সস্ত্রীক প্রতিভাময়কে দেখে বেড়ালেরা কী বুঝল কে জানে। তবে বেড়ালের আগে কাকেরা পালাল।
সুহাসিনী যে অত কর্কশকণ্ঠী এ কথা ঘুণাক্ষরেও প্রতিভাময় অনুমান করেনি। অল্প দিনের মধ্যেই দাম্পত্য কলহ এমন মাত্রা ধারণ করল যে সকালে রুটির টুকরো খেতে ছাদে যে কাকগুলো আসত, তারা আর আসে না। কোথায় যে চলে গেল, সেগুলোকে আর দেখাই যায় না।
অতঃপর নিঃশব্দে একে একে বেড়ালগুলোও গৃহান্তরী হল। সুহাসিনীর কণ্ঠস্বর শুনলেই তাদের থরহরি কম্প হচ্ছিল।
পুজোর সময় যখন চারুশীলা ও তার স্বামী সল্টলেকের বাসভবনে এলেন, তাঁরা টেরও পেলেন যে এই বাড়িতে দুমাস আগেও বেড়ালদের ডেরা ছিল।
সুহাসিনী ননদকে আদর-যত্ন করে। এবার পুজো চারুশীলারও খুবই আনন্দে কাটল। সুহাসিনীও বুদ্ধিমতী। তার কর্কশকণ্ঠ একবারের জন্যেও বড় ননদের কর্ণগোচর হয়নি। তদুপরি নন্দাইয়ের সঙ্গে হাস্য-পরিহাসে তার দিন শহরের মেঘের মতো হালকা চালে ভেসে চলেছে।
হতভাগ্য প্রতিভাময়। পুরনো বেড়ালগুলো তার জন্যে গলির মোড়ে অপেক্ষা করে। সে গোপনে বাজার থেকে কুচো মাছ কিনে এনে তাদের খাওয়ায়।
মূল কাহিনি
আপাতত যথেষ্ট হয়েছে। পাঠক-পাঠিকাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক গল্পের সুযোগে নিষিদ্ধ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি জ্ঞানদান করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এবার আমরা মূল গল্পে প্রবেশ করি। প্রথমেই ভ্রম সংশোধন। বাংলা মদের দোকানের নাম যে থাকে না তা নয়। বাংলা মদের নামহীন দোকান সব, যেগুলোকে তার গ্রাহক-অনুগ্রাহকেরা ভালবেসে ঠেক বলে থাকে, কখনও কখনও গ্রাহকদের দ্বারস্থ গৌরবার্থে নামান্বিত হয়। যেমন খালাসিটোলা, বারদুয়ারি, হাবিলদার বাড়ি, মায়ের ইচ্ছা ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই সব ঠেকে দু-চারজন যে বিক্ষিপ্তভাবে যায় না তা নয় কিন্তু অধিকাংশই দলবদ্ধভাবে যায়। বন্ধুবান্ধবের একেকটা দলে চার-পাঁচ জন থেকে পনেরো-বিশজন পর্যন্ত থাকে।
.
