চাকরি, ছোট থেকে মাঝারি, যাই হোক সারা জীবন ধরে গাধার মতো হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন সুশোভন। অফিসের সবাই বলত, পালবাবু খাটেন খুব।
সরকারি চাকরি সাধারণত এত পরিশ্রম করে কেউ করে না। কথায় আছে না–
আসি যাই মাইনে পাই
কাজ করলে উপরি চাই।
অবশ্য উপরির দিকে ঝোঁক ছিল না সুশোভন পালের। তবে কোনও কাজ হয়ে গেলে কেউ খুশি হয়ে কিছু দিলে শেষের দিকে সেটা নিতেন। কখনও কেউ একটা বড় মাছ পাঠিয়ে দিল বাসায়। কখনও বা এক হাঁড়ি মিষ্টি। নগদ টাকা কখনও নেননি। সেটা পুরোপুরি ঘুষ। একবার শীতকালে একজন একটা শাল উপহার দিয়েছিল, সেটাই সারাজীবনে সবচেয়ে মূল্যবান উপরি।
তবে অল্প বয়েসে এই ধরনের উৎকোচও গ্রহণ করেননি তিনি। দু-চারবার লোকে লোভ। দেখাতে গিয়ে তিরস্কৃত হয়েছে। খুব যে খারাপভাবে গালাগাল করতেন তা নয়, তবে শক্তভাবেই। বুঝিয়ে দিতেন, যথাসময়ে কাজ হবে এবং এই কাজের জন্যে কোনও টাকাপয়সা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বহুদিন আগের একটা কথা মনে পড়লে এখনও পালবাবুর হাসি পায়। একবার এক লেখককে তিনি গল্পটা বলে দিয়েছিলেন। আর লেখকের যা স্বভাব, পরের সপ্তাহেই ভদ্রলোক কাগজে লিখে গল্পটা বারোয়ারি করে দিলেন।
গল্পটা একটা চিঠি নিয়ে। আর সেই চিঠিটা একটা সামান্য পোস্টকার্ড। এসেছে মফস্সল থেকে কলকাতায়। আসানসোল অঞ্চলের এক ভদ্রলোক তার ভাইপোকে চিঠিটা লিখেছেন। ভদ্রলোকের একটা বৈষয়িক ব্যাপারে তদবির আছে সুশোভনবাবুদের অফিসে, নথিটা সুশোভনবাবুই ডিল করেন। ভদ্রলোক নিজেই দুয়েকবার অফিসে এসেছেন। যথারীতি সুশোভনবাবু খুব একটা পাত্তা দেননি, মিথ্যে আশ্বাসও দেননি। বলেছিলেন, সময়মতো দেখব।
ভদ্রলোকের ভাইপো কাকার চিঠি নিয়ে অফিসে এসেছেন ব্যাপারটার খোঁজখবর নিতে।
ভাইপোটির বয়স বছর পঁচিশ-তিরিশ হবে। তখনকার সুশোভনবাবুর সমবয়সিই হবেন। সেই ভদ্রলোক কাকার পোস্টকার্ড হাতে করে নিয়ে এসেছেন, তাতে ফাইল নম্বর, প্রয়োজনীয় বিষয়, কোন কেরানির কাছে নথিটি রয়েছে ইত্যাদি সব তথ্য দেওয়া আছে। শুধু একটা ব্যাপারে খটকা লাগল সুশোভনবাবুর, ভাইপো ভদ্রলোক খুব শক্ত করে পোস্টকার্ডটা হাতে ধরে রেখেছেন, কিছুতেই আলগা করে রাখছেন না কিংবা চিঠিটা উলটোচ্ছেন না।
কী খেয়াল হল সুশোভনবাবুর, ভাইপো ভদ্রলোক সুশোভনের পাশে দাঁড়িয়ে পোস্টকার্ডটা ধরে কাকার নথিটার বিষয়ে কথা বলছিলেন, তিনি কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক হতেই সহসা এক ঝটকায় ভদ্রলোকের হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে উলটিয়ে ফেললেন।
