সেসব পুরনো কথা। আজ জয়দেবের কথা শুনে মহিমাময় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল, জয়দেবের কাছে কী বুদ্ধি আছে কে জানে। কুড়ি বছর আগে জয়দেবের পরামর্শে এবং উসকানিতে মহিমাময় এক পুলিশের জমাদারকে পেছন থেকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছিল, তার বিষময় পরিণাম এখনও তার মনে আছে।
তারও আগে আরেকবার জয়দেব তাকে হোমিওপ্যাথিক গুলি সাইজের কালো মতন বড়ি কাগজে মুড়ে এনে একদিন দেয়, বলে, খেয়ে দ্যাখ। বুদ্ধি তাজা হবে।সরল বিশ্বাসে মহিমাময় সেই বড়ি একবার খেল। তখন জয়দেব বলল, আরেকটু খা।
মহিমাময় আরও একটু খেয়ে বলল, কেমন, মরা পেঁয়ো পিঁপড়ের মতো মনে হচ্ছে।
জয়দেব টেবিল চাপড়িয়ে বলেছিল, এই তো, বেশ বুঝতে পারছিস। বুদ্ধি খুলছে। ঠিক ধরতে পেরেছিস। মরা পেঁয়ো পিঁপড়েই এগুলো।
মহিমাময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জয়দেব সব অনুমান করতে পারল, বলল, এত ভয় খাচ্ছিস কেন! এবার খুব সোজা বুদ্ধি দেব–জলের মতো সোজা।
মহিমাময় বলল, কী বুদ্ধি?
জয়দেব গম্ভীর মুখে বলল, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অল্প একটু জলখাবার খেয়ে তারপর দুটো ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়বি। ঘুম ভাঙবে সেই রাত কাবার হয়ে। রাতের বেলা পানভোজন আর কিছু দরকার হবে না।
জয়দেবের উপদেশ তখনকার মতো হেসে উড়িয়ে দিলেও, পরের দিন সকালবেলা ঠান্ডা মাথায় পার্কে হাঁটতে হাঁটতে ব্যাপারটা খুব ভাল করে ভেবে দেখল মহিমাময়। মাতালের পরামর্শ বটে কিন্তু ঠিক ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না।
সত্যিই তো, মেদবৃদ্ধির পথে সবচেয়ে গোলমেলে ওই সন্ধ্যাবেলার কয়েক ঘণ্টা। সারাদিন কষ্ট করে তারপর তখনই ধুম পড়ে খাওয়া-দাওয়ার। খাওয়া আর দাওয়া দুইয়ে মিলে ডুবিয়ে দেয় আপ্রভাত ত্যাগ ও পরিশ্রম।
তবে ঘুমের ওষুধ কেনা সোজা কাজ নয়। প্রেসক্রিপশন লাগবে। ডাক্তারখানা অনেকের কাছে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ঘুমের বড়ি বেচে, কিন্তু মহিমাময়ের চেহারা বা হাবভাবে বোধহয় সম্ভাবনাপূর্ণ আত্মহত্যাকারীর আদল আছে। সে দোকানে গিয়ে ঘুমের ওষুধ চাইলেই দোকানকর্মচারীরা গলা নামিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস কী সব আলোচনা করে, তার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখে, তারপর বলে, এখন হবে না। স্টক নেই।
অবশেষে পাড়ার ডাক্তারের কাছে গেল মহিমাময়। আসল কথা না বলে তাকে বলল, ডাক্তারবাবু, রাত্রে ভাল ঘুম হচ্ছে না। আমাকে একটু ঘুমের ওষুধ দিন।
সদাশয় ডাক্তারবাবু মহিমাময়কে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অপকারিতা এবং অপ্রয়োজনীয়তা বিষয়ে দীর্ঘ এক বক্তৃতা দিলেন, তারপর হজমের ওষুধের একটা প্রেসক্রিপশন দিয়ে বললেন, এটা খান। হজম ভাল হলেই ঘুম ভাল হবে। সাবধান, ঘুমের ওষুধ খাবেন না।
