অবাক হয়ে বৃদ্ধ এবং মহিলাটি একসঙ্গে সমস্বরে বললেন, কেন?
মহিলাটির বক্ষলগ্ন বেড়ালটি তখনও আরামে হাই তুলছে। ওই দিকে তাকিয়ে বেড়াল তাড়ানোর কথা চেপে গিয়ে প্রতিভাময় মিথ্যে করে বলল, গত বছর সত্যনারায়ণ পুজোর সময় পাড়ার একটি বাড়ি থেকে একটা কাসর ধার করে এনেছিলাম। সেটা ছিল ফাটা। কী করে যেন সেটা হারিয়ে গেছে। অনেকদিন ঘুরিয়েছি, এবার কাসরটা ফেরত দিতেই হবে।
বৃদ্ধ নির্বিকারভাবে বললেন, ঠিক আছে ফাটিয়ে দিচ্ছি। আপনি আর সন্ধ্যা দুজনে কাসরটার দুদিক ধরুন।
প্রতিভাময় ও সন্ধ্যা দুজনে মুখোমুখি বসে শক্ত করে কাঁসরটা ধরল। ফ্যানের হাওয়ায় সন্ধ্যার এলোচুলের ঝাপটা এসে লাগছে প্রতিভাময়ের মুখে। চুলে কী একটা মেয়েলি তেলের গন্ধ।
বৃদ্ধ একটা দুকেজি বাটখারা হাতে নিয়ে পাঁঠাবলির ভঙ্গিতে নিলডাউন হয়ে বসে বললেন, আমি যেই ওয়ান-টু-থ্রি বলব, দুজনে কাসরটাকে শক্ত করে ধরবেন।
অতঃপর ওয়ান-টু-থ্রি বলে বৃদ্ধ সর্বশক্তি দিয়ে কাসরের মধ্যিখানটায় আঘাত হানলেন। বাটখারার তীব্র আঘাতে কসর থেকে প্রতিভাময়ের হাতটা বেরিয়ে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে ভারী কাসার সেই জিনিসটা শূন্যপানে ছিটকিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার চিবুকে লাগল।
ও মাগো, মরে গেলাম গো, বলে চোখ উলটিয়ে, ভিরমি খেয়ে সন্ধ্যা প্রতিভাময়ের কোলে পড়ে গেল। সন্ধ্যার বেড়ালটা ফাঁচ করে প্রতিভাময়কে আঁচড়িয়ে দিয়ে বাসনের শো-কেসের মাথায় উঠে বসল।
০৩. কাঁসর-ঘণ্টা বাজল ঢং ঢং
সেই যে একটা কথা আছে না, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।
আজ তাই ঘটল।
বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা হঠাৎ খুব বেড়ে যাওয়ায় ঠিক এই মুহূর্তে বাসনের দোকানের মধ্যে এসে যে ঢুকল, সে আর কেউ নয়, সুহাসিনী। তার বাড়ি সোনারপুরে। শেয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে, প্রতিদিন এই পথেই যায়।
আজ এই কাঁসা-পিতলের দোকানে ঢুকে সুহাসিনী যে দৃশ্য দেখল তাতে তার চক্ষু চড়কগাছ। সে তাড়াতাড়ি দোকানঘর থেকে সসংকোচে বেরিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় আবিষ্কার করল যে অকুস্থলে বিজড়িত পুরুষমানুষটি তারই পাঁচ বছরের সহকর্মী এবং বন্ধু প্রতিভাময়।
এ অবস্থায় প্রায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও সুহাসিনী বলে বসল, এ কী? এখানে আপনি এইরকমভাবে এসব কী করছেন?
সুহাসিনীকে দেখে, আপাতত কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রতিভাময় এক ঝটকায় সন্ধ্যার বাহুপাশ ছিন্ন করে দরজার পাশে রাখা তার ছাতাটা এক হাতে তুলে নিয়ে অন্য হাতে সুহাসিনীর হাত ধরে দ্রুত রাস্তায় বেরিয়ে এল।
নিজের ছাতার নীচে সুহাসিনীকে টেনে নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে পথ চলতে চলতে কোনওকম কিছু ব্যাখ্যা না দিয়ে সে উলটে অনুযোগ করল, আপনাকে বললাম একটা ফাটা কসর জোগাড় করে দিতে, দিলেন না তো।
সুহাসিনী বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল, তাই কী হল?