ভাইপো ভদ্রলোক, আ হা হা, আ হা হা, করেন কী, করেন কী? বলতে বলতেই সুশোভন পোস্টকার্ডের উলটো পিঠটা পড়ে ফেললেন। সেখানে লেখা আছে, ওই কেরানিবাবু, সুশোভন পাল, পালবাবু অতিশয় বিপজ্জনক লোক। ঘুষ খান না, কাজও করেন না। পালবাবুকে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করিবে না, তাহাতে হিতে বিপরীত হইবে। বরং তাঁহাকে তোষামোদ করিয়া যদি কাজ হাসিল করিতে পার, তাহাই চেষ্টা করিবে। অতি সাবধানে এই কার্য সমাধান করিবে।
ইতি
চিরআশীর্বাদক
বিপদভঞ্জন চক্রবর্তী
বিপদভঞ্জনের বিপদ অবশ্য যথাসময়ে কেটে গিয়েছিল। কিন্তু এই সামান্য ঘটনার মধ্যেই সুশোভন পালের চারিত্রিক ছায়া, বলা যায়, সুশোভন পাল নামক এক নিতান্ত সাধারণ মানুষের চেহারাটাই পাওয়া যাবে।
আসল রক্তমাংসের মানুষটার চেহারা ভাল, উচ্চতা সোয়া পাঁচ ফুট, গায়ের রং শ্যামবর্ণ, চুল কোঁকড়া, ওজন পঞ্চাশ কেজি।
এটা সেই চাকরিতে ঢোকার সময়ের হিসেব। এখনকার হিসেব প্রথম দুটো ঠিকই আছে, কিন্তু চুল কোঁকড়ার বদলে হবে মাথায় বিশাল টাক, ওজন পঞ্চাশ কেজির বদলে অন্তত আশি কেজি।
.
শুধু সুশোভনবাবুর সঙ্গে জানবুঝ করার জন্য এই কাহিনিতে এত দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা প্রয়োজন হল।
আগেই বলেছি, সুশোভনবাবু গত বছর অবসর গ্রহণ করেছেন। যেমন হয়, প্রায় কিছু বুঝবার আগেই তার ষাট বছর পূর্ণ হয়ে অবসরের দিন ঘনিয়ে এল।
যথারীতি, রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা এক কপি, এক বাক্স ভাল সন্দেশ, একটি তসরের চাদর আর একটি বেতের লাঠি, সেই সঙ্গে গলায় একটা ভারী বেলফুলের মালা।
বিদায় সভা ভালই হল। উদ্বোধনী সংগীত গাইলেন হেড টাইপিস্ট রাবেয়া চৌধুরী, তোমার সমাধি ফুলে ফুলে… এরপর সহকর্মীদের বক্তৃতা, স্মৃতিচারণা। পঁচিশ বছর আগে সিঁড়ির নীচে একটা সদ্যপ্রসূতি মেনি বেড়াল আচমকা সুশোভনবাবুকে কামড়িয়ে দিয়েছিল। একজন সে ঘটনা বললেন।
ব্যাপারটা সুশোভনবাবু ভুলেই গিয়েছিলেন। আজ বক্তৃতা শুনে মনে পড়ল। পরিষ্কার মনে পড়ল, সেই মা বেড়ালটা ছিল ডোরাকাটা, কিন্তু তার বাচ্চা দুটোর একটা হয়েছিল ফুটফুটে সাদা, আরেকটা সাদাকালো।
পুরনো বন্ধু গোপীবাবু খুব রসিক লোক, তিনি আরেকবারের কথা বললেন। সেবার সুশোভন নতুন বড়সাহেবকে চিনতে না পেরে অফিসের প্যাসেজ দিয়ে বড়সাহেব যাওয়ার সময় সিগারেট ধরানোর জন্য দেশলাই চেয়েছিলেন, দাদা, একটু দেশলাই হবে?
বড়সাহেবরা এ জাতীয় অনুরোধ রক্ষা করেন না। কিন্তু ইনি একটু বেশি রক্ষা করেছিলেন। নিজের চেম্বারে গিয়ে বেয়ারাকে দিয়ে এক ডজন দেশলাইয়ের একটা প্যাকেট কিনে সুশোভনবাবুকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
যাক, এসব কথা।
