অন্যান্য খাবার ব্যাপারেও যথেষ্ট ধরাবাঁধার মধ্যে এসেছে সে। সকালের চায়ে চিনির বদলে স্যাকারিন খায়। সঙ্গে আগে চারটা বিস্কুট খেত এখন একটা তাও সেটা থেকে এক টুকরো ভেঙে বাড়ির পোষা কুকুরটাকে দেয়। কুকুরটা মহিমাময়ের ছেলের আগে কখনও মহিমাময়কে দেখে জীবনে একবারও লেজ নাড়েনি। এখন বিস্কুটের সামান্য ভাগ পেয়ে অল্প অল্প লেজ নাড়ে।
দুপুরেও মহিমাময় ভাত দুমঠো কম খায়। ভাত খেতে বসার আগে পর পর দু গেলাস জল খেয়ে নেয় যাতে পেটে বেশি জায়গা না থাকে। ভাতের সঙ্গে ঘি, ভাজা-টাজা, ডিম-মাংস এসব বন্ধ করেছে, ডাল, তরকারি আর ছোটমাছ। দুপুরে অফিসে টিফিন নিয়ে যায় সে। আগে চার-পাঁচখানা রুটি নিত, এখন ঠিক দুটো রুটি, সঙ্গে সামান্য তরকারি। বাড়ির বাইরে চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। যদি খেতেই হয়, বড় জোর চিনি ছাড়া চা।
খাদ্যে ক্যালোরির পরিমাণ এবং সেই সঙ্গে মেদবৃদ্ধি সংক্রান্ত বাজার চলতি বেশ কয়েকটি বই আগাগোড়া মন দিয়ে পাঠ করেছে মহিমাময়। বলতে গেলে এ বিষয়ে সে এখন একজন অথরিটি। ক্যালোরি ব্যয়ের হিসাবের খুঁটিনাটিও এখন তার মুখাগ্রে। সিঁড়ি দিয়ে নামলে কত ক্যালোরি ব্যয় হয়, সিঁড়ি দিয়ে উঠলে কত, হাঁটলে কত, ছুটলে কত, বসে থাকলে কত, শুয়ে থাকলে কত সব মহিমাময় জেনে গেছে।
সে জেনে গেছে দৈনিক সকালে একঘণ্টা হাঁটলে এক বোতল বিয়ার বা দু-পেগ রামের ক্ষতিপূরণ হয়। তিন কাপ চায়ে সাড়ে চার চামচে চিনি খাওয়া হয়, সেটা এক গেলাস বাংলা খাওয়ার সমান।
সব জেনে গেছে মহিমাময়। সকালে বহু সাধের সুখনিদ্রা ফেলে সে মাঠে গিয়ে তরতর করে ছোটে। তারপর সারাদিন সবরকম লোভ দমন করে যথাসাধ্য কম খেয়ে সে দিনযাপন করে। সে রাবড়ি খেতে ভালবাসত। মোগলাই পরটা খেতে ভালবাসত। তেলেভাজা বেগুনি ফুলুরি খেতে ভালবাসত–মোটা হওয়া কমানোর জন্যে সে সব ছেড়ে দিয়েছে।
কিন্তু তাতে লাভ কী? সারাদিন মহিমাময় কত কষ্ট করে লোভ দমন করে থাকে। রাস্তায় তার প্রিয় চিকেনরোল ভাজা হচ্ছে, আলুর চপের গন্ধে বাতাস ভুরভুর করছে, দলে দলে লোক সেসব কিনে খায়, কিন্তু মহিমাময় কখনও এসব লোভ করে না, অন্তত সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
সূর্যাস্তের পরে ধীরে ধীরে, অতি ধীরে ধীরে, মহিমাময়ের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। সাড়ে সাতটা নাগাদ সে বরফ-সোডা আর সামান্য একটা পানীয় নিয়ে বসে। তখনই সর্বনাশের শুরু হয়। একটু পান করার পরে সে গায়ে পাঞ্জাবি পায়ে চটি গলিয়ে রাস্তায় গিয়ে এক টাকার খোসা ছাড়ানো চিনেবাদাম আর দেড় টাকার চানাচুর নিয়ে আসে। পানীয় কম থাকলে মোড়ের মাথায় দত্তের দোকানে গিয়ে একটা বোতল কেনে। তারপর সারাদিনের ত্যাগ ও পরিশ্রম জলে ভেসে যায়। আধ বোতল পানীয়, সঙ্গে চানাচুর-বাদাম, তারপরে নৈশ আহারে বসে মহিমাময়ের খাওয়ার রোখ চেপে