ওয়াই-জেড ব্লকের একশো নম্বর বাড়ি হল প্রতিভাময়ের জামাইবাবু ষষ্ঠীচরণের। এই একশো নম্বর বাড়িতে আগে কোনও স্থায়ী বা পোষা বেড়াল ছিল না। তবে বেড়ালের যাতায়াত নেই এমন বাড়ি এ তল্লাটে খুঁজে পাওয়া যাবে না, একশো নম্বর বাড়িও এ বিষয়ে কোনও ব্যতিক্রম নয়।
দিদি-জামাইবাবু এখানে থাকতেই দুয়েকটা বেড়ালের যাতায়াত ছিল একশো নম্বর বাড়িতে। কিন্তু বেড়াল সম্পর্কে চারুশীলার হল দেখ-মার সিসটেম, অর্থাৎ বেড়াল দেখা মাত্র মারো। যাতে চোখে পড়া মাত্র একটুও দেরি না করে বেড়ালকে মারা যায় তার জন্যে ঘরে ঘরে, দেয়ালে দেয়ালে, দরজা-জানলার আনাচে-কানাচে বাঁশের কঞ্চির বন্দোবস্ত রেখেছিলেন চারুশীলা।
বলা বাহুল্য, চারুশীলারা জামশেদপুর চলে যাওয়ার পরে পশুপ্রেমী প্রতিভাময় এতটা কড়াকড়ি করতে পারেনি। বরং, সত্যি কথা বলতে গেলে, বেড়ালগুলোকে একটু প্রশ্রয়ই দিয়েছে।
একশো নম্বর বাড়িটা এখন এ পাড়ার স্ত্রী-বেড়ালদের প্রসূতি সদন। বাইরের ঘরের কোণে, সিঁড়ির নীচে, এমনকী প্রতিভাময়ের বিছানায় পর্যন্ত বেড়ালেরা বাচ্চা দিয়েছে। প্রথম দিকের ছানাগুলো এখন বেশ বড় হয়েছে। আগের ধাড়ি বেড়ালগুলোকে মারধোর করে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারলেও এই নবপ্রজন্মের মার্জার শিশু ও যুবকদের হাজার চেষ্টা করেও এখান থেকে বহিষ্কার করা অসম্ভব। কারণ এখানে বাস করা তাদের জন্মগত অধিকার।
এখন এই বেড়ালদের এখান থেকে হটাতে হবে, তা না হলে কেলেংকারি কাণ্ড অবশ্যম্ভাবী। দিদি-জামাইবাবুর এ বাড়ি তো ছাড়তে হবেই, তা ছাড়া দিদি তার বিয়ের জন্যে কোনও উদ্যোগ নেবে না। এদিকে নিজে বিয়ে করার এলেম যে তার নেই সেটা প্রতিভাময় ভাল করেই জানে।
বেড়ালগুলোকে একটা একটা করে থলেতে ভরে দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসা যায়। কিন্তু তাতে নাকি কোনও লাভ হবে না। অফিসে তার সহকর্মিণী সুহাসিনী তাকে বলেছে, বেড়াল যেখানেই ছেড়ে দিয়ে আসা হোক, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একা একাই পথ খুঁজে বাড়ি আসবে। এ কথা অনেকদিন আগেই নাকি শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর গল্পে বিশদভাবে বলে গেছেন।
অনেক ভেবেচিন্তে প্রতিভাময় বুঝতে পেরেছে কোথাও ফেলে-টেলে দিয়ে এলে সেটা পণ্ডশ্রম হবে, তার চেয়ে এই বেড়ালগুলোকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে হবে।
এখন বিবেচনা করতে হয়েছে, বেড়াল কীসে ভয় পায়?
