ভাল চাকরি। বয়স মাত্র ছাব্বিশ।
সুতরাং সবদিক থেকে সর্বার্থে তখন সুযোগ্য পাত্র ছিলেন বিক্রমাদিত্য। বলা উচিত, ব্যাকরণ ভুল হলেও, সুযোগ্যতম পাত্র, যাকে ওই ইংরেজিতে বলে মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর।