পূর্ব কলকাতার হাবিলদার বাড়ি একটি সুপ্রাচীন বিখ্যাত ঠেক। কেন এই মদের দোকানটির নাম হাবিলদার বাড়ি সেটা কেউ জানে না। শোনা যায়, কোনওকালে কোনও হাবিলদার সাহেব বেনামে এই মদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কালক্রমে কৃতজ্ঞ গ্রাহকবৃন্দ বেনামকে স্বনামে এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই হাবিলদার বাড়ি ঠেকের নিয়মিত খদ্দেরদের মধ্যে কয়েকটা দল আছে, তার একটি হল বুড়ো শিবতলা নাচগানের একটি সমিতি। অবশ্য যারা সন্ধ্যাবেলা এই দলের সঙ্গে বসে এই ঠেকে নেশা করেন তারা সবাই এই ধার্মিক সংঘের লোক নয়। সমিতিটির পোশাকি নাম নামব্রত সঙ্ঘ।
মদের দোকানটির উত্তর সীমান্তে ডানদিক ঘেঁষে মুখোমুখি দুটো লম্বা বেঞ্চে সঙেঘর রাজত্ব। মধ্যে কোনও টেবিল নেই। বেঞ্চের নীচে বোতল, জল ইত্যাদি এবং সুরাপাত্র সামনের বেঞ্চের লোকটির পাশেই রাখা নিয়ম। এ তো আর বিলিতি মদের বার নয়, সাহেবি ক্লাবও নয়। তবে অসুবিধা হয় শনিবার সন্ধ্যাবেলা, রবিবার দুপুরে। ভিড় উপচিয়ে পড়ে। হাবিলদার বাড়ি মাতালের ভিড়ে গিজগিজ করে। হই হট্টগোলে গমগম করে, মদ-চাট-ঘামের গন্ধে থই থই করে।
এই ঠেকে বুড়ো শিবতলা নামচক্র সঙেঘর নিয়মিত সদস্যের সংখ্যা পাঁচ-ছয় জন। কিন্তু শনি-রবিবারে পনেরো বিশজনে পৌঁছে যায়। হই হই কাণ্ড হয়।
নামচক্র সঙঘ এই নাম শুনে যদি কারও মনে ধারণা হয় যে সমিতিটি সাম্প্রদায়িক তা হলে তিনি ভুল করবেন। সাম্প্রদায়িক কেন, সঙ্ঘটি ধার্মিকও বোধহয় নয়।
সঙ্ঘের প্রাণপুরুষ হল মিস্টার ডেভিড পাল, সাতপুরুষ কিংবা ততোধিক পুরুষ ধরে তালতলাবাসী এবং অ্যাংলো। তবে ডেভিডের জীবনের আরও একটা দিক আছে। ডেভিড তার সংক্ষেপিত নাম। তার আসল নাম দেবীদয়াল, দেবীদয়াল থেকে ডেভিড হয়েছে।
দেবীদয়াল নামটা তার ঠাকুমা রেখেছিলেন, তিনি ছিলেন ঘোর বোষ্টমি। কাটোয়ার ছোট লাইনে রেলগাড়ির গার্ডসাহেব ছিলেন ডেভিডের পিতামহ। ওখান থেকেই ডেভিডের ঠাকুমাকে তিনি বিয়ে করে নিয়ে আসেন। খ্রিস্টান সংসারেও মহিলা তার বোষ্টমি সত্ত্বা রক্ষা করেছিলেন। কপালে চন্দনের রসকলি এঁকে স্বামীর সঙ্গে গির্জায় যেতেন, পালা পার্বণে, রবিবার। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ করে খাঁটিয়ায় তুলে মৃত্যুর পরে তাকে কবর দেয়া হয়েছিল।
ডেভিড বেশ লম্বা, গায়ের রং ফরসা। ইংরেজি বলতে কইতে পারে। নিউ মার্কেটে একটা বড় সুতোর দোকানে কাজ করে, হেড সেলসম্যান। শীতের দিনে কোট-প্যান্ট, টাই পরে, বড়দিনে ইস্টারে সপরিবারে গির্জায় যায়। তবে তার প্রধান দুর্বলতা সে পেয়েছে তার ঠাকুরমার কাছ থেকে, সে একজন কীর্তনিয়া, নামগান সঙ্ঘের মূল স্তম্ভ।
কিন্তু এই মূল স্তম্ভটি মাঝেমধ্যেই হেলেদুলে যায়। তার কারণ ওই কারণবারি বা মদ।
ডেভিড একেক সময় মদ খাওয়া ছেড়ে দেয়, হাবিলদার বাড়িতে তাকে আর দেখা যায় না, বেশ কয়েক দিন, এমনকী কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেপাত্তা হয়ে যায়। নামগান সঙেঘর সহশিল্পীরা তার আর খোঁজ পায় না।
অবশ্য এ জন্যে ডেভিডকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। মদ্যপানে তার উৎসাহের কোনও অভাব কখনওই হয় না। সে ইচ্ছে করে হাবিলদার বাড়িতে আসে না তা নয়, তার আসা হয় না। তার আসার উপায় থাকে না তার ধর্মপত্নী জারিনার জন্যে।
