সুকুমারী কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, পালদত্ত হওয়ার আগে অর্থাৎ বিয়ের আগে তিনি যথাসাধ্য মজার বই নামাঙ্কিত খাতা নিজের বুদ্ধি এবং প্রতিভা অনুযায়ী যতটা পেরেছেন, ভরিয়েছেন। দত্তবাড়িতে বিয়ে হবে নিশ্চিত জেনে তিনি দুই দত্তকুলোঙব কবি মধুসূদন এবং সুধীন্দ্রনাথের মিলিত অনুকরণে কাব্যচর্চা শুরু করেন। মজার বইয়ের প্রথম দিকেই তাঁর সেই প্রচেষ্টার ফসল রয়েছে :
… অজয়ের স্পর্ধা দেখি, চক্ষু রক্তলাল, ফিরাও চপ্পল তব, গর্জিল উৎপল কিন্তু হায় ইতিমধ্যে উড়ন্ত চপ্পল গোপালে খোঁতা মুখ করি দিল লাল ॥…
সুকুমারী এই প্রসঙ্গে, বিশেষত অজয় এবং উৎপলের পরস্পরের প্রতি আক্রোশ বিষয়ে কিঞ্চিৎ পর্যালোচনা করেছিলেন। সুকুমারীর এখনও মনে আছে অজয় এবং উৎপল উভয়েই একদা তাঁর প্রাণের বন্ধু ছিলেন, একদা তাঁকে নিয়েই চটি-চপ্পল ছোঁড়াছুড়ি হয়েছিল এই দুজনের মধ্যে, কিন্তু অজয় হেরে গিয়েছিল, তার হালকা হাওয়াই চটি নিয়ে সে যুঝে উঠতে পারেনি উৎপলের পায়ের ভারী কোলাপুরি চপ্পলের সঙ্গে।
সুকুমারী ঠিকমতো রচনা করলে চপ্পল সংহিতা কাব্য অনায়াসেই মজার বইয়ের প্রথম অধ্যায় হতে পারত, কিন্তু কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?
সুকুমারীর বিয়ে হয়ে গেল, চমৎকার লম্বা-চওড়া, সরকারি চাকুরে মণিলাল দত্তের সঙ্গে। শুধু সরকারি চাকুরে নয়, সুকুমারীর বর মণিলাল পুলিশের চাকরি করেন।
বিয়ের অব্যবহিত পরে অন্য দশটি দম্পতির মতো সুকুমারী পালদত্ত মধুচন্দ্রিমা যাপনের সুযোগ পাননি। বিয়ের অষ্টমঙ্গলার পরে বরের সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে বীরভূম জেলার রামপুরহাটে যেতে হয়।
রামপুরহাট প্রথমে সুকুমারীর ভাল লেগেছিল, তা ছাড়া নববিবাহের মোহ, মণিলাল দত্তের আকর্ষণ। এখানেই মজার খাতার অনেকগুলি পৃষ্ঠা তিনি ভরিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু রামপুরহাটে বেশিদিন থাকা হয়নি। তার অন্যতম কারণ তাঁর ওই খাতায় লেখা আছে:
রামপুরহাটের দিনলিপি
এখানকার মশা হিংস্র ও ধূর্ত, কুকুরের মতো।
গতকাল সন্ধ্যাবেলায় একটি বলবান, হৃষ্টপুষ্ট পুং (পুরুষ) মশা আমাকে কামড়াইতে আসে। আমি বারান্দায় বসিয়াছিলাম। বারান্দা হইতে নামিয়া উঠান পার হইয়া রাস্তায় নামিলাম, মোড় পর্যন্ত চলিয়া গেলাম। কুকুরের মতো মশাটি আমার পিছু পিছু ধাওয়া করিল।
যদি কেহ জানিতে চান ইহা যে পুং মশা তাহা কীভাবে বুঝিলাম, ইহা সোজা ব্যাপার, স্ত্রী মশা রক্তপানের পূর্বে গুনগুন করিয়া গান করে, পুরুষ মশারা করে না। এখানকার মুড়ি-গুড় যতই সুস্বাদু হউক মশার অত্যাচারে এই স্থান শীঘ্রই ছাড়িতে হইবে।
০৩.
