পুনশ্চ: গল্পে পনুশ্চের নিয়ম নেই। কিন্তু একটি খবর দিতে চাই। অবিলম্বে বেস্ট সেলার হবে শোভনা পালিতের প্রথম গ্রন্থ, রাধি মাছ, না ছুঁই তেল। তৈল বর্জিত মাছ রান্নার ষাটটি পদের সচিত্র রন্ধন প্রণালী জনপ্রিয় না হয়ে যায় না।
রেটটা একটু কমান
শ্ৰীযুক্ত হরিমোহন চক্রবর্তী একজন ছাপোষা মানুষ। কলকাতায় একটি সরকারি চাকরি করে কোনওরকমে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চালান।
হরিমোহনবাবু নিজেকে খুব বুদ্ধিমান লোক বলে কখনওই মনে করেন না। এবং সত্যিই তিনি হয়তো বাজার-চালু চৌকশ লোক যেমন সচরাচর দেখা যায় তার মধ্যে পড়েন না। মোটামুটি ধুতি পাঞ্জাবি পরা উত্তর কলকাতার দুঘরের ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাস করা নিজের হাতে প্রতিদিন শাক কাঁচালঙ্কা তরকারি ছোট মাছ বাজার করা নিতান্ত আটপৌরে মানুষ হরিমোহনবাবু।
এই ক্ষুদ্র কথিকায় আমরা হরিমোহনবাবুর দেশকাল, অফিস-পরিবার, ভূত-ভবিষ্যৎ ইত্যাদির মধ্যে মাথা গলাব না। সেটুকু কাল্পনিক দায়িত্ব পাঠক-পাঠিকার উপরে ন্যস্ত করলাম। তবে আসল গল্পে প্রবেশ করবার আগে খুব বেশি চালাক বা বুদ্ধিমান না হওয়ার জন্যে হরিমোহনবাবুর যে কোনও ক্ষতি হয়নি তার একটা উদাহরণ দেব।
জুন মাসের পর থেকে কলকাতার ময়দানের ফুটবল দর্শকদের ভিড়ে ও অত্যাচারে অফিস ছুটির পর নিয়মিত অফিস যাত্রীদের ট্রামে-বাসে চড়ে ঘরে ফেরা অসম্ভব হয়ে ওঠে। হরিমোহনবাবু মোটেই ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি করে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন না। এদিকে ছুটির পর অফিসে বসে থাকাও তাঁর মোটেই পছন্দ নয়। তিনি একটা বুদ্ধি বার করেছেন–রেড রোড আর মেয়ো রোডের মোড়ে যেখানে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিটা বর্তমানে আছে, সেই মূর্তির পাদদেশে একটা রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বিশ্রাম করেন, কখনও পঞ্চাশ পয়সার বাদাম বা ঝালমুড়ি কিনে খান।
সেদিনও ওই রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। দুপুরে অফিসে খুব ঝকমারি গেছে, খুব ক্লান্ত ছিলেন, ময়দানের স্নিগ্ধ বাতাসে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, ঘুম ভাঙল হঠাৎ একটা লোকের ঝাঁকুনিতে।
ধড়মড় করে উঠে হরিমোহনবাবু দেখেন যে তাঁর সামনে উঁচু হয়ে বসে একটা লোক। লোকটার পরণে লাল প্যান্ট, সবুজ গেঞ্জি, গলায় হলুদ রুমাল গিট দিয়ে বাঁধা, হাতে একটা পিস্তল, মুখে হিন্দি না উর্দু কী একটা ভাষা।
ভাষার দরকার ছিল না। অন্য যে কোনও ব্যক্তি এক মুহূর্তে ধরতে পারবে এই পিস্তলধারী একজন ডাকাত, চলতি ভাষায় ছিনতাইকারী। সে হরিমোহনবাবুকে ঘড়ি আংটি পকেটের মানিব্যাগ– ইত্যাদি দিয়ে দেবার জন্যে ভয় দেখাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, হরিমোহনবাবু ভিন্ন অন্য যে কোনও ব্যক্তি হলে প্রাণভয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি আংটি, টাকা লোকটির হাতে তুলে দিয়ে বড় রাস্তার দিকে চোঁ চোঁ দৌড় দিত।
কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, হরিমোহনবাবু তেমন বুদ্ধিমান লোক নন। ঘুম-চোখে তার মনে হল, লোকটির চেষ্টা বোধহয় তার কাছে রিভলভারটি বিক্রি করার, তাই চোখের সামনে ওই অস্ত্রটা নাচাচ্ছে। হরিমোহনবাবুর ঘুণাক্ষরেও মনে এল না যে, লোকটা ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করার জন্যে রিভলভারটা তাক করেছে।
ছিনতাইকারী যত রিভলভার নাচায় হরিমোহনবাবু তত বলেন, হাম গভরমেন্ট সারভেন্ট হ্যায়। বে-আইনি আগ্নেয়াস্ত্র হামকো নেহি লাগে গা।
পিস্তলধারীর রিভলভার নাচাতে নাচাতে হাতে ব্যথা হয়ে গেল, কিন্তু হরিমোহনবাবু যে ভাবে তাঁর হরি ঘোষ স্ট্রিটের একতলার ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে হাত নেড়ে দৈনিক অসংখ্য ফেরিওলাকে বিদায় করেন নেহি লাগে গা, নেহি লাগে গা বলে, ঠিক সেই একই ভঙ্গিতে উদ্যত পিস্তলের ছয় ইঞ্চি দূরে হাত তুলে মানা করতে লাগলেন, নেহি লাগে গাবলে। মিনিট দশেক পরে হতভম্ব, ক্লান্ত পিস্তলধারী দূর শালা বলে রণে ভঙ্গ দিল, হরিমোহনবাবু ধীরেসুস্থে উঠে শ্যামবাজারের ট্রামের দিকে এগোলেন, একবার শুধু ভাবলেন, কী দিনকাল পড়েছে রে বাবা! জিনিস না কিনলে শালা বলে গালাগাল দিচ্ছে।
হরিমোহন চক্রবর্তী মশায়কে নিয়ে আমাদের গল্প, সে কিন্তু এখানে নয়, এর থেকে আরেকটু পরে–ঠিকঠাক বলা উচিত চার মাস পরে।
চক্রবর্তী মশায়ের ছোট বোন থাকেন রাঁচিতে। পাগলা গারদে নয়, সেখানে তাঁর বিয়ে হয়েছে। কয়লা কোম্পানির এক এঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। হরিমোহনবাবুই বোনটির বিয়ে দিয়েছেন, তার ছেলের অন্নপ্রাশন। মামা হিসেবে হরিমোহনবাবুর উপস্থিতি আবশ্যক, কারণ মুখেভাত তাঁকেই করাতে হবে।
কলকাতা-রাঁচির দূরপাল্লার সরকারি বাসে একটা টিকিট কেটে হরিমোহনবাবু অন্নপ্রাশনের ঠিক দুদিন আগে উঠে বসলেন। চমৎকার যাচ্ছিল বাসটা। হরিমোহনবাবু সামনের দিকে সিট পেয়েছিলেন, বিশেষ ঝাঁকুনি লাগছিল না। সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চমৎকার আরামেই যাচ্ছিলেন তিনি।
তখন অনেক রাত। বাংলা-বিহার সীমান্ত এলাকা প্রায় আধ ঘন্টা আগে পেরিয়ে গেছে বাস। আধা জংলি এলাকা দিয়ে দ্রুতগতি ছুটে চলেছে সরকারি দূরপাল্লা। আধো-জাগরণ, আধো-তন্দ্রার মধ্যে কিছুটা চেনা স্বপ্নের মতো কী যেন মনে হল হরিমোহনবাবুর।
সেই লাল প্যান্ট, সবুজ গেঞ্জি, হলুদ রুমাল, হাতে পিস্তল–চার মাস আগে ময়দানে দেখা। লোকটির বাসের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর এদিকে ওদিকে সিটে পাঁচ-সাতজন ব্যক্তি উঠে এসেছে, তাদের হাতেও পিস্তল অথবা ছোরা। এতক্ষণ এরা যাত্রী সেজে সকলের সঙ্গে বসেছিল।