দশটাকা ভিজিটটা জলে গেল। ডাক্তারের ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে প্রেসক্রিপশনটা কুচি কুচি করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল মহিমাময়। হজমের ওষুধ না খেয়েই এই স্বাস্থ্য, হজমের ওষুধ খেলে তো শরীরের মেদসমুদ্র আরও উথাল-পাতাল হয়ে উঠবে। এখন তবুও ঘাড়ে মাথা আছে, তখন। ঘাড়ে-গর্দানে এক হয়ে যাবে।
সেই সপ্তাহের শনিবার সন্ধ্যায় জয়দেবকে তার সমস্যার কথা বলল মহিমাময়। প্রথমে জয়দেবের মোটেই মনে ছিল না, সে প্রশ্ন করল, ঘুমের ওষুধ দিয়ে কী করবি? তারপর উত্তর পাওয়ার আগেই পরামর্শ দিল, বেশি করে মদ খাবি, তাহলেই ঘুমের ওষুধ লাগবে না। বিছানায় শুতে না শুতে ঘুমিয়ে পড়বি।
এবার মহিমাময় আগের সপ্তাহের কথাবার্তা মনে করিয়ে দিতে জয়দেবের মনে পড়ল। সে বলল, কী বলছিস, ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিল না? তারপর টেবিল থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাশের ফার্মেসি থেকে দশটা ঘুমের বড়ি এনে মহিমাময়কে দিয়ে বলল, যেকোনও দোকানে গিয়ে চাইলেই পেতিস, ডাক্তারের কাছে গেলি কেন?
মহিমাময় জয়দেবকে এ কথা আর বলল না যে ডাক্তারখানায় তাকে ঘুমের ওষুধ দিতে চায়নি। জয়দেব একটু পরে বলল, নেশা করে কখনও ঘুমের ওষুধ খাবি না। হঠাৎ বিপদ হতে পারে।
ওষুধটা বুকপকেটে রাখতে রাখতে মহিমাময় ভাবল, নেশা করে ঘুমের ওষুধ খেতে যাব কেন, নেশা না করার জন্যেই ঘুমের ওষুধ খাব।
পরের দিনই মহিমাময় ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখল। সন্ধে সাড়ে সাতটায় যখন কারণবারির জন্যে জিব শুকিয়ে এসেছে মহিমাময় দুটো ঘুমের ট্যাবলেট এক গেলাস জল দিয়ে খেয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। বউকে বলে গেল, আজ থেকে রাতে খাব না, ঘুম থেকে ডেকে তুলো না।
এবং সত্যিসত্যিই রাত আটটার মধ্যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল সে।
ঘুম ভাঙল সেই রাত তিনটেয়। খিদেয় পেট চো চো করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ, দুচোখে তখন কেমন একটা ভারি ভারি, ঘুম ঘুম ভাব, সারা শরীরে জড়তা। কোনওরকমে ঘুম থেকে উঠে বাথরুম হয়ে খাওয়ার ঘরে গেল সে। গিয়ে দেখল সতীসাধ্বী সহধর্মিণী রাতে খেতে ডাকেনি বটে, কিন্তু রাতের খাবার টেবিলে একটা বড় থালা দিয়ে ঢেকে রেখেছে।
খাবার দেখে মহিমাময় প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর, যা কিছু ছিল সব গোগ্রাসে খেয়ে নিল। তারপর দু গেলাস জল ঢক ঢক করে খেল। তবুও কেমন খালি খালি, একটা অপূর্ণ ভাব, তার মনের মধ্যে কীসের জন্যে কেমন একটা আকুলি-বিকুলি।
রাত্রির তৃতীয় প্রহর সদ্য অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন অন্ধকার সবচেয়ে গাঢ়। খাওয়ার ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকাল মহিমাময়, দু-এক টুকরো ছেঁড়া মেঘ তারই ফাঁকে ফাঁকে তারাগুলো জ্বলজ্বলে। কিছুক্ষণ আগে বোধহয় বৃষ্টি হয়েছে। এখনও জলের ফোঁটার ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বাতাসে জোলো গন্ধ। মোড়ের মাথায় পুরনো শিমূলগাছটায় কী একটা খুব কর্কশ চেঁচাচ্ছে।