প্রতিভাময় বলল, সেই জন্যেই তো একটা ফাটা কাসর কিনতে এসে আমার এই বিপত্তি।
পুরো ব্যাপারটা সুহাসিনীর কাছে রীতিমতো ধাঁধার মাফিক লাগছে।
কাছেই ক্রিক রো-র একটু আগে একটা পুরনো চায়ের দোকান। এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় সেখানে লোজন বেশি নেই। চা খেতে খেতে অতি সংক্ষেপে আধঘণ্টার মধ্যে প্রতিভাময় বেড়াল ও দিদিঘটিত সমস্যা সুহাসিনীকে বোঝাল।
প্রতিভাময় এ কথাও বলল যে দিদি একবার চটে গেলে আমার সল্টলেকের বাড়িতেও থাকা হবে না, বিয়েও হবে না।
সামান্য কয়েকটা বেড়ালের জন্যে বাড়ি ছাড়তে হবে, বিয়ে করতে পারবে না–এসব কথা শুনে সুহাসিনীর মনটা একটু নরম হল। সোনারপুরের মেয়েরা এমনিতেই খুব নরম হয়।
সুহাসিনী প্রতিভাময়কে বলল, আচ্ছা, আপনি যদি জামশেদপুরে গিয়ে আপনার দিদিকে একটু গুছিয়ে বলেন, যদি বোঝাতে পারেন যে সল্টলেকে সব বাড়িতেই বেড়াল গিজগিজ করে।
প্রতিভাময় বলল, আমার সে সাহস নেই। দিদির সামনে বেড়ালের কথা আমি বলতে পারব না।
দুম করে সুহাসিনী বলে বসল, আমি যদি আপনার সঙ্গে যাই?
এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব আর কী হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিভাময় রাজি হয়ে গেল।
পরের শনিবার খুব ভোরের ট্রেনে দুজনায় জামশেদপুর। পাঁচ বছর অফিসে পাশাপাশি কাজ করেও যা হয়নি, একবেলার রেল যাত্রায় দুজনের সম্পর্ক আপনি-আজ্ঞে থেকে তুমিতে নেমে এল।
জামশেদপুরে যাওয়ার পর কিন্তু চারুশীলাকে বেড়ালের কথা বলার সুযোগই পাওয়া গেল না। চারুশীলা চিরদিনই একরোখা। সুহাসিনীকে দেখেই চারুশীলা মনস্থির করে ফেললেন, প্রতিভাময়কে বললেন, এ বয়েসে অত বড় খালি বাড়িতে তোমার একলা থাকা ঠিক নয়।
বাড়ি যে মোটেই খালি নয়, বাড়িভর্তি যে বেড়াল, সে কথা বলতে পারল না প্রতিভাময়।
ততক্ষণে সুহাসিনীকে চারুশীলা বলেছেন, কয়েকদিনের মধ্যেই ভাদ্র মাস পড়ে যাবে। তার আগে তোমাদের বিয়েটা সেরে ফেলো। তোমরা কালকেই রেজিস্ট্রি করে নাও।
ঘটনার ও প্রস্তাবের আকস্মিকতায় প্রতিভাময় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। সুহাসিনী ক্ষীণ আপত্তি জানাল, রেজিষ্ট্রি করতে একমাসের নোটিশ লাগবে যে।
চারুশীলা ধমক দিয়ে উঠলেন, নোটিশ, নোটিশের নিকুচি করেছে। বেহারে নোটিশ-ফোটিশ কিছু লাগে না।
বিয়ে হয়ে গেল সুহাসিনী ও প্রতিভাময়ের। এবং এ গল্পও এর পরে টেনে যাওয়া উচিত হবে না। কিন্তু বিড়ালদের ব্যাপারটা এখনও একটু বাকি আছে। সেটুকু না লিখলে চলবে না।
