সুহাসিনী একটু ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে বলল, কেন? আমার গলার স্বর শুনে আপনার বুঝি তাই মনে হয়?
রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে বেড়াল তাড়ানোর কথাটা চেপে গিয়ে প্রতিভাময় বলল, না না। তা নয়। আসলে হয়েছে কি আমাদের পাড়ার একটা তাসা পার্টি আছে। ভাঙা কসর না হলে তাসা পার্টি জমে না। আমি বলেছি, আমি ওদের একটা ভাঙা কাঁসর উপহার দেব।
সুহাসিনী অবাক হয়ে বলল, সে কী? সল্টলেকে তাসা পার্টি।
সুহাসিনীর প্রশ্নবোধক এবং ব্যঞ্জনাময় ভ্রকুঞ্চন দেখে এর পরে আর কথা বাড়ানোর সাহস পায়নি প্রতিভাময়। সাহস করে, পরিচিত আর কারও কাছে ফাটা কাসরের অনুসন্ধানও করেনি।
অবশেষে আজ বড়বাবুর কাছে অফিস শেষ হওয়ার আধঘণ্টা আগে ছুটি নিয়ে প্রতিভাময় রওনা হয়েছে বউবাজার-শিয়ালদার পুরনো মোড়ের দিকে। ওখানে আগে অনেক কাসা-পিতলের বাসনের দোকান ছিল। এখনও নিশ্চয় আছে। সেখানে শুধু বাসন নয়, কাসা-পিতলের সবরকম জিনিস, ফুলদানি, পঞ্চপ্রদীপ, কাঁসর-ঘণ্টা সব কিছুই বিক্রি হয়।
প্রতিভাময় এটাও জানে যে সোনার গয়নার দোকানের মতোই এসব দোকানে কেনা-বেচা দুই-ই হয়। নতুন জিনিস যেমন বেচা হয় তেমনিই পুরনো জিনিস কেনাও হয়।
সেই আশাতেই আজ সে বউবাজারের মোড়ে এসেছে। এত বড় কলকাতা শহর, কেউ কি একটা ফাটা কাসর কোনও দোকানে বেচেনি।
আষাঢ় শেষের কলকাতার বৃষ্টি হুমহুম, বৃষ্টি ঝিরঝিরে, কাদা থিকথিক, কাদা প্যাঁচপ্যাঁচে রাস্তা।
বউবাজার স্ট্রিট দিয়ে যাওয়া যাবে না।
সেখানে ট্র্যাফিক পুলিশ পাবলিকদের ধরে হাঁটি হাঁটি পা-পা শেখাচ্ছে, যে শিখছে না, শিখতে পারছে না তার একশো টাকা ফাইন। দুজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি নাকি টেরিটি বাজারের মুখে ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে হত্যা দিয়ে শুয়ে ছিল, তাদের পা রাস্তায় গিয়ে পড়ায় পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে ওই একশো টাকা জরিমানা করেছে।
ফাটা কাঁসর-ঘণ্টা কিনতে কত লাগবে, কে জানে? তার ওপরে ওই জরিমানার একশো টাকা দেওয়ার ক্ষমতা প্রতিভাময়ের নেই। সে গণেশ অ্যাভিনিউ ধরে, ওয়েলিংটন স্কোয়ার পার হয়ে পুরনো জেলেপাড়া, মুচিপাড়া পার হয়ে ঝমঝমে বৃষ্টিতে ছাতার নীচে কোনওরকমে মাথা বাঁচিয়ে, সারা শরীর ভিজিয়ে অবশেষে প্রথম বড় দোকানটায় ঢুকল।
খাগড়ার খাঁটি কাঁসা ও পিতলের দোকান, কিন্তু দোকানে ঢুকে প্রতিভাময় দেখল এটা একটা স্টেনলেস স্টিলের বাসনের দোকান।
কোনও বাক্যবিনিময় না করে, দোকান থেকে বেরিয়ে প্রতিভাময় বেশ কিছুটা এদিক ওদিক করে একটা ভাঙা-ভোল্লা কাসা-পিতলের দোকান খুঁজে পেল।
বেশ বড় দোকান। মহাত্মা গান্ধীর মতো গোল চশমা, হাফ ধুতি পরা এক স্বাস্থ্যবান বৃদ্ধ একটা মেহগিনি কাঠের শূন্য শো-কেস ভরা বিশাল ঘরে ষাট পাওয়ার বালবের নীচে ছায়াছত্রে বসে আছেন। এই প্রবীণ কংসবণিককে বেচাকেনায় খুব উৎসাহী মনে হল না। প্রতিভাময়ই এগিয়ে গিয়ে তার কাছে তার প্রয়োজনের কথা বলল।
দেখা গেল ভদ্রলোক স্টেনলেস স্টিলের বাসনপত্রের ওপর খুব খাপ্পা। প্রতিভাময়ের অনুসন্ধানের কোনও জবাব না দিয়ে নিজেই প্রশ্ন করলেন, কেন, স্টেনলেসের কাঁসর-ঘণ্টা পেলেন না?
