.
নামব্রত সঙ্ঘের ঠেকে বসে সবাই খুবই চিন্তান্বিত। ক্যালেন্ডার দেখে হিসেব কষে বেরোল আজ পঞ্চাশদিন ডেভিডের দেখা নেই৷
এদিকে বার্ষিক উৎসবের সময় সমাগত। আর দেরি করা যায় না।
মদ্যপানে মানুষের মনে এক ধরনের অলীক সাহস সঞ্চয় হয়। রাত দশটার সময় হাবিলদার বাড়ির দোকান বন্ধ হলে রাস্তায় বেরিয়ে কিছুক্ষণ জটলা করে সবাই সঙঘবদ্ধ হয়ে ঠিক করল, ওই দজ্জাল জারিনা বিবিকে ভয় পেলে চলবে না, আমাদের বউয়েরাই বা ওর চেয়ে কম কীসে, ডেভিডের বাড়িতে আজ যেতেই হবে, ডেভিডকে ছাড়া তো আর নগর সংকীর্তন হবে না।
কিন্তু ডেভিড কোথায়? এক মাস আগে ডেভিড মারা গেছে।
ওই-রকম লম্বা-চওড়া, যুবক মানুষ। সকালবেলা বাজারে গিয়ে বাজার থেকে ফিরে থলে নামিয়ে বউয়ের কাছে এক গেলাস জল চাইল। জল আর খাওয়া হয়নি। সামনে বিছানার ওপরে লুটিয়ে পড়ে। আধঘণ্টা পরে হাসপাতাল বলে হার্ট ফেল।
এ খবর তো আর অনাদি-অনন্তদের কাছে পৌঁছয়নি। মাতালদের আড্ডায় এরকম হয়। একেক জন একেক প্রান্ত থেকে আসে। তার মধ্যে কেউ একদিন হঠাৎ বরবাদ হয়ে গেলে সে খবর আড্ডায় অন্যদের কাছে এসে পৌঁছায় না।
আজ বলতে গেলে একটু সকাল সকালই এসেছে এরা। রাত এগারোটা। পাড়ার অনেক বাড়িতেই আলো জ্বলছে। লোকজন দাওয়ায়, ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় চারমূর্তি গলির মধ্যে প্রবেশ করল।
এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক সামনের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে নৈশাহার শেষে রাস্তার কুকুরদের রুটি দিচ্ছিলেন। তিনি এদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? কাকে চান?
অনাদি বলল, আমরা ডেভিডের বন্ধু।
অনন্ত বলল, আমরা ওই সামনের বাড়ির ডেভিডের কাছে এসেছি।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, আপনারা কীরকম বন্ধু? জানেন না একমাস হল ডেভিড মারা গেছে।
এই সংবাদে হতভম্ব হয়ে অনাদি-অনন্তেরা পিছু হটছিল। তাদের মনের মধ্যে দুটো জিনিস কাজ করছিল। একটা হল বন্ধুর মৃত্যুর জন্য শোক এবং অন্যটা হল জারিনা বিবির আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার থেকে নিষ্কৃতি জনিত স্বস্তি।
কিন্তু ইতিমধ্যে নিজের ঘরের জানলা দিয়ে এদের দেখে স্বয়ং জারিনা বিবি রাস্তায় নেমে এসেছে। এরা জারিনাকে দেখে দৌড় দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলো এদের পর্যবেক্ষণে রেখেছিল এবং দৌড় দিলেই তাড়া করবে বুঝতে পেরে, দ্রুত পা চালিয়ে পালাতে গেল।
এদের ভাবগতিক দেখে জারিনা দ্রুতপদে এগিয়ে এল, যাবেন না। আপনারা যাবেন না। আপনাদের কাছে আসার দরকার আছে।
কিছুই বুঝতে না পেরে অনাদি-অনন্তরা দাঁড়িয়ে গেল। তবে খুব ভয় পাওয়ার কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। জারিনা বিবির চোখেমুখে চেহারায় রাগের ভাগ দেখা যাচ্ছে না।
