এবার অবশ্য অন্য সকলের সঙ্গে হরিমোহনবাবুও বুঝতে পারলেন, এরা সব ডাকাত। তবু তিনি একটু ভরসা পেলেন ময়দানের সেই চেনা ছিনতাইকারীকে দেখে।
ইতিমধ্যে বাসের ভিতরে পুরোদস্তুর ছিনতাই শুরু হয়ে গেছে। সবুজ গেঞ্জি, লাল প্যান্ট ময়দানি গুণ্ডা, সেই দলের নেতা, সে সামনাসামনি হরিমোহনবাবুর সিটের পাশে এসে দাঁড়াল। সে-ই এখন নির্দেশ দিচ্ছে।
একজন ডাকাত পিছনের সিট থেকে শুরু করেছে, আরেকজন সামনের সিট থেকে। তাদের লক্ষ হল শুধু ঘড়ি টাকা আর সোনা। এ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভার বাড়াতে কে চায়?
কিন্তু দূরপাল্লার বাসে সোনা অতি মহার্ঘ। কেউ, এমনকী নতুন বউ পর্যন্ত সোনা গায়ে এসব ডাকাতির বাসে ওঠে না।
হরিমোহনবাবুর স্ত্রীও আসার সময়ে বুদ্ধি করে বাঁ হাতের মধ্যমা থেকে বিয়ের আংটি খুলে রেখেছেন। হরিমোহনবাবুর সঙ্গে একটি পুরনো ঘড়ি, পকেটে সাতাশি টাকা আর ভাগ্নের জন্যে নো রুপোর থালা-চামচ। সব বাসের ছাদে সুটকেসের মধ্যে রয়েছে।
ইতিমধ্যে যে ঘটনাবলি বাসের মধ্যে শুরু হয়েছে সে শুধু রোমহর্ষক নয়, চিন্তা উদ্দীপক। সামনের এবং পিছনের সিটের দিক থেকে দুই ডাকাত ছিনতাই করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সেই ময়দানি পিস্তলধারী, যে দলের সর্দার, সে প্রকৃতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দুই ভাবে। এক, ঘড়ির দিক দিয়ে দুই টাকার দিক দিয়ে।
টাকা আর ঘড়ির কথাটা একসঙ্গেই বলি। সিট নম্বর ধরে ধরে সামনের এবং পিছনের দিক থেকে ছিনতাইকারীরা একেকজন যাত্রীর কাছে যাচ্ছে এবং যাত্রীদের হাতে ঘড়ি থাকলে সময় কত জানতে চাইছে। সময়টা মোটা দাগে বললে চলবে না, দুটো কিংবা সোয়া দুটো এরকম বললে সঙ্গে সঙ্গে ছোরার বাঁট দিয়ে মাথায় ঠুকে দিচ্ছে হতভাগ্য যাত্রীর, চাপা গলায় হিস হিস করে উঠছে, কী টাইম বলো। ঠিক ঠাইম মানে দুটো তেরো মিনিট বারো সেকেণ্ড অথবা দুটো সাত মিনিট পঞ্চাশ সেকেণ্ড–সে যাই হোক, একেবারে কাঁটায় কাঁটায় বলতে হবে।
সময় জানার সঙ্গে সঙ্গে ছিনতাইকারীটি রিলে করে দিচ্ছে ঠিক সময়টা সেই ময়দানি সর্দারের কাছে, যে খাতা পেনসিল নিয়ে হরিমোহনবাবুর সিটের পাশে বাসের রড়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার পরে কত টাকা পাওয়া গেল যাত্রীটির কাছ থেকে সেটাও জানানো হচ্ছে তাকে।
ব্যাপারটা এই রকম, সাত নম্বর সিট, দুটো বেজে চৌদ্দ মিনিট তিরিশ সেকেন্ড, সাতাশ টাকা, সোনা নেই। সিটের পাশের ডাকাত চেঁচিয়ে জানাল, সর্দার নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা প্রথমে দেখল। তারপর বলল, ঘড়ি নেহি লাগেগা। কিন্তু টাকার ব্যাপারে কিছু না বলে টাকার অঙ্কটা সিট নম্বরের পাশে নোট করে নিল।
হরিমোহনবাবু একটু অবাক হয়ে গেলেন ঘড়ির ব্যাপারটা দেখে। টাইম দেখে সর্দার কোনও কোনও ঘড়ি ছেড়ে দিচ্ছে, আবার কোনও ঘড়ি নিয়ে নিতে বলছে।
সরল প্রকৃতির হরিমোহনবাবু স্থান-কাল-পাত্র বিস্মৃত হয়ে নিতান্ত কৌতূহলবশত ছিনতাই সর্দারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সব ঘড়ি আপ কেন নেহি লেগা?
