অবসর তো হয়ে গেল, সুশোভন পাল, সহকারী অধিকর্তা। বিদায় সভার শেষে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন এক হাতে পাকানো বেতের লাঠি, অন্য হাতে চাদর আর সন্দেশের বাক্স। সঞ্চয়িতাটা এক সহকর্মী পড়ার জন্যে ধার নিয়েছেন, তার মেয়ে খুব কবিতা পড়তে ভালবাসে। বলেছেন, সাতদিনের মধ্যে ফেরত দেবেন। তবে কস্মিনকালেও ফেরত পাবেন, এ আশা তিনি রাখেন না।
ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরলেন সুশোভন পাল। বাড়িতে ফিরেও ভাবতে লাগলেন। কত রকম কথা। অফিসে প্রচুর খেটেছেন। ছুটি, বিশ্রাম এসব প্রায় ছিলই না।
অফিসে আগে ছিলেন পালবাবু, শেষজীবনে অফিসার হয়েছিলেন, অফিসিভাষায় সাহেব। কিন্তু তখনও তাঁকে কেউ পালসাহেব বলেনি, পালবাবুই বলেছে।
এসব কি গৌরবের কথা? অনেক কিছু ভাবেন সুশোভন।
এখন তার হাতে অখণ্ড অবসর। শূন্যগৃহে প্রবীণা গৃহিণী। ছেলেমেয়েরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। খোঁজখবর নেয়, কিন্তু কদাচিৎ আসে।
সুশোভন প্রথমে ভেবেছিলেন, সময় কাটানো খুব একটা সমস্যা হবে না। ঘুমিয়েই দিন কাটিয়ে দেবেন। আঃ! কতকাল ভাল করে ঘুমনো হয়নি।
পরপর কয়েকদিন বেশ ভালই ঘুমলেন সুশোভন। ঘুমের একটা মাদকতা আছে, নেশার মতো ব্যাপার আছে। এক ঘুম থেকে অন্য ঘুম, অন্য ঘুম থেকে আরেক ঘুম এই ভাবে ঘুমের ওপর ভাসতে ভাসতে দিনের পর দিন। মোটামুটি ঠিকঠাক চলছিল, সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে খবরের কাগজ, চা-জলখাবার। তারপর প্রভাত নিদ্রা। বারোটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে স্নান খাওয়া। তারপর যাকে বলে দিবানিদ্রা। এরপর বিকেলে চা খেয়ে পাড়াটা একটু চক্কর দিয়ে, এসে একটু টিভি দেখে কিঞ্চিৎ তন্দ্রা। ঘণ্টাখানেক পরে চোখে মুখে জল দিয়ে নৈশাহার।
কিন্তু ব্যাপারটা অল্পদিনেই একঘেয়ে হয়ে উঠল। তা ছাড়া একটা লোকের পক্ষে কত ঘুমনো সম্ভব। কয়েকদিন পরে সকালে ঘুমলে বিকেলে ঘুম আসে না। বিকেলে ঘুমলে রাতে ঘুম আসে না।
এদিকে এত ঘুমনো দেখে পালগৃহিণী চিন্তিতবোধ করলেন। বাল্যবয়সে মহিলার শখের বেড়াল বেশি ঘুমিয়ে মরে গিয়েছিল। ডাক্তাররা বলেছিলেন, অসুখের নাম নিদ্রারোগ।
পালগৃহিণীর দুশ্চিন্তা হল পতিদেবতা সেইরকম কোনও নিদ্রারোগে পড়েছেন কিনা। ডাক্তার ডাকা হল। তিনি ব্যাপারটাকে পাত্তা দিলেন না। তিনি বললেন, ও কিছু নয়। জানেন তো ছড়া আছে–
কথায় কথা বাড়ে।
টাকায় বাড়ে টাকা।
ঘুমে ঘুম বাড়ে।
ফাঁকায় ফাঁকা ফাঁকা ৷
নাড়ি, প্রেসার কিছুই না দেখে, শুধুমাত্র এই ছড়াটি বলে ডাক্তারবাবু আশিটাকা ভিজিট নিয়ে বিদায় হলেন। অবশ্য ওই আশিটাকার মধ্যে যাওয়ার আগে অন্য এক রোগীর একটা গল্প বলে গেলেন।
রোগী একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। সুতরাং সে তো শুধু ঘুমবেই। সারা জীবন অফিসে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। এখন নিজেকে শোধরাবে কী করে।
এই বলে সেই পুরনো গল্পটা বললেন
জনৈক সরকারি কর্মচারী দেরি করে অফিসে এসেছেন। ওপরওলা দেরির কারণ জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, কাল রাতে সিনেমা দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে যায়, আজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে চা-টা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এ কথা শুনে সেই ওপরওলা আকাশ থেকে পড়লেন, সে কী মশায়, আপনি কি বাড়িতেও ঘুমন নাকি?
