একদিস্তে ফুলস্কেপ কাগজ কিনে কোমর বেঁধে এবার গল্প লেখায় হাত দিলেন সুশোভন। গল্প লেখার চেষ্টায় সময় ভালই কাটতে লাগল। ঠিক অফিসের মতো সকাল দশটায় স্নান খাওয়া করে টেবিলে বসেন, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ওঠেন।
শুধু পালগৃহিণী গজগজ করতে লাগলেন, রিটায়ার করার পরও আমাকে অফিসের ভাত রাঁধতে হচ্ছে।
সে না হয় হল, কিন্তু সুশোভনবাবুর গল্প একটাও হল না। সুশোভনবাবুর লিখতে লিখতে নায়ক-নায়িকার ওপর কনট্রোল চলে যায়। এটা অনেকেরই হয়, গল্প গুলিয়ে যায়।
এদিকে তার চরিত্রদের মৃত্যুযোগ খুব বেশি। মধ্যকাহিনিতে বেশ কয়েকজন হার্টফেল করে মারা গেল। তিনজন গাড়ি চাপা পড়ে, মফসসলের স্কুল শিক্ষিকা এক নায়িকা সাপে কাটা পড়ে এবং অন্য একজন বিষ খেয়ে মারা পড়লেন। এরপরে গল্পও মারা পড়ে।
এই সময় সুশোভনের নজরে পড়ল যে আজকাল খবরের কাগজে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা খুব চালু হয়েছে। ভুরিভুরি রান্না রেসিপি, সুখাদ্যের রঙিন ছবি। যিনি যত নতুনত্ব রান্নায় দেখাতে পারছেন, তাঁর লেখা তত জনপ্রিয় হচ্ছে।
সুশোভনবাবু দু-চারটে রন্ধনপ্রণালী পড়ে বুঝতে পারলেন, এর মধ্যে অনেকগুলো বাস্তবে সম্ভব নয়। একজন লিখেছেন কঁচা আমের সঙ্গে মানকচু সেদ্ধ মাখা বল করে আমকচুর ডালনা, অন্য একজন লিখেছেন, চিংড়িমাছের খোসা সেদ্ধ করে বেটে ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে চিংড়ি পরোটা বানানোর কায়দা।
সুশোভন জানতে পারলেন, হরেকরকম রান্নার বই বেরোচ্ছে। সেসব বই রমরম করে বিক্রি হচ্ছে। সেরকম কয়েকটা বই কিনে ফেললেন, তারপর নিজেই কোমর বেঁধে লেগে গেলেন রান্না নিয়ে লিখতে। তিনি স্থির করলেন, সরাসরি হেঁসেলের গৃহিণীদের উদ্দেশ্যে লিখবেন। অনেক কাটাকুটি করে, নানারকম মাথা খাটিয়ে সুশোভন প্রথমেই লিখলেন,
ভরাবর্ষায় বাঁধাকপির ঘণ্ট
মা লক্ষ্মীগণ, বৃথা অপব্যয় করিবেন না। শীতকালে যখন বাঁধাকপি সুলভ এবং অপর্যাপ্ত, তখন বাঁধাকপির বাইরের দিকের বড় বড় কালো কালো ঘন সবুজ পাতাগুলি আপনারা ফেলিয়া দেন। এ বিষয়ে অনেক কিছু লেখার আছে। আমি এ যাবৎকাল এরকম অপব্যয় অনেক লক্ষ করিয়াছি।
মিষ্টি কুমড়া, যাহাকে কোথাও কোথাও বিলাতি কুমড়া বলা হয়, তাহার সুপক্ক বিচি আপনারা কি ব্যবহার করেন? এ বিচিগুলির খোসা ছাড়াইলেই একরকম হালকা, চিড়ার মতো আকারের বাদাম পাওয়া যায়, যাহার খাদ্যমূল্য পেস্তাবাদামের অপেক্ষা বেশি বই কম নহে এবং খাইতে অধিক সুস্বাদু। এই সূত্রে কঁচালঙ্কার কথাও বলিতে হয়। প্রতিদিন প্রতিগৃহে প্রচুর পরিমাণ কাঁচালঙ্কা বাটা হয়। এদিকে ঝালে-ঝোলে, ডালে-তরকারিতে আস্ত আস্ত কাঁচালঙ্কা দেওয়া হয়, যেগুলি কেউই খায় না, থালার কোনায় পড়িয়া থাকে। পরিবেশনের পূর্বেই বিভিন্ন ব্যঞ্জনের ভিতর হইতে কাঁচালঙ্কাগুলি আলাদা করিয়া চটকাইয়া লইলে, উহাতে লঙ্কাবাটার কাজ হইয়া যাইবে। অনর্থক খরচ এবং পরিশ্রম হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে।
