তা কুসংস্কারের মুখে ছাই দিয়ে দিলীপবাবুর পৌত্রদ্বয় এগারো মাস বয়েসের কাছে সজ্ঞানে, সুস্থ শরীরে পৌঁছে গেছে। এবার তাদের অন্নপ্রাশন দিতে হয়।
নাতি দুটির দিলীপকুমার নামকরণ করেছেন রাম-শ্যাম। সেই কতকাল আগে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিলেন, রাম ঔর শ্যাম। দুই যমজ ভাইয়ের গল্প। সেই অনুসারে নাতিদের এই নামকরণ, তা বলা যাবে না তা নয়। তবে এর মধ্যে সাবেকি ব্যাপারও আছে। একজন সত্তর বছরের বৃদ্ধের ঈশ্বরভক্তি শুধু নয়, প্রাচীন নামের প্রতি দুর্বলতাও এর মধ্যে জড়িত।
দিলীপকুমার বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তিনি জানেন পিতামহ-প্রদত্ত এই নাম দুটি টিকবে না, এই নাম দুটির পরমায়ু পিতামহের আয়ু পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই মামার বাড়ি থেকে শিশুদুটির নামকরণ হয়ে গেছে, লালকমল আর নীলকমল। যতদূর মনে হয় দিলীপকুমার, শেষ পর্যন্ত এই দুটো নামই বহাল থাকবে। আজকাল এই রকম লম্বা নাম খুব চলছে।
.
এসব নিয়ে দুঃখ নেই দিলীপবাবুর।
পাঁজিতে একটা ভাল দিন পাওয়া গেছে। পুরুতমশায়ের সঙ্গে কথাও হয়েছে। সামনের মাসেই রাম-শ্যামের অন্নপ্রাশনের তারিখ ধার্য করেছেন।
নিমন্ত্রণপত্র অবশ্য ছাপতে দেননি। মুদ্রিত পত্রের চেয়ে হাতে লেখা চিঠির আবেদন ও দাবি বেশি। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে আর বিজয়া দশমীতে ডাকঘর থেকে গোছাগোছা পোস্টকার্ড কিনে আনেন, তার অনেকটাই পড়ে থাকে। যত দিন যাচ্ছে চিঠি দেয়ার লোক তত কমে যাচ্ছে।
এখন বছর বছর পোস্টকার্ডের দাম বেড়ে যাচ্ছে। একদিন যে পোস্টকার্ডের দাম ছিল পুরনো দুপয়সা, তিন পয়সা, এখন সেই দাম আট-দশ গুণ হয়ে গেছে।
এসব পুরনো পোস্টকার্ড এইবার ব্যবহার করলে অনেকটা লাভ হবে ভেবেছিলেন দিলীপবাবু, কিন্তু সে গুড়ে বালি। ডাকঘর থেকে জেনে এলেন তিনি, পুরনো পোস্টকার্ড ব্যবহারে আপত্তি নেই কিন্তু এখনকার মাসুলের সমপরিমাণ স্ট্যাম্প লাগাতে হবে।
তা দিলীপবাবু কৃপণ ব্যক্তি নন, বিশেষ করে নাতিদ্বয়ের অন্নপ্রাশনের ব্যাপারে কোনও কার্পণ্য তিনি করবেন না। এমনকী তিনি এও ঠিক করেছেন যে অন্নপ্রাশনের দিন সকাল থেকে বাড়িতে রোশনচৌকি বসাবেন।
রোশনচৌকি, সানাই-ঢোলকঁসির সমন্বয়ে বাদ্যতান, রক্তমাংসের সব বাজনদার। আজকাল উৎসবে-অনুষ্ঠানে এদের আর দেখাই যায় না। দিলীপবাবুর বিশেষ ইচ্ছা এই রোশনচৌকি, নাতিদের অন্নপ্রাশনে যেখান থেকে তোক নিয়ে আসতে হবে।
রোশনচৌকি নিয়েই এই গল্প। সে প্রসঙ্গ অবশেষে আসবে।
আপাতত দৈনিক পনেরো-বিশটা পোস্টকার্ড নিজের হাতে লিখে আত্মীয়-বান্ধবদের পাঠাচ্ছেন যুগোপযোগী ডাকমাসুল সমেত। যেমন হয়, পৌত্রদ্বয়ের অন্নপ্রাশনের দিন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। এই আনন্দ-উত্তেজনার মধ্যে দুটি জিনিস দিলীপকুমারকে পীড়িত করছে।