নিজের বিদ্যাবুদ্ধি অনুযায়ী প্রতিভাময় বললে, কাঁসার তৈরি বলেই তো কঁসর-ঘণ্টা। স্টিলের হবে কী করে?
প্রতিভাময়ের জ্ঞান দেখে বৃদ্ধ বেশ খুশি হলেন, বললেন, আজকাল তো কসর-ঘণ্টা বিক্রিবাটা নেই। পিতল-কাঁসার বাসনই বিক্রি হয় না। তবে আমার কাছে একটা কাসর পড়ে আছে। সেটা আপনি নিতে পারেন।
এই বলে বৃদ্ধ দোকানের ভিতরের দিকে মুখ করে, এই সন্ধ্যা, এই সন্ধ্যা বলে চেঁচাতে লাগলেন। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘুম চোখ, আলুলায়িত চুল, আলুথালু হাতকাটা ম্যাক্সি পরা এক ঠিক-কোন বয়েসিবলা কঠিন মহিলা বাসনের আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এলেন, তার কোলে একটা হৃষ্টপুষ্ট সাদা-কালো বেড়াল।
মহিলাটি এই প্রবীণ কংসবণিকের স্ত্রী না কন্যা না নাতনি নাকি আরও ঘনিষ্ঠতর কেউ সেটা অনুমান করতে না পারলেও প্রতিভাময় এটা বুঝতে পারল এই মার্জারপ্রেমিকার কাছে ভাঙা কাঁসর-ঘণ্টা পিটিয়ে বেড়াল তাড়ানোর কথা বলা যাবে না।
সে যা হোক, বৃদ্ধ মহিলাটিকে বললেন, সেই কাঁসর-ঘণ্টাটা নিয়ে আয় তো।
মহিলাটি বললেন, সেই রায়পুর স্কুলের ঘণ্টাটা?
বৃদ্ধ বললেন, ওই একটাই তো ঘণ্টা দোকানে আছে। তারপর প্রতিভাময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, রায়পুর স্কুল থেকে এই ঘণ্টাটা বানাতে দিয়ে গিয়েছিল। তা আজ প্রায় দশ বারো বছর। কিন্তু সে স্কুলের হেডমাস্টারের সঙ্গে স্কুল কমিটির হাইকোর্টে মামলা চলছে, শুনেছি স্কুল নাকি উঠে গেছে।
ইতিমধ্যে মহিলাটি দোকানের ভিতর থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে একটা দড়ি ঝোলানো কাঁসর-ঘণ্টা বার করে নিয়ে এসেছে।
প্রতিভাময় কাঁসরটি হাতে নিয়ে দেখল তার নীচের দিকে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করা রয়েছে, রায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়
১৯৮০
তার মানে সেই উনিশশো আশি থেকে এই কাঁসরটি পড়ে আছে সতেরো বছর।
খোদাই করা জায়গাটা প্রতিভাময় লক্ষ করছে দেখে বৃদ্ধ বললেন, ও কিছু নয়, যদি চান তো ঘষে তুলে দেওয়া যাবে।
প্রতিভাময় বলল, তা তুলে দিতে হবে। তা ছাড়া কাসরটাকে মধ্য দিয়ে ফাটিয়ে দিতে হবে।