মারধোর করলে বেড়াল কিছুক্ষণের জন্য পালিয়ে যায়, তারপর আবার ফিরে আসে। খাবার বন্ধ করলে অন্য জায়গায় গিয়ে চুরি করে খেয়ে আবার চলে আসে।
অবশ্য বেড়াল তাড়ানো নিয়ে প্রতিভাময় অনিবার্য কারণেই নানারকম চিন্তা করেছে।
এর আগে যখন বরানগরে একটা ভাঙা পুরনো বাড়িতে থাকত, সেখানে প্রতিভাময় একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে। এমনিতেই সবাই জানে যে বেড়াল ইঁদুর ধরে, ইঁদুর মারে এবং সত্যি ঘটনাও তাই। কিন্তু বেড়াল ইঁদুরের রাজসংস্করণ ছুঁচোকে খুব ভয় পায়। বরানগরের বাড়ির উঠোনে সে দেখেছে অনেকদিন রাতে বেড়াল ছুঁচোর তাড়া খেয়ে দৌড়ে দেয়াল টপকিয়ে পালাচ্ছে।
তবে ছুঁচো সংগ্রহ করা সহজ নয়। এটা নতুন এলাকা, এদিকে এখনও সে ছুঁচো দেখেনি। এর চেয়েও বড় কথা, বেড়াল তাড়ানোর জন্যে বাড়িতে ছুঁচো নিয়ে আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
তবে একটা কথা, বেড়াল কুকুরকে খুব ভয় পায়। কিন্তু বাড়ির মধ্যে কুকুর ঢোকালে সেটাও চারুশীলা বরদাস্ত করবেন না। আর কুকুরছানায় তো হবে না। পোষা বড় কুকুর চাই, তেমন কুকুর কীভাবে পাওয়া যাবে?
অবশ্য এর একটা বিহিত করেছিল প্রতিভাময়। বাজারের মোড়ে গিয়ে একটা ছোট স্লাইস পাউরুটি কিনে সে রাস্তার নেড়ি কুকুরদের মধ্যে অসম বণ্টন করে, বেশ পক্ষপাতিত্ব দেখায়। একে কম দেয় ওকে বেশি দেয়।
ফলে নেড়ি কুকুরদের মধ্যে বেশ একটা হুলুস্থুল ঝগড়া লেগে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ হুটোপাটি, ভৌ-ভৌ, ঘেউ-ঘেউ, কেঁও-কেঁও।
সঙ্গে কাঁধের ঝোলার মধ্যে টেপরেকর্ডার নিয়ে গিয়েছিল প্রতিভাময়। পাশের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে চা খেতে খেতে কুকুরদের পুরো ঝগড়াটাই রেকর্ড করে এনেছিল সে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এতে কোনওই কাজ হয়নি। বাসায় এনে সেই টেপটা উচ্চগ্রামে বাজানোর পরে বেড়ালদের মধ্যে কোনও ভাববিকার দেখা যায়নি, শুধু একটা বুড়ো বেড়াল এসে টেপরেকর্ডারটা ঘুরে-ফিরে শুকে দেখেছিল।
বেড়াল তাড়ানোর কোনও উপায় বার করতে না পারায় প্রতিভাময় স্বভাবতই খুব মুড়িয়ে পড়ে। এমন সময় তার মনে পড়ে একটি বাল্যস্মৃতির কথা।
প্রতিভাময়দের দেশের বাড়িতে একটা আধফাটা কাসর-ঘণ্টা ছিল। পুজো-পার্বণে সেই ভাঙা কাসর বাজানোর দায়িত্ব ছিল প্রতিভাময়ের।
তার বেশ মনে আছে, কঁসর-ঘণ্টা বাজানো আরম্ভ করা মাত্র বাড়ির দুটো পোষা বেড়াল লেজ তুলে পালাত। পরে ভাঙা কাসর পালটিয়ে নতুন কাসর-ঘণ্টা কেনার পর কিন্তু কাসরের বাজনা শুনে বেড়াল দুটো আর ভয় পেয়ে পালাত না।
০২. ফাটা কাঁসরের খোঁজে
এ কথা মনে পড়ার পর প্রতিভাময়ের একমাত্র চেষ্টা হল একটা ফাটা কাঁসর-ঘণ্টা সংগ্রহ।
বাসার দোতলায় চারুশীলার পুজোর ঘরে একটা পুরনো কাসর ছিল। সেটা হাতুড়ি পিটিয়ে সে ফাটানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু চারুশীলার শাশুড়ির আমলের জিনিস সেটা, ইসলামপুরের খাঁটি কাঁসার তৈরি। অনেক চেষ্টা করেও সেটা ফাটানো গেল না। শেষে সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে সেটার মধ্যস্থানে হাতুড়ি মারতে সাবেকি জিনিসটা ভেঙে চৌচির হয়ে গেল, একেবারে চার টুকরো। প্রতিভাময় বুঝতে পারল কসর না ভেঙে ফাটানো সোজা কাজ নয়। এখন কথা হল ফাটা কাসর কোথায় পাওয়া যাবে। অনেক ভেবেচিন্তে অফিসে সুহাসিনীকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে ফাটা কাঁসর-ঘণ্টা আছে?
