রাত বাড়ে। দায় বাড়ে নামব্রত সঙেঘর ঠান্ডামাথা সদস্যদের। তারা এভাবে ডেভিডকে রাস্তায় ফেলে যেতে পারে না।
.
এককালে কলকাতার ট্রাফিক পুলিশে মাতাল স্কোয়াড ছিল। এক অ্যাংলো সার্জেন্ট সাহেব লাল মোটর সাইকেলে রাত সাড়ে দশটার পর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। কোথায় কোন মাতাল বাড়ি ফেরেনি, তাকে বাড়ি পাঠানোই তার ডিউটি। সেই সার্জেন্ট সাহেব কলকাতার পানশালার একটি অনবদ্য গল্পে অমর হয়ে আছেন।
(গল্পটা অন্যেরাও লিখেছেন বা বলেছেন। আমার কাণ্ডজ্ঞানেও সম্ভবত রয়েছে। তবু কাহিনির খাতিরে আরেকবার উল্লেখ করা যেতে পারে।)
মোদো কলকাতার মধ্য নিশা। চৌরাস্তার মোড়ে দুই মাতাল পরস্পরকে জাপটিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বহুদূর থেকে এই দৃশ্য দেখে সার্জেন্ট সাহেব তার সেই লাল মোটর সাইকেল যুগ্মমদ্যপের পাশে দাঁড় করিয়ে বললেন, বাবুরা বাড়ি যাও। Go Home–এর পরে বিবিরা পেটাবে।
সবাই চলে গেছেন। শুধু ওই দুজন দাঁড়িয়ে রইলেন, চুরচুর অবস্থায় দুজনায় দুজনকে পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ করে রাস্তায় মধ্যখানে সম্পূর্ণ নিশ্চল। সার্জেন্ট সাহেব তার মোটর সাইকেল নিয়ে তাদের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জোর করতে লাগলেন বাড়ি যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাদের তো বাড়ি যাওয়ার উপায় নেই, তাদের বক্তব্য, United we stand, divided we fall অর্থাৎ একত্রে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকলেই তারা আছেন, ছাড়াছাড়ি হলেই পড়ে যাবেন। বাড়ি যাওয়ার উপায় কী?
মিস্টার ডেভিড ওরফে শ্রীযুক্ত দেবীদয়াল ওরফে অমরের সমস্যা অনেক জটিল। অধিক মদ্যপান করলে ডেভিডের কদাচিৎ পদস্খলন হয়, সে তখন উদ্বাহু নৃত্য করে।
আর সে বাড়ি যাবেই বা কেন? সেখানে জারিনা বিবির উদ্যত ঝাটা অপেক্ষা করছে।
বেচাল অবস্থায় রাত দুপুরে পাড়ার কুকুরদের বিচলিত না করে নিজের বলয়েও নিঃশব্দ প্রবেশ খুব সহজ নয়। সুতরাং যত রাতই তোক জারিনা জেগে উঠবেই এবং তারপর ওরকম অভ্যর্থনা, ঝটা পেটা এবং অনাহার ডেভিডের মোটেই পছন্দ নয়। সুতরাং সে নানা কারণেই বাড়ি ফিরতে চায় না।
নামব্রত সঙ্ঘের বন্ধুরা উদ্যোগ নিয়ে আগে দুয়েকবার ডেভিডকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেছে। কিন্তু তার পরিণতি সুখের হয়নি। অনাদি, অনন্তরা সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি এখনও বহন করে চলেছে।
একবার বাদলচন্দ্র জারিনার কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে ডেভিডকে ঘরের মধ্যে ঢুকে একেবারে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। জারিনা ঘরের মধ্যে অন্ধকারে, নিঃশব্দে ওঁত পেতে ছিল। সে মাতাল ও অসতর্ক বাদলচন্দ্রের কোমরে আচমকা একটা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। চোর-চোর বলে চেঁচাতে থাকে।
সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘনবসতি ঘিঞ্জি ও হাফবস্তি অঞ্চলের বিভিন্ন বাড়িঘর থেকে পিল পিল করে লোক লাঠি-বল্লম-ভোজালি-চাবুক-হাতদা-বঁটি-দা ইত্যাদি নিয়ে রে রে করে বেরিয়ে আসে। পূর্বপুরুষদের বহু পুণ্যে সে যাত্রা বাদলচন্দ্র মত্ত অবস্থাতেও আত্মপরিচয় দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল। বলা বাহুল্য, নামব্রত সঙেঘর সহযোগী বন্ধুবান্ধবেরা যারা সেদিন তার সঙ্গে ডেভিডকে বাড়ি পৌঁছাতে গিয়েছিল, দুর্যোগের আভাস পাওয়া মাত্রেই তারা দৌড়ে পালিয়েছিল।
এখনও শীতে বর্ষায় বাদলচন্দ্রের কোমরের গাঁটটা টনটন করে।
অবশ্য এর পরেও উপায়ান্তর না থাকায়, বন্ধুরা কখনও কখনও মধ্যরাতে কিংবা তারও পরে ডেভিডকে বাড়ি পৌঁছাতে গেছে। কোনওবারই অভিজ্ঞতা মনোরম হয়নি। জারিনার কেমন যেন বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায় ডেভিডের পদস্খলনের জন্যে এরাই দায়ি। হিংস্র ভাষায় এবং হিংস্রতর ভঙ্গিতে সে এই বন্ধুবৎসল এবং পরোপকারী বন্ধুদের তাড়া করে যেত। একবার ডাকাত ডাকাত করে চেঁচিয়ে একরাত্রি তালতলা থানায় এদের হাজতবাসের ব্যবস্থাও করেছিল।
সে যা হোক, এখন নামব্রত সঙ্ঘের সম্মুখে বিশাল সমস্যা। প্রত্যেকবার জন্মাষ্টমীর সময় তারা ঢোল-করতাল কঁসি সহযোগে নামগান করে পথ প্রদক্ষিণ করে। বলতে গেলে এটাই নামগান সঙেঘর বাৎসরিক প্রধান উৎসব।
এই উৎসব ডেভিডকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। সবচেয়ে বড় খোলটা নিপুণ হাতে ডেভিড বাজায়। তার গানের গলাও খুবই সুরেলা। তা ছাড়া দীর্ঘকায়, সুদর্শন, গৌরবর্ণ ডেভিড ওরফে দেবীদয়ালই নায়কেরই মতো ওই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেয়। তখন তার চন্দনচর্চিত ললাট, গলায় উঁইফুলের মালা, সাদা অঙ্গবস্ত্র ইত্যাদি দেখে কে বলবে যে এই লোকটিই জুতোর দোকানের টাইপরা সেলসম্যান।
তা সেই ডেভিডেরই দেখা নেই এবং এবার বিরতি খুব দীর্ঘ দিনের। দেড়-দুই মাস তো হবেই। হাবিলদার বাড়ির ঠেকে এত দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ডেভিড কখনও হয়নি। কখনও কখনও বড়জোর তিন সপ্তাহ হয়েছে। কিন্তু এবার বিশেষ করে এই জন্মাষ্টমীর আগে ডেভিডের এত দীর্ঘকাল দেখা নেই, ভাবা যায় না।
শেষ যেদিন ডেভিড এসেছিল, সেদিন অবশ্য বেশ গোলমাল হয়েছিল। ডেভিডকে বাড়িতে পৌঁছাতে যেতে হয়েছিল, সেটাও রাত দেড়টা নাগাদ প্রায় চ্যাংদোলা করে। সেদিনও অভ্যর্থনা মোটেই সুখের হয়নি। ঘরে ঢোকা মাত্র ডেভিডকে এক ঝাপটায় মেঝেতে চিত করে ফেলে জারিনা বিবি জানলার সামনে এসে দাঁড়ায়। সেখান থেকে পরপর চিনেমাটির পেয়ালা ছোড়ে। অব্যর্থ লক্ষ তার, প্রথম দুটি অনন্ত এবং অমরের কপালে লাগে, অবস্থা বুঝে বাকি দুজন দৌড় দেয়। কিন্তু রক্ষা পায় না। অনাদির ঘাড়ে এবং অসীমের পিঠে লাগে। সবাই অল্পবিস্তর আহত হয়, অমরের কপাল কেটে যায়, নীলরতনে গিয়ে দুটো সেলাই দিতে হয়েছিল।