কিছুদিন পরে মণিলাল দত্ত রামপুরহাট থেকে কোচবিহারের দিনহাটায় বদলি হলেন। ইতিমধ্যে সুকুমারী রীতিমতো সংসারী হয়ে পড়েছেন, তাঁর কোল আলো করে একটি পুত্রসন্তান এসেছে।
মজার বইয়ের কথা আজকাল সুকুমারীর মনে থাকে না। বইয়ের তাকের একপাশে সে খাতা অনাদরে পড়ে থাকে।
বলা বাহুল্য, তাঁর স্বামী পুলিশ সাহেব মণিলাল দত্ত সুকুমারীর এই সাহিত্যচর্চার কথা জানেন এবং সম্প্রতি লক্ষ করেছেন যে তাঁর স্ত্রীর মজার বইয়ের বিষয়ে আসক্তি প্রায় বিলীয়মান।
তিনিই সুকুমারীকে উদ্বুদ্ধ করলেন আবার মজার লেখা লিখতে।
নিতান্ত বশংবদ স্বামীর অনুরোধ রক্ষা করার জন্যে বহুদিন পরে ধুলো ঝেড়ে খাতা খুলে সুকুমারী দেবী প্রথমে নিজের শিশুসন্তানকে নিয়ে লিখলেন, আমার খোকা বোকাসোকা। খোকার মা মোটাসোটা..
এইটুকু লেখার পর সুকুমারীর খেয়াল হল আমি হলাম খোকার মা, কিন্তু আমি তো মোটাসোটা নই।
এমন করে ভাবলে তো লেখা চলে না, লিখতে হয় চোখকান বুজে, অগ্র-পশ্চাৎ, ডাম-বাম বিবেচনা করে। সব কিছু মেলাতে গেলে বিপদ।
এসব অবশ্য মণিলাল দত্তের কথা, তিনি সুকুমারীকে বলেছিলেন, থানায় ডায়েরি করার সময়ে ছাড়া মানুষ কখনও কিছু ভেবেচিন্তে লেখে না।
না ভেবেচিন্তে কী লিখব আবার? সুকুমারীর প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ সাহেব বলেছিলেন, যা দেখবে, তাই নিয়ে লিখবে। এ নিয়ে ভাবনা করলে লেখা কঠিন হবে।
স্বামীর সুপরামর্শ শুনে সুকুমারী অনেকরকম ভাবলেন, চারদিকে চোখ খুলে তাকালেন, তারপর যেখানে যে জায়গায় যা কিছু আছে ভাল করে দেখতে লাগলেন। এই সময় তাঁর চোখে পড়ল, তাঁদের কোয়ার্টারের পাশে মহকুমা সদর থানার সাইনবোর্ড
দিনহাটা থানা
মহকুমা–দিনহাটা
জেলা–কোচবিহার।
মুহূর্তের মধ্যে সুকুমারীর মাথায় খেলে গেল, দিনহাটা নিয়ে একটা পদ্য লিখতে হবে।
এবং অল্প একটু চেষ্টা করেই তিনি লিখে ফেললেন–
…দিনে হাঁটা দিন হাটা।
জমি চাই এক কাঠা ॥
রাতে হাঁটা রাত হাটা ॥
ডাকাতের গলা কাটা ॥
ভোরে হাঁটা ভোর হাটা।
টনটন করে পা-টা ৷ …
দুঃখের বিষয়, এই শেষ পঙক্তিতে সুকুমারী দেবীর ব্যক্তিগত সমস্যা কিঞ্চিৎ প্রাধান্য পেয়েছিল। তিনি সম্প্রতি মুটিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই মণিলালবাবুর পরামর্শমতো প্রতিদিন ভোরে বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে হাটছিলেন।
কিন্তু এই ভোরে হাঁটা তথা ভোর হাটা পাঠ করে দত্তসাহেব তাঁকে বলেন, ঠিক আছে, যথেষ্ট হয়েছে। এবার তুমি কল্পনার জগতে যাও।
এবারেও স্বামীর নির্দেশ অমান্য করেননি সুকুমারী, দু-চারদিন ভেবেচিন্তে লিখলেন দীর্ঘ পঁচিশ পৃষ্ঠা, যার মধ্যে রয়েছে
