ঢং ঢং করে রাস্তা দিয়ে একটা রিকশা চলে গেল। নিশ্চয়ই কোনও লেট মাতাল বাড়ি ফিরছে।
মহিমাময়ের মনের মধ্যে কেমন যেন আরও বেড়ে গেল আকুলি-বিকুলি। সে ধীরপায়ে উঠে সন্তর্পণে বউকে না জাগিয়ে শোয়ার ঘরের আলমারির পিছন থেকে পানীয়ের বোতলটা বের করে আনল, প্রায় আধ বোতল আছে। ফ্রিজ থেকে খাওয়ার জল বের করে খাওয়ার টেবিলে বসল। তারপর একটু ভাবল, মদ খেয়ে ঘুমের ওষুধ খাওয়া নিষেধ, কিন্তু ঘুমের ওষুধ খেয়েও কি মদ খাওয়া নিষেধ!
তারপর আর ভাবল না।
সকালবেলা মহিমাময়ের বউ ঘুম থেকে উঠে দেখল স্বামী খাওয়ার টেবিলে হাত মাথায় দিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পাশে শূন্য বোতল, শূন্য গেলাস।
মার্জার পুরাণ
০১. ভাঙা কাঁসর-ঘণ্টা
ছুটি হয় সেই সাড়ে পাঁচটায়।
আজ বড়বাবুকে বলে আধঘণ্টা আগে অফিস থেকে বেরিয়েছে প্রতিভাময়। মিশন রো-র পাশের একটা গলিতে আধা-সরকারি অফিস, যাকে বলা হয় সরকারি সংস্থা বা আন্ডারটেকিং।
বউবাজার-শিয়ালদা পুরনো মোড়ে, ফ্লাইওভারের নীচ ধরে দক্ষিণ বরাবর পিতল-কাঁসার থালাবাসনের দোকান আছে। মানে ছিল। এখনও আছে কিনা বলা কঠিন। ফ্লাইওভার তৈরি হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলটা তো একেবারে অগম্য হয়ে উঠেছে।
আজ ওই বাসনের দোকানে যাবে বলে প্রতিভাময় আধঘণ্টা আগে থেকে বেরিয়েছে। দুপুরে অফিস থেকে বেরোলেই ভাল হত।
প্রতিভাময় থাকে লবণ হ্রদে। বিকেলে ছুটির পরে অফিস থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়ে রাজভবনের কাছে গেলেই সল্টলেকে তার আস্তানায় ফেরার জন্যে প্রায় খালি মিনিবাসে ওঠা যায়।
বউবাজারের মোড় থেকেও অবশ্য বেশ কয়েকটা বাস আছে সল্টলেকের। কিন্তু এই সন্ধ্যাবেলায় সেগুলোতে ভয়াবহ ভিড়। উল্টোডাঙার ট্রামে উঠে সেখানে নেমে হেঁটে বা অটোতে যাওয়া যায়। কিন্তু ট্রাম কদাচিৎ মেলে।
কিন্তু এসব ঝামেলা আজ প্রতিভাময়কে সইতেই হবে। যে সমস্যায় সে পড়েছে তার থেকে উদ্ধার পেতেই হবে তাকে।
সমস্যাটা আগেই বলে ফেলা ভাল।
প্রতিভাময় সল্টলেকে জামাইবাবুর বাড়িতে থাকে। দিদি-জামাইবাবু থাকেন জামশেদপুরে।
খালি বাড়ি, দোতলায় তালা। একতলায় খাওয়ার ঘর, বসার ঘর, শোয়ার ঘর, বাথরুম, এই নিয়ে প্রতিভাময়ের বসবাস।
প্রতিভাময়ের বয়েস তিরিশের কাছাকাছি। মোটামুটি ভাল ছেলে। দু-চার জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। এ ছাড়া এক জায়গায় ছাড়া ছাড়া ভালবাসার সম্পর্কও আছে, সে মেয়ে খারাপ নয়।
প্রতিভাময়ের মা-বাবা নেই। এখন অভিভাবক বলতে ওই দিদি-জামাইবাবু। তাঁরা পুজোর সময়ে দেশে এলে এ বিষয়ে একটা কিছু পাকাপাকি করবেন, এরকম একটা ক্ষীণ আশা মনে মনে পোষণ করে সে।