এইরূপ অপব্যয় লাঘবের বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন, লাউ, মূলা এবং আমের পরিত্যক্ত খোসার সংমিশ্রণে অল্প গুড় দিয়া প্রায় বিনামূল্যে লোভনীয় চাটনি করা যায়।
অথবা, গতদিনের বাসি নিরামিষ তরকারি ফেলিয়া না দিয়া উহা বাসি ডালের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে জল দিয়া সিদ্ধ করিলে সকালবেলায় গরম গরম ভেজিটেবল স্যুপ খাওয়া যায়। সঙ্গে টমাটো সস থাকিলে অপূর্ব।
অবশেষে বাঁধাকপির ঘণ্টের কথা বলিতেছি। শীতকালে বাঁধাকপির বাইরের দিকে বড় বড় প্রায় কালো, ঘন সবুজ পাতাগুলি আপনারা ফেলিয়া দেন। ভিতরের পাতাগুলি দিয়া আপনারা তরকারি রান্না করেন।
যে পাতাগুলি বর্জন করেন, উহা কুচিকুচি করিয়া কাটিয়া রৌদ্রে ভাল করিয়া শুকাইয়া লউন। ইহার পর বায়ু নিরোধক একটি কৌটায় ভরিয়া রাখুন। আচার বা আমসত্ত্ব যেরূপ মাঝেমধ্যে রৌদ্রে দিতে হয়, সেইভাবে কয়েকবার ওই বাঁধাকপির শুষ্ক পাতা রৌদ্রে দিতে হইবে।
পরে, বর্ষাকালে রন্ধন করিবার আগের দিন রাত্রিতে এই বাঁধাকপি জলে ভিজাইয়া রাখুন। পরের দিন কলমি শাকের সহিত মিলাইয়া আলুর টুকরো দিয়া পরিমাণ মতো নুন, ঘি, গরমমশলা দিয়া ঘন্ট তৈয়ারি করুন।
খাইয়া দেখিলে বুঝিতে পারিবেন, ইহা সত্যিই কত উপাদেয়।
বলা বাহুল্য, সাপ্তাহিক সুগৃহিণী পত্রিকায় এই রচনা প্রকাশিত হওয়ার পর রীতিমতো হইচই পড়ে গেল। তবে বাঁচোয়া এই যে, লেখাটি বেরোয় নববর্ষ সংখ্যায় অর্থাৎ বৈশাখ মাসে। তখন আর বড় বাঁধাকপির শীতকালের ঘন সবুজ ডাটা কোথায় পাওয়া যাবে, তার জন্যে শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সেই কুচানো এবং শুকানো বাঁধাকপির পাতার কুচি শাক সহযোগে বর্ষাকালে ঘণ্ট হবে। সে অন্তত ষোলো মাসের ধাক্কা।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই রচনাকে ব্যতিক্রমী চেহারা দেওয়ার জন্য সুশোভনবাবু লেখাটি সাধুভাষায় রচনা করেন। এবং আরেকটি বুদ্ধির কাজ করেন। নিজের সুশোভন পাল নাম বদল করেন, সুশোভনকে করেন শোভনা এবং পালকে করেন পালিত, অর্থাৎ শোভনা পালিত।
পাঠক, পাঠিকা অবাক হবেন না।
রন্ধন প্রণালীর বিখ্যাত সিরিজ, যাহা খাই তাহা ভুল করে খাই, সেই সিরিজের লেখিকা শোভনা পালিত হলেন অবসরপ্রাপ্ত সহঅধিকর্তা সুশোভন পাল। আমাদের পালবাবু।