যাই হোক ঘুমের সাগর পাড়ি দিয়ে শেষপর্যন্ত বাস্তবের ডাঙায় উঠতে হল সুশোভনবাবুকে।
সময় কাটানোর নানা উপায়, ফন্দিফিকির খুঁজতে লাগলেন তিনি।
প্রথমে চেষ্টা করলেন, স্ত্রীর সঙ্গে রান্নাঘরে কাজ করে সময় কাটিয়ে দেওয়ার, ভদ্রমহিলা তো চমৎকার একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন রান্নাঘরে। কিন্তু সেই সংকীর্ণ এলাকা থেকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হলেন সুশোভন। এ কাহিনি বিশদ করে বলার কিছু নেই, যে কোনও পুরুষমানুষ রান্নাঘরে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
এরপর টিভির দিকে মনোযোগ দিলেন সুশোভন। এখন তো একশো আটটা চ্যানেল, অষ্টপ্রহর টিভি চলছে। দিনরাত বিরামবিহীন।
যতক্ষণ জেগে থাকেন টিভি দেখেন সুশোভন। যে চ্যানেলে যখন যা হয় সবকিছু। ইতিহাস ফিসফাস কথা কয় থেকে ও পাগলমন বাউলগান। দেখে দেখে হিন্দি সিনেমার নায়িকাঁদের সব চিনে ফেললেন। প্রথম প্রথম গুলিয়ে ফেলতেন কে মনীষা, কে মাধুরী, কে ঐশ্বর্য। এসব এখন সড়গড় হয়ে গেছে ওঁর। এমনকী কখন মারামারি আসবে, কখন নাচাগানা আসবে, সব ধরতে পারেন। এরপর আর রোমাঞ্চ রইল না।
এর ওপরে বহুক্ষণ ধরে দূরদর্শন দেখায় এবং অভ্যাসের অভাবে কয়েকদিন বাদেই তার চোখ টনটন করতে লাগল এবং খুব মাথা ধরতে লাগল।
অগত্যা দূরদর্শন ছেড়ে সুশোভনবাবু খবরের কাগজে মনোনিবেশ করলেন। সব কয়টি বাংলা খবরের কাগজ পড়া শুরু করলেন। হকারকে বলে দিলেন বাংলা দৈনিক পত্রিকা যা আছে সব দেবে।
যদিও কোনও কোনও খবরের কাগজের দাম কিছু কমেছে তবু মাসে প্রায় তিনশো-সাড়ে তিনশো টাকা খরচ। একজন অবসরপ্রাপ্ত পেনশনারের পক্ষে টাকাটা অনেক। অবশ্য সময়টা ভাল কেটে যায়।
আজকাল খবরের কাগজে খবর ছাড়াও সাহিত্য, শিল্প, বিনোদন নানারকম লেখা বেরোয়। সুশোভনবাবু জানেন, এসব লেখায় যেমন সময় কাটে তেমনিই অল্পবিস্তর আয় হয়। তার অফিসের একটি ছোকরা গল্প লিখত। মাঝেমধ্যেই বেশ গর্বের সঙ্গে পাঁচশো টাকার চেক দেখাত। গল্পের পারিশ্রমিক।
