রম্যনাথবাবু লক্ষ করলেন ট্রেনটির গার্ডসাহেব, টিকেট চেকারসাহেব এমনকী রেলবাজার স্টেশনের স্টেশন মাস্টারমশায় পর্যন্ত গম্ভীর হয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনটির এগোনো পিছন পর্যবেক্ষণ করছেন, এবং মাঝেমধ্যেই গাড়িটির এবম্বিধ আচরণে হর্ষধ্বনি করছেন।
অবশেষে ধৈর্য, ওই যাকে বলে সহ্য করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেল রম্যনাথবাবুর। সপ্তমবারের পর। অষ্টমবার যখন ট্রেনটি ব্যাক করে আবার স্টেশনে প্রত্যাবর্তন করল রম্যনাথবাবু চিৎকার করে কর্কশ গলায় প্রশ্ন করলেন, স্টেশনে দণ্ডায়মান স্টেশন মাস্টারবাবু এবং অন্যান্য রেলকর্মচারীদের, এ কী রকম রেলগাড়ি মশায়? এটা কি ইয়ার্কি হচ্ছে আধ ঘণ্টা ধরে?
স্টেশন চত্বর থেকে গার্ডসাহেব জবাব দিলেন, মোটেই ইয়ার্কি নয়।
গার্ডসাহেবের কণ্ঠস্বর আর শোনা গেল না। ততক্ষণে ট্রেন আবার সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। তবু একটু পরেই ট্রেনটি স্টেশনে ব্যাক করে ফিরে আসতেই আগের উত্তরের খেই ধরে রম্যনাথবাবু জানলা দিয়ে মুখ বার করে গার্ডসাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়ার্কি নয়? এটা কি ছেলেখেলা নাকি? বারবার ছাড়ছে, ফিরে আসছে, ফিরে আসছে, ছাড়ছে।
এবার আর গার্ডসাহেব নয় স্বয়ং স্টেশন মাস্টার মশায় জবাব দিলেন, মোটেই ছেলেখেলা নয়। আমাদের রেলগাড়ির ড্রাইভারসাহেব তার ছেলেকে রেলগাড়ি চালানো শেখাচ্ছেন।
এর জবাবে হতভম্ব রম্যনাথবাবু কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন ততক্ষণে ট্রেনটা আবার হুশহুশ করে ছেড়ে দিয়েছে। তাড়াতাড়ি ছুটে গার্ডসাহেব ও টিকেটসাহেবও ট্রেনটায় উঠে পড়লেন। ট্রেনটা সত্যিই ছাড়ল। ষাট মিটারের সীমা অতিক্রম করে রেলবাজার প্যাসেঞ্জার এতক্ষণে রওনা হল।
তবু রম্যনাথবাবুর মনে একটা খটকা রয়েছে। রেলগাড়িটা কে চালাচ্ছে, ড্রাইভারসাহেব না ড্রাইভারসাহেবের ছেলে?
রোশনচৌকি
সত্তর বছর বয়েস কম কথা নয়। এই মাত্র গত মাসে সত্তর বছর পূর্ণ হল দিলীপকুমারের। পাঠক-পাঠিকা ভুল ভাববেন না। আমাদের গল্পের দিলীপকুমার কোনও চিত্রতারকা নন, নেহাতই আটপৌরে দিলীপকুমার চৌধুরী, নেহাতই আটপোরে বিপত্নীক ভদ্রলোক, অবসরপ্রাপ্ত রেলওয়ে। অফিসার।
দিলীপকুমারের স্ত্রী বিগত হয়েছেন অনেকদিন। এ বাসায় আসার কয়েকবছর আগে।
এ বাসায় মানে কলকাতা শহরের পূর্বপ্রান্তে জলাজমিতে গড়ে ওঠা নতুন শহরতলির বাসা। নোনা জলের হ্রদ বুজিয়ে তৈরি উপনগরী। বছর কয়েক আগে এখানেই বাসা বেঁধেছেন। দিলীপকুমার।
সরকারি জমি, তবে সরকারি আনুকূল্যে জমিটা পাননি দিলীপবাবু। জমিটা তিনি পেয়েছিলেন রীতিমতো একশো টাকার টিকিট কিনে লটারির মাধ্যমে নিতান্ত ভাগ্যবলে।
বাড়ির জমিটা বেশ ভাল। সোয়া তিন কাঠা। দক্ষিণমুখী বা পূর্বমুখী জমি পাননি। তবে এরকম খোলামেলা জায়গায় পূর্ব-দক্ষিণ ইত্যাদি কোনও ব্যাপার নয়, রোদ-হাওয়া সব বাড়িতেই প্রায় সমান সমান।