জারিনা এদের ডেকে নিয়ে তার ঘরে বসাল। একপাশে একটা বড় খাট, তার ওপরে একপাশে দুই পিতৃহীন নাবালক ঘুমোচ্ছে। এপাশটায় জারিনা শোয়। সেখানে দুজনে বসল। আর দুজন দুটো চেয়ারে বসল, চেয়ার দুটো এবং খাটের মাঝখানে একটা ছোট গোল টেবিল।
জারিনা বলল, আপনারা একটু বসুন। আমি কতদিন ধরে আপনাদের কথা ভাবছি। এই বলে সে টেবিলের দেরাজ থেকে একটা চাবি বার করে ঘরের একপাশের সাবেকি দিনের বড় কাঠের আলমারিটা খুলল।
অনাদি ফিসফিস করে অনন্তকে বলল, পিস্তল-টিস্তল বার করছে বোধহয়। অন্য দুজনও মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
কিন্তু পিস্তল-টিস্তল নয়। জারিনার হাতে একটা বোতল, এক বোতল দুনম্বর বাংলা মদ। মৃত্যুর দিন বাজার করার পথে কিনে এনেছিল ডেভিড। যখন ঠেকে যেত না, বাজার থেকে আসার সময় একেক দিন এইরকম কিনে আনত।
বোতলটা অটুট রয়ে গেছে। জারিনা এসে বোতলটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর পাশের রান্নাঘরে গিয়ে গোটা দুয়েক গেলাস আর তিনটে কাপ নিয়ে এল।
চারজনের জন্যে পাঁচটা পাত্র। অনাদি ধরে নিল জারিনাও খাবে। বোতলের ছিপিটা খুলতে খুলতে অনাদি মনে মনে বলল, সাবাস জারিনা।
বোতলটা খোলা হয়ে যেতেই জারিনা সেটা নিজের হাতে নিয়ে চারটে পাত্রে সমান করে ভাগ করে দিল। আর পঞ্চম পাত্রে খুব কম ঢালল।
ভদ্রতা করে অনন্ত বলল, আপনি নিজে এত কম নিলেন?
জারিনা বলল, এটা আমার নয় ডেভিডের।
চার পাত্র নিঃশেষ করে চার বন্ধু উঠে পড়ল। দরজা দিয়ে বেরোনোর সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল ডেভিডের পাত্রের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে জারিনা তাকিয়ে রয়েছে। তার চোখে জল।
রাঁধি মাছ না ছুঁই তেল
আটত্রিশ বছর। হিসেব করলে আটত্রিশ বছরের চেয়েও বেশি। আটত্রিশ বছর, সাত মাস, এগারো দিন। এই এতদিন চাকরি করার পরে সুশোভন পাল অবশেষে অবসর গ্রহণ করলেন। ছোট চাকরিতে সাড়ে একুশ বছর বয়েসে টুক করে ঢুকে পড়েছিলেন পিসেমশায়ের দৌলতে। চাকরির কোনও স্থায়িত্ব ছিল না। স্টপ-গ্যাপ চাকরি, মানে অন্যের জায়গায় কাজ করা। সব সময়েই শুনতেন, সামনের মাসে কাজ চলে যাবে।
তা যায়নি। সরকারি অফিস, তার অনেক আইনকানুন। বছর তিনেক স্টপ-গ্যাপ থাকার পরে। একদিন টেম্পোরারি হলেন। আবার বছর দুয়েক, এবার কোয়াসি পার্মানেন্ট। অবশেষে একদিন পার্মানেন্ট।
সেই সময়েই পে কমিশন এসে মাইনের স্কেল ভাল করে দিল। তারপর দু-চার দশ বছর অন্তর ছোট ছোট প্রমোশন পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটু মাঝারি গোছের পদস্থ অফিসার হয়ে সুশোভনবাবু রিটায়ার করলেন। সেও প্রায় এক বছর হয়ে গেল।
