পাড়া-প্রতিবেশী, শুভানুধ্যায়ী, আত্মীস্বজন মহিমাময়কে ফুলকো লুচির মতো ফুলে যেতে দেখে নানা রকম ভয় দেখায়। শুভানুধ্যায়ীরা বলে, সাবধান, এ বয়েসে এত মোটা হওয়া উচিত নয়। ব্লাডপ্রেসার বাড়ে, ডায়াবেটিস হয়, হার্টের ওপর চাপ পড়ে। সেরিব্রাল বা করোনারি হতে পারে, পক্ষাঘাত এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
এসব শুনে মহিমাময় খুবই ভয় পায়। তবে সে রসিক ব্যক্তি, ওই করোনারি অ্যাটাক কথাটা শুনে তার অনেকদিন আগের একটা কথা মনে পড়ে যায়। শিবরাম চক্রবর্তীর বিখ্যাত ও জনপ্রিয়। অল্পবিস্তরের কলমে এক শোকাহত ভাগিনেয় তার মামার মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিল, লিখেছিল যে তার মামা কিছুদিন আগে করোনারিতে মারা গিয়েছে। শিবরাম তার স্বভাবসিদ্ধ অতুলনীয় কৌতুকী ভঙ্গিতে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, কী আর বলব ভাই, সকলের মামাই এরকম ভাবেই মারা যায়– করোনারি রোগে অথবা পরনারী রোগে।
সে যা হোক, ব্যাপারটা হাসি-ঠাট্টা বা রঙ্গ-রসিকতার পর্যায়ে আর নেই। কুড়ি কেজি ওজন বেড়ে যাওয়া সামান্য ব্যাপার নয়। মহিমাময় মাঝে মাঝেই নিজের মনে দুশ্চিন্তা করে।
অসুবিধাও নানা রকম দেখা দিয়েছে। সব সময়ে কেমন হাঁসাস লাগে। দমবন্ধ ভাব। একটু হাঁটলেই দাঁড়িয়ে পড়তে হয়, জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ে, ঘাম হয়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে তো কথাই নেই, দু-চার ধাপ উঠেই মহিমাময় হাঁপাতে থাকে।
এ ছাড়া আরও অনেক ধরনের অসুবিধা দেখা দিয়েছে। পুরনো প্যান্ট-শার্টগুলো আর ফিট করে। দামি, দামি প্যান্ট ছিল মহিমাময়ের। বছর চারেক আগে কাঠমাণ্ড বেড়াতে গিয়ে বেশ কয়েকটা ভাল বিলিতি কাপড়ের প্যান্ট বানিয়েছিল মহিমাময় আর সেই সঙ্গে দু-জোড়া সাফারি স্যুট।
মহিমাময়ের প্রাণের বন্ধু জয়দেব অবশ্য সাফারি স্যুটের ঘোরতর শত্রু। একদিন জয়দেবের সঙ্গে সন্ধ্যাবেলা একটা বারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল মহিমাময়ের। বেশ কিছুদিন আগের কথা, তখনও মহিমাময় এত গোলাকার ধারণ করেনি। সেই নেপালি সাফারি স্যুটে বিভূষিত হয়ে মহিমাময় বারে পৌঁছানোর পরে তাকে দেখে জয়দেবের কী ক্রোধ, কী রাগারাগি, কী গঞ্জনা!
মহিমাময় বারে ঢুকে যেই জয়দেবের টেবিলে বসতে যাচ্ছেন, জয়দেব তাকে বলল, তুই কি কোনও কোম্পানিতে ড্রাইভারের চাকরি নিয়েছিস, নাকি দারোয়ানের?
মহিমাময় অবাক হয়ে বলল, মানে?
জয়দেব বলল, তা না হলে এই দারোয়ানের ইউনিফর্ম কোথায় পেলি?
