তবুও একরকম কষ্ট করেই তিনমুখী মোড়ের একতলার সামনের ফ্ল্যাটে দিন কাটাচ্ছিলেন চৌধুরী পরিবার। মূল চৌধুরী অর্থাৎ দিলীপবাবুর বাবা কয়েক বছর আগে বিগত হয়েছেন, মা মারা গেছেন তারও আগে। এর মধ্যে পত্নীও বিগত হলেন।
একমাত্র ছেলে তখন বড় হচ্ছে। স্কুল পার হয়ে কলেজে পড়ছে। দিলীপবাবুরও চাকরি থেকে অবসরের দিন সমাগত। কোনওরকমে এই বাসায় শুধু কম ভাড়া আর বালিগঞ্জ পাড়ার মোহে দিনাতিপাত করছিলেন দিলীপবাবু।
কিন্তু শেষের দিকে এমন একটা অবস্থা দাঁড়াল যে এখানে থাকা অসহ্য হয়ে উঠল।
পাশের পাড়ার এক মিস্ত্রি ভদ্রলোক ঠিক উলটো দিকের বাড়ির গ্যারেজটা ভাড়া নিলেন। তিনি উত্তরপাড়ার মোটর কোম্পানিতে কাজ করেন, সেটা দিনের বেলা। অফিস থেকে ফিরে ঘণ্টা কয়েক ঘুমিয়ে তিনি তার গ্যারেজ তথা কর্মশালা খোলেন রাত এগারোটা নাগাদ।
ভদ্রলোক গাড়ির হর্ন সারানো এক্সপার্ট। মোটর কোম্পানিতে হর্ন-সারাই সেকশনে দীর্ঘকাল যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করছেন, এ কাজে তার বিপুল অভিজ্ঞতা।
সেই অভিজ্ঞতার খেসারত দিতে হল পাড়া-প্রতিবেশীদের। খুব বেশি চাপ পড়ল ঠিক সামনাসামনি ফ্ল্যাটের আমাদের এই দিলীপবাবুর ওপরে।
রাত এগারোটার পর থেকে হর্ন খারাপ যত ট্যাক্সি আছে, সেগুলো সারাই হতে আসে এই গ্যারেজে।
খারাপ হর্ন বাজিয়ে কিংবা বাজানোর চেষ্টা করে প্রথমে দেখা হয় কী খারাপ হয়েছে, কতটা খারাপ হয়েছে। কোনও কোনও গাড়ির হর্ন এতটাই খারাপ হয়েছে যে একবার বাজতে শুরু করলে আর বন্ধ হতে চায় না। কোনওটা প্রহৃত জন্তুর মতো আর্তনাদ করতে থাকে।
আবার সারানোর পরেও ঝামেলা কম নয়। ড্রাইভারেরা বাজিয়ে বাজিয়ে পরীক্ষা করে নেয় কেমন সারানো হল।
এইরকম চলে রাত তিনটে-চারটে পর্যন্ত। প্রতিদিন বিনিদ্র রজনী যাপন করে, শব্দের অত্যাচারে জীবন ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল দিলীপকুমার চৌধুরীর।
ভাগ্যক্রমে এই সময়ে শহরতলির জমিটা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। যথাসাধ্য দ্রুত ছোট একটা একতলা বাড়ি করে ভাড়াটে বাড়ির লোভ বিসর্জন দিয়ে চলে এলেন।
সাড়ে তিনখানা ঘরের ছোট বাড়ি। কিন্তু তাতে দিলীপবাবুর কোনও অসুবিধে নেই, তাঁর সংসারও ছোট। বছর আড়াই আগে এ বাড়িতে এসে ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। গত বছরে বউমা একসঙ্গে দুটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এই দুজনকে ধরে ছেলে, ছেলের বউ আর তিনি সবসুদ্ধ এই পাঁচজনের সংসার।
বাড়িটা ছোট করা হয়েছে বলে পাশে এক চিলতে জমি কঁকা আছে। সেখানে নানা জাতের দিশি ফুলগাছ লাগিয়েছেন, জবা, টগর, গন্ধরাজ, কামিনী এই সব চেনা গাছ। এ কয় বছরে গাছগুলো বড় হয়েছে, আজকাল বেলফুল আসছে।