দিলীপবাবুদের ছোট গলিটা বড় রাস্তা থেকে বেরিয়ে দুপাশে দশ-দশটা প্লট পেরিয়ে একটা পার্কের দেয়াল পর্যন্ত এসেছে। সেখানেই শেষ, ইংরেজিতে যাকে বলে ব্লাইন্ড লেন।
এই ব্লাইন্ড লেনের শেষ প্লটটাতেই দিলীপবাবুর ছোট একতলা বাড়ি। সামনে এক চিলতে বাগান, দুপাশে দুটো নারকেল গাছ। পাশের পার্কের সুবিধেও যথেষ্ট পাওয়া যায়। পার্কে বিকেলের দিকে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা খেলা করে। বাকি সময় প্রায় ফাঁকাই থাকে।
শীতের সকালে খবরের কাগজ নিয়ে পার্কের রোদে গিয়ে বসেন দিলীপবাবু। আবার গরমের সন্ধ্যায় খোলা বাতাসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীর জুড়িয়ে নেন।
সবচেয়ে বড় কথা এদিকটায় শব্দদূষণ নেই। নেই বলাটা অবশ্য সঠিক হচ্ছে না, বলা উচিত শব্দদূষণ ছিল না।
.
এই শব্দ-দূষণের জন্যেই বালিগঞ্জের পুরনো পাড়া ছেড়ে কষ্ট করে জমি সংগ্রহ করে, কষ্ট করে বাড়ি তৈরি করে বুড়ো বয়েসে এতদূর চলে এসেছেন দিলীপবাবু।
ভাড়াবাড়ি ছিল সেটা। একতলায় বড় বড় তিনটি ঘর। উঠোন, উঠোনের একপাশে রান্নাঘর, অন্য পাশে কলঘর। বাবার আমল থেকে পঞ্চাশ বছর সে বাড়িতে বাস করেছেন দিলীপবাবু। পঁয়তাল্লিশ টাকা ভাড়া ছিল যখন ওই বাসায় বাবা ঢুকেছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত আশি টাকা হয়েছিল। বাড়িওয়ালার কোথাও কেউ ছিল না। তার মৃত্যু হয়। সেও বছর পনেরো আগে। শেষের দিকে বাড়িভাড়ার টাকা নেওয়ার কেউ ছিল না। মৃত বাড়িওয়ালার দুই দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যে বাড়ি নিয়ে ঝগড়া, মারামারি, মামলা। শেষে বাড়িভাড়া আদালতে দিতে হত।
এমন চমৎকার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে কেউ কষ্ট করে নিজের বানায়? কিন্তু দিলীপকুমার ভাড়াবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
না। বাড়িওয়ালা কোনও অত্যাচার করেননি। তিনি আর কী অত্যাচার করবেন, তিনি তো পরলোকে। আর তার জীবিত আত্মীয়দের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে ভাড়াটের ওপর ঝামেলা করার আর সময় ছিল না।
দিলীপবাবুকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল শব্দের অত্যাচারে। একালে যাকে শব্দদূষণ বলা হয় সেই শব্দদূষণের ভয়াবহ শিকার হয়েছিলেন তিনি।
ঘটনাটা বুঝিয়ে বলছি।
.
দিলীপবাবুরা থাকতেন পুরনো বালিগঞ্জে। হাজরা রোডের দক্ষিণ দিকে চোরাগোপ্তা, আঁকাবাঁকা অনেক গলি রয়েছে। তারই একটিতে একটা গলির তিনকোনাচে বাঁকা সস্তা ভাড়ায় ভালই ছিলেন বহুকাল। তবে এ রাস্তাগুলোকে আজকাল আর রাস্তা বলে চেনা যায় না। সবই মোটর গাড়ি সারানোর গ্যারেজ। বনেট খোলা গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার মধ্যিখানে, চারদিকে গাড়ির টায়ারটিউব, যন্ত্রপাতি, গাড়ি সারানোর যন্ত্রপাতি। গাড়ি নিয়ে আজকাল এসব রাস্তায় প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। পায়ে হেঁটে যাতায়াতও খুব সাবধানে করতে হয়।