কথাটা মহিমাময়ের মনে ধরেছিল। সত্যিই বুঝি সাফারি স্যুটের মধ্যে কোথায় একটা অন্ত্যজ অনভিজাত ব্যাপার আছে, কেমন যেন দারোয়ানি দারোয়ানি গন্ধ।
সেদিন অবশ্য গোলমালটা সঙ্গে সঙ্গে চুকে গিয়েছিল। এবং গভীর, গভীরতর রাতে প্রচুর, প্রচুরতর মদ্যপানের পর ফুটপাথ বদল হওয়ার আগের মুহূর্তে জামা বদল করেছিল জয়দেব আর মহিমাময়।
মহিমাময়ের বহু আহ্লাদের সাফারি স্যুটের ঊর্ধ্বাংশ এবং জয়দেবের অতিপ্রিয় নীল স্পোর্টস গেঞ্জি, যার বুকে ও পিঠে অকথ্য ইঙ্গিতপূর্ণ একটি ইয়াংকি স্লোগান লেখা আছে, বিনিময় হয়েছিল সেই মধ্যরাতে।
ফলে একটা সাফারি স্যুট সেদিনই খণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়টাও আর বিশেষ পরেনি মহিমাময়। পরার সুযোগও ছিল না।
শুধু সাফারি স্যুট কেন, প্রত্যেকটি প্যান্ট-শার্ট, গেঞ্জি ইত্যাদি পুরনো কিছুই আর মহিমাময় এখন তার শরীরে চড়াতে পারে না। প্যান্টগুলো, বিশেষ মায়াবশত, কোনও রকমে বেল্ট বেঁধে বোম লাগিয়ে পরা যেত কিন্তু এখন তাও সম্ভব নয়। আর শার্ট? পুরনো শার্টগুলোর বুকের বোতাম লাগানো দূরের কথা, তার মধ্যে হাত গলানো পর্যন্ত অসম্ভব এখন।
তাই ধুতি আর ঢোলা পাঞ্জাবি পরা শুরু করেছে মহিমাময়। যতটা মোটা হোক, ধুতি ছোট হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। লম্বা হলে হয়তো ঝুলের ধুতি লাগে, কিন্তু পাশে বেড়ে গেলে সে সমস্যা নেই, কোঁচার কাপড় কিছু কম পড়তে পারে, তা পড়ুক, তাতে কিছু আসে যায় না। আর চওড়া হাতা ঢোলা পাঞ্জাবিও সর্বংসহা। তার ভিতরে দু-চার-দশ কেজি মেদবৃদ্ধি অনায়াসেই চাপা দেয়া যায়।
কিন্তু সে তো সাময়িক ব্যাপার। বাসায় সব সময় তো ঢোলা পাঞ্জাবি পরে থাকা যায় না। বাসায় খালিগায়ে হলে নিজের স্ফীতোদরের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় মহিমাময়ের। স্নান সেরে উঠে দেয়াল-আয়নার সামনে খালিগায়ে দাঁড়িয়ে নিজের মেদ ও চর্বি প্লাবিত বৃষস্কন্ধের দিকে দৃষ্টিপাত করে মহিমাময় শিউরে ওঠে।
এর কি কোনও প্রতিকার নেই? ডাক্তার সমেত যাকেই জিজ্ঞাসা করা হয়, সে ভোজন কমাতে বলে। মহিমাময়ের নিয়মিত গোপন মদ্যপানের সংবাদ অনেকেই রাখে না। যে দুয়েকজন রাখে, তারা বলে, পান-ভোজন কমাও। কিন্তু ভোজন একটু আধটু কমাতে পারলেও মহিমাময় পান কমাতে পারছে না। পানীয়ের চেয়েও বিপজ্জনক পানীয়ের সঙ্গে চাট। মহিমাময় আগে লুচি খেত। অন্তত আট-দশটা ছুটির দিনের সকালবেলায় জলখাবার, সেই সঙ্গে আলুর দম বা পরিমাণমতো আলুপেঁয়াজ ভাজা। আর দুটো মিষ্টি। স্কুল ব্যক্তির পক্ষে এসব নাকি বিষ। এরকম নিয়মিত খেলে মাসে এক কেজি ওজন বেড়ে যাবে।
এসব জানার পর থেকে মহিমাময় ছুটির দিনে সকালে জলখাবার খায় স্রেফ তিনখানি রুটি আর একটু ডাল কিংবা বেগুনভাজা।