প্রথমটি হল তার দাঁত।
নতুন দাঁতজোড়া একেক সময় খুব কষ্ট দিচ্ছে। কাল সকালেই একটা ব্যাপার হয়েছিল।
প্রত্যহ সকালে হাত-মুখ ধুয়ে তজোড়া মুখে পরে চা খেতে খেতে এবং খবরের কাগজ পড়তে পড়তে নাতিদের কাছে ডাকেন দিলীপকুমার, রামশ্যাম, রামশ্যাম।
রাম-শ্যাম তখন যেখানেই থাকুক, তারা নিয়মিত অভ্যাস মতো এই ডাকের অপেক্ষা করে। ঠাকুরদার ডাক শোনামাত্র তারা দ্রুত হামা দিয়ে কিংবা টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় ছুটে আসে।
আজ সকালেও অনুরূপভাবে রামশ্যাম, রামশ্যাম বলে নাতিদের ডাকলেন। তারা কাছেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল।
কিন্তু দাঁতের পাটি জোড়া আজ খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে, মুখের মধ্যে ভাল বসেনি, নীচের পার্টিটা তো জিবকে চেপে ধরেছে আর ওপরের পাটি আর টাকরার মধ্যে বেশ খানিকটা ফাঁক।
তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ডাকলেন, রামশ্যাম শোনাল যেন মরা মশা। পরীক্ষা করার জন্যে নাতিরা সামনে আসার পরেও তিনি আরও দুবার রামশ্যাম করে ডাকলেন, দুবারই শোনাল মরা মশা-মরা মশা। রাম আর শ্যাম শব্দ দুটো একেবারে উলটে গেছে।
রান্নাঘরে পুত্রবধূ কাজে ব্যস্ত থাকে এই সময়। এই বিপরীত উচ্চারণ তার কানে পৌঁছায়নি। কিন্তু দিলীপবাবু দ্বিতীয় দফায় রামশ্যামকে ডাক দেওয়ায় ভাবল, রামশ্যাম দাদুর কাছে যায়নি নাকি? কোথায় গেল?
সে রান্নাঘর থেকে শ্বশুরের ঘরে ছুটে এল, এসে দেখে নিশ্চিত হল রামশ্যাম সঠিক জায়গাতেই এসেছে। দাদুর খবরের কাগজের ক্রোড়পত্রটি মেজের ওপরে নিয়ে দুজনে ছিঁড়ে কুটিকুটি করছে। মূল কাগজটা অবশ্য বহুকষ্টে বাঁচিয়ে দিলীপবাবু উঁচু করে পড়ছেন।
বউমাকে দেখে খবরের কাগজটা মুখের সামনে থেকে সরালেন। রামশ্যামের মা শ্বশুরমশায়ের মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে, মুচকি হাসি শাড়ির আঁচলে চাপা দিয়ে বলল, বাবা বোধহয় দাঁত জোড়া উলটো করে পরেছেন। এই বলে রান্নাঘরে যথাস্থানে প্রত্যাবর্তন করল।
বউমা চলে যেতে দাঁতজোড়া খুলে দিলীপকুমার দেখলেন বউমার কথাই ঠিক। এবং এটাও বুঝতে পারলেন এই ওলটানো সঁতের জন্যেই শব্দগুলো মুখ থেকে উলটো হয়ে বেরিয়েছে। তাড়াতাড়ি ঠিকমতো লাগিয়ে নিলেন এখন আর অস্বস্তি নেই, ব্যথা করছে না।
কিন্তু কেন এমন হল?
দিলীবাবু চিন্তা করে দেখলেন একটু আগে দাঁত লাগানোর সময় একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি যখন দাঁতজোড়া মুখে লাগাতে যাচ্ছেন সেই সময় একটা টেলিফোন এল। এত সকালবেলার টেলিফোনে অনেক সময় গোলমেলে খবর, দুঃসংবাদ আসে। তিনি ছুটে গিয়ে টেলিফোনটা ধরলেন, তখনও ফোনটা বাজছে আবার ডায়াল টোনও শোনা যাচ্ছে।