কিন্তু প্রতিভাময়ের যে সমস্যা বা ঝামেলার কথা একটু আগে বলেছি, তা কিন্তু তার প্রেম তথা বিবাহঘটিত নয়। সে জাতীয় সমস্যা চিরকালই আছে, ছিল, থাকবে। এই বর্ষার অনিশ্চিত বিকেলে যে সমস্যার জন্যে প্রতিভাময়কে বউবাজারে থালাবাসনের দোকানে যেতে হচ্ছে সেটা খুবই অভিনব এবং জটিলও বটে।
সমস্যাটি আমি যথাসাধ্য সরলভাবে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছি। প্রথমেই বলে নিই, প্রতিভাময়ের সমস্যা হল বেড়াল নিয়ে, বেড়াল তাড়ানো নিয়ে।
প্রতিভাময়ের দিদি চারুশীলা এবং জামাইবাবু ষষ্ঠীচরণ অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই আসছেন। এবার পুজো বেশ আগে আগে। এদিকে বর্ষার মাঝামাঝি হয়ে গেছে। দিদিদের আসার আর বড় জোর মাস দুয়েক বাকি আছে। সেই জন্যেই সমস্যাটা আরও তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে।
যদিও স্বামীর নাম ষষ্ঠীচরণ, আর বেড়াল হল মা ষষ্ঠীর জীব, চারুশীলা কিন্তু দুই চোখে বেড়াল দেখতে পারেন না। বেড়াল দেখলে তার মাথায় রক্ত উঠে যায়, একবার হাতের কাছে কিছু না পেয়ে তিনি হাতের থেকে সোনার কঙ্কন খুলে বেড়ালকে ছুঁড়ে মেরেছিলেন।
সেই দিদি-জামাইবাবু এসে যাচ্ছেন। সময় নেই বললেই চলে। এদিকে চারুশীলার সল্টলেকের বাড়িতে, যে বাড়িতে প্রতিভাময়কে তাঁরা থাকতে দিয়েছেন, বেড়াল গিজগিজ করছে।
চারুশীলা এবং প্রতিভাময়, দুই ভাই-বোনের নামে যেমন মিল নেই, তেমনি অন্যান্য বিষয়েও খুব একটা একাত্মতা নেই।
প্রতিভাময় আন্তরিকভাবে প্রাণীপ্রেমিক। রাস্তার কুকুরদের সে দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খাওয়ায়। প্রতিদিন সকালবেলায় ছাদে উঠে আগের রাতের বাসি রুটি টুকরো টুকরো করে ছিটিয়ে দেয় পাড়ার কাকদের। কাকদের এটা অভ্যাস হয়ে গেছে, কোনওদিন সকালবেলায় প্রতিভাময়ের ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে, তার একতলার শোয়ার ঘরের জানলায় এসে চেঁচামেচি করে।
লবণ হ্রদে এমনিতেই বেড়ালের সংখ্যা খুব বেশি। যতজন অধিবাসী বেড়ালের সংখ্যা তার থেকে কম হবে না। যেকোনও সময় যেকোনও গলির মুখে গেলে দেখা যায় এ বাড়ির বারান্দায় দুটো বেড়াল ঘুরছে, ও বাড়ির সিঁড়িতে একটা বেড়াল ঘুমোচ্ছে। এ বাড়ির দরজা দিয়ে একটা বেড়াল। বেরোচ্ছে, ও বাড়ির জানলা দিয়ে দুটো বেড়াল ঢুকছে।
যারা গাড়ি চালায়, যাদের সংস্কার আছে, গাড়ির সামনে দিয়ে বেড়াল গেলে অমঙ্গল হয়, কাটাকুটি না হলে, অর্থাৎ আরেকটা বেড়াল রাস্তা না পেরোলে কিংবা অন্য একটা গাড়ি চলে না গেলে আর এগোনো যাবে না, তাদের সল্টলেকে খুব ঝামেলা। তাদের স্থির হয়ে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ঘামতে ঘামতে অনবরত অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী কাটাকুটির জন্যে। কারণ যেকোনও সময় একটা বেড়াল গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে যাবেই।