লাল প্যান্ট সবুজ গেঞ্জি হলুদ রুমাল সর্দার একবার হিমশীতল দৃষ্টিতে হরিমোহনবাবুর দিকে তাকাল, তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কী ভেবে বুঝিয়ে বলল যে পুরনো ঘড়ি ভাল না হলে আজকাল কেউ কিনতে চায় না। নতুন ইলেকট্রনিক ঘড়ি পঁচিশ-ত্রিশ টাকাতেই পাওয়া যাচ্ছে। তাই খুব ভাল না হলে পুরনো ঘড়ি নিয়ে বোঝা বাড়িয়ে লাভ নেই, এর খদ্দের পাওয়া যাবে না। টাইম মিলিয়ে যো ঘড়ি রাইট টাইম দেতা হ্যায় শুধু সেই ঘড়িগুলিই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
হরিমোহনবাবু দ্রুত সর্দারের হাতের ঘড়ির সঙ্গে নিজের ঘড়ি মিলিয়ে দেখলেন, প্রায় কাঁটায় কাঁটায় মিল রয়েছে। সর্বনাশ! কিন্তু ঘড়িটা তো একটু সাহস করলেই রক্ষা করা যায়। একটু সাহস করলেন হরিমোহনবাবু। সর্দারটি যেই অন্য এক যাত্রীর অর্থের পরিমাণ নোট করছে, হরিমোহনবাবু ঘড়ির চাবি তুলে ঘড়িটাকে আধ ঘন্টা ফাস্ট করে দিলেন। বুকটা একটু দুরু দুরু করেছিল, কিন্তু সর্দার কিংবা অন্য ডাকাতেরা কেউ দেখতে পায়নি।
ফলে সামনের দিকের লুট আহরণকারীটি যখন হরিমোহনবাবুর সিটে এসে পৌঁছল তখন শুধু সাতাশি টাকার উপর দিয়ে গেল। রাঁচিতে বোনের কাছ থেকে ফেরার ভাড়াটা নিতে হবে এই একটু অস্বস্তি হলেও, তিনি অল্পের উপর দিয়ে হল এই ভেবে মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ জানালেন।
কিন্তু এর পরে আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হরিমোহনবাবু এবং বাসের অন্যান্য যাত্রীদের জন্যে অপেক্ষা করছিল।
টাকাপয়সা ঘড়ি সব সংগ্রহ হয়ে গেলে সর্দার খুব অভিনিবেশ সহকারে একটি লম্বা যোগ করল, সাতাশশো তেত্রিশ টাকা আর সঠিক টাইমওলা ঘড়ি মিলেছে মাত্র দুটি।
হরিমোহনবাবু দেখালেন সেই ঘড়ি দুটির পাশে টু-ইনটু ফিফটি অর্থাৎ একশো টাকা হিসেব ধরা হল। একেবারে পাকা হিসেব 2×50=100 এইভাবে লেখা। সুতরাং যোগ দিয়ে মোট আটাশশো তেত্রিশ। টাকার পরিমাণ দেখে প্রচুর ভ্রুকুঞ্চন এবং জিব দিয়ে চুক চুক করল সর্দার এবং তার সাকরেদরা। তারপর কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে সর্দার তার সাকরেদদের বলল, টাকা, ঘড়ি যার যার তাদের ফেরত দিয়ে দাও।
ঘটনার এই বিবর্তনে হরিমোহনবাবু সমেত সবাই অবাক। সর্দার চেঁচিয়ে বলল, সামনের পুলিশ ফাঁড়িতে বাসে দারোগা উঠবে। তাকে সাঁচ বাত (সত্যি কথা) বলবেন, বলবেন ডাকাতি হয়নি।