এ ছাড়া দুটো গাছ একা একাই জন্মেছে। তার একটা পেয়ারা অন্যটা আমগাছ। গাছ দুটো আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। পেয়ারা গাছটায় এর মধ্যেই ফল ধরতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে এ বাড়িতে বেশ ভাল আছেন দিলীপবাবু। নাতি দুটো সাড়ে দশ মাস বয়েস হল। তারা সারাদিন ঘরের মধ্যে হামাগুড়ির প্রতিযোগিতা দিচ্ছে। কখনও টলমল হাঁটার চেষ্টা করছে। পড়ে যাচ্ছে, কাঁদছে। এটা ছিঁড়ছে, ওটা ভাঙছে।
বউমা গৃহকর্মনিপুণা। শ্বশুরের যত্ন নেয়। স্বামীর সঙ্গেও বেশ বনিবনা আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বড় আরাম এই বাড়িতে কারণ এখানে শব্দের যন্ত্রণা নেই। অন্তত এতদিন পর্যন্ত ছিল না। সেই পুরনো পাড়ায় মোটর গাড়ির হর্ন-তাড়িত বিভীষিকাময় রাত্রিগুলি এখন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
এ পাড়ায়, কয়েক বছর আগে যখন প্রথম এসেছিলেন দিলীপকুমার চৌধুরী, কারওই কোনও গাড়ি ছিল না। দুয়েকজনের অফিসের গাড়ি আসত, নিয়ে যাওয়া দিয়ে-যাওয়ার জন্যে। কখনও কখনও কোনও বাড়িতে, দিলীপবাবুর বাড়িতেও আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আসত। কিন্তু সে তো স্বাভাবিক ব্যাপার। শ্রবণেন্দ্রিয়ের কোনও অত্যাচার হত না।
তবে এ বয়েসে যেমন হয়ে থাকে, আজ কয়েক মাস হল সঁতের যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন দিলীপবাবু। কখনও এ মাড়ির দাঁত যন্ত্রণায় কাতর করে তোলে, কখনও ও মাড়ি ফুলে যায়। চোয়ালের নীচ পর্যন্ত টনটন করে। কখনও ওপরের পাটির দাঁত কষ্ট দেয়, কখনও নীচের পাটির ক্ষয়ে যাওয়া, ভাঙা দাঁতের ধারে জিব ছড়ে ঘায়ের মতো হয়ে যায়। জিবে ব্যথা হয়, ঝাল কিছু খেতে গেলে জ্বালা করে।
অবশেষে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দিলীপবাবু সব কয়টি দাঁতই তুলে ফেলেছেন। কয়েকদিন ফোকলা দাতে থাকার শিশুসুলভ আরাম অনুভব করার পরে দাঁতজোড়া বাঁধিয়ে নিয়েছেন। তেমন ফিট করেনি।
প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হত। দুয়েকবার দাঁত ব্যথাও হয়েছে। এখন প্রায় সয়ে এসেছে।
.
নাতি-অন্ত-প্রাণ দিলীপবাবুর।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে সন্ধ্যায় শিশুদুটি না ঘুমানো পর্যন্ত তিনি তাদের আগলে রাখেন। অপত্য স্নেহমাধুর্যে অবসরপ্রাপ্ত শূন্য জীবনের বিলম্বিত সময় চমৎকার উতরিয়ে যায়।
সাড়ে দশ মাস বয়েস হলেও নাতি দুটোর এখনও অন্নপ্রাশন হয়নি। মুখেভাত বা অন্নপ্রাশনের নিয়ম একেক পরিবারে একেক রকম। কোথাও চার মাসে বা ছয় মাসে মুখেভাত হয়, কোনও বাড়িতে আট মাসে, অনেক জায়গায় দশ মাসেও শিশুর অন্নপ্রাশন হয়। কিন্তু গোকুলপুরের চৌধুরীদের মানে দিলীপবাবুদের পরিবারে এগারো মাসে অন্নপ্রাশনের বিধি। কবে কোন দূর অতীতকালে চৌধুরীবাড়ির শিশুগুলি জন্মানোর পরে আট-দশ মাস বয়েস হতে না হতে পট-পটাৎ করে মরে যেত। তাই এই সতর্কতা, এগারো মাস পর্যন্ত না দেখে এই বংশের বাচ্চাদের অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠান করা হয় না।