যায়। আরও ভাত, তরকারি চেয়ে চেয়ে খায়, ঝোল থেকে বেছে বেছে চামচে দিয়ে আলু তুলে নেয়। মহিমাময়ের স্ত্রী মহিমাময়ের মোটা হওয়া নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না। সুতরাং কোনও দিক থেকে কোনও বাধা নেই। সারাদিন যা খেয়েছে, শুধু এক সন্ধ্যায় সে তার চারগুণ খেয়ে ফেলে। চানাচুর বাদাম, আধবোতল মদ চোখে দেখে বোঝা না গেলেও ডাক্তারি মতে মোটা হওয়ার ব্যাপারে বিয়েবাড়ির বিরিয়ানি-মাংস-ফিশফ্রাই দই মিষ্টি খেজুরের চাটনির লম্বা ভোজের সমান।
সুতরাং মহিমাময়ের আরও, আরও মোটা হওয়া, ক্রমাগত স্কুল থেকে স্থূলতর হয়ে যাওয়া জগৎসংসারে কেউ ঠেকাতে পারবে না।
শরীরের চর্বি তাড়াতাড়ি পোড়ানোর কী এক বিলিতি ট্যাবলেট বেরিয়েছে বাজারে, খুব দাম, স্থূলাঙ্গিনী বণিকবধূরা দুবেলা মুঠো মুঠো খাচ্ছে। মহিমাময়ের এক বন্ধু তাকে ওই ট্যাবলেট খেতে বলল। ট্যাবলেট কিনতে গিয়ে মহিমাময় ফিরে এল। এক শিশি একশো আশি টাকা। এর ডবল পরিমাণ পানীয়ের পাঁইটের দাম বড়জোর চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ টাকা। এ ওষুধ খেতে গেলে এমনিই রোগা হয়ে যাবে, কারণ তাহলে মদ বা খাবারের পয়সা আর জুটবে না। এ ব্যবস্থা মহিমাময়ের পছন্দ হল না।
আর তা ছাড়া মহিমাময় মনে মনে জানে যে ওষুধ-ফষুধে কিছু হবে না। পান-ভোজন না কমালে কোনও গতি নেই।
জয়দেবের সঙ্গে একদিন এ নিয়ে আলোচনা করছিল সে। জয়দেবের ওপরে ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে, যতই খাক সে তার গায়ে গত্তি লাগে না। এই চুয়ান্ন বছর বয়েসেও সে বাইশ বছরের ছিপছিপে চেহারা রাখতে পেরেছে। অথচ সে মহিমাময়ের চেয়ে পানভোজন কম তো করেই না, বরং যথেষ্টই বেশি করে।
জয়দেবই পান করতে করতে মহিমাময়কে পরামর্শটা দিল। সে বলল, দ্যাখ মহিমা, আমার শরীরের মধ্যে বিদ্যুতের আগুন আছে। ভালমন্দ যা খাই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাইভস্ম করে দেয়। তোর তো আর সে ক্ষমতা নেই। তোকে খাওয়া বন্ধ করতে হবে আর এ জিনিসটাও। বলে নিজের গেলাসটা আদর করে আলতো করে ছুঁল।
মহিমাময় করুণ মুখে বলল, কিন্তু কী করে বন্ধ করব? অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুতেই ছাড়তে পারলাম না।
জয়দেবের বেশ নেশা হয়েছিল, এক চোখ টিপে চালাকের মতো মুখ করে বলল, আমার কাছে বুদ্ধি আছে, খুব ভাল বুদ্ধি।
মহিমাময়েরও যথেষ্ট নেশা হয়েছিল। আজ শনিবার। পার্ক স্ট্রিটের শেষপ্রান্তের এই বারটায়, প্রত্যেক শনিবার সন্ধ্যায়, ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, ভূমিকম্প হোক, দাঙ্গা বা গোলমাল যাই হোক জয়দেব আর মহিমাময় দুজনেই চেষ্টা করে আসতে, বহুদিনের অভ্যেস। অবশ্য মহিমাময় কখনও কখনও জয়দেবকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলে, নানা কারণে, তখন যোগাযোগটা বাদ পড়ে।
