প্রতিটি প্রশ্নোত্তর বাবদ তিন টাকা, দৈনিক কয়েক ঘণ্টায় দশ-পনেরো টাকা উপার্জন, মাসে তিন-চারশো টাকা, সে সময় সে টাকার অনেক দাম।
এই কাজ করতে করতে একদিন সুকুমারী ঘোর বিপদে পড়লেন। অচেনা পাড়ায় একটা পুরনো বাড়িতে পাগলের পাল্লায় পড়লেন।
কলিংবেল দিতে গৃহকর্তা স্বয়ং দরজা খুলে দিয়েছেন। তাঁর এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে সেদিনের প্রায় সবগুলো দৈনিক পত্রিকা। ভদ্রলোকের রক্তচক্ষু, তিনি দরজা খুলেই সুকুমারী দেবীকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী বেচতে এসেছ? ইঁদুর মারা ওষুধ? এই ধেড়ে ইঁদুরকে কোনও ওষুধ দিয়ে মারতে পারবে না।
সুকুমারী বললেন, না স্যার, ওষুধ-টষুধ নয়, আমি জানতে এসেছি আপনি কী কী খবরের কাগজ পড়েন, কেন পড়েন?
কী কী কাগজ পড়ি? কেন পড়ি? এই বলে সেই ভদ্রলোক বললেন, কোনও কাগজ পড়ি না। কাগজের নিকুচি করেছে। প্রত্যেকটা কাগজ সকালবেলা পাওয়ামাত্র কাঁচি দিয়ে কুচিকুচি করে কাটি,বলে হাতের কাগজগুলো কুচিকুচি করতে লাগলেন। এই সময় বাড়ির মধ্য থেকে অন্য এক ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন, গৃহকর্তার চেয়ে কিঞ্চিৎ লম্বা, কিন্তু দেখেই বোঝা যায় বয়েস কিছুটা কম। বোধহয় ছোটভাই।
এই দ্বিতীয় ব্যক্তি একটু একরোখা প্রকৃতির, এসেই গৃহকর্তাকে বললেন, দাদা, তুমি একাই সবগুলো কাগজ কুচিকুচি করলে, একবারও ভাবলে না যে কাঁচিটা আমিই তোমাকে দিয়েছিলাম। অত্যন্ত রাগত অবস্থায় এই কথা বলতে বলতে দ্বিতীয় ব্যক্তি সুকুমারী দেবীকে দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে দাদাকে জিজ্ঞাসা করে, দাদা, এই মহিলা কে? এর সঙ্গে কী নটঘট করছ? গৃহকর্তা বললেন, নটঘট নয়, জানতে এসেছে আমরা কী খবরের কাগজ পড়ি, কেন পড়ি?
এই কথা শুনে দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে দাদার হাত থেকে কাঁচিটা একটানে ছিনিয়ে নিয়ে সুকুমারীকে তাড়া করে আসেন, আমরা খবরের কাগজ পড়ি না, খবরের কাগজ কুচোই। আয়, আজ তোকে কুচোই। দ্বিতীয় উন্মাদ কুচোনোর সুযোগ পাওয়ার আগেই সুকুমারী দৌড়ে পালিয়ে প্রাণরক্ষা করেন।
.
সেদিন বিকেলেই সুকুমারী তাঁর নিয়োগকর্তার সঙ্গে দেখা করে চাকরি ছেড়ে দিলেন। অবশ্য সমীক্ষা তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, দু-চার দিন পরেই কাজ শেষ হয়ে যেত।
কিন্তু এই কাঁচি নিয়ে তাড়া করে আসার ঘটনাটা তাঁর মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। তিনি অনেকরকম চিন্তাভাবনা করে খুব ভাল করে মুসাবিদা করে একটা বড় দৈনিক কাগজের দপ্তরে সম্পাদক সমীপেষু চিঠিপত্রের স্তম্ভে প্রকাশের জন্যে একটি দীর্ঘ পত্র প্রেরণ করলেন। এই পত্রে তিনি তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করে প্রশ্ন তুলেছিলেন,
পাগলদের কি খবরের কাগজ পড়া উচিত?
পাগলদের কি খবরের কাগজ পড়তে দেওয়া উচিত?
দুঃখের বিষয় আর দশটি চিঠির মতোই এ চিঠিও ছাপা হয়নি। মাস দুয়েক অপেক্ষা করার পর তিনি ওই খবরের কাগজের অফিসের চিঠিপত্র দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করেন। বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান তিরিশ-পেরোনো এক অনতি যুবক ভদ্রলোক চিঠিপত্র দেখেন। সমস্যা এই যে ভদ্রলোকের মাথায় তখন সদ্য টাক পড়া শুরু হয়েছে। ভদ্রলোকের পাঞ্জাবির পকেটে একটা ছোট গোল আয়না, প্রতিনিয়ত সেই ভদ্রলোক পকেট থেকে আয়নাটি বের করে তাঁর টাকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং হতাশভাবে ধুৎ বলেন।
এইরকম গোটা পঞ্চাশেক ধুৎ বলার ফাঁকে ফাঁকে সেই টাকোদ্বিগ্ন (টাক+উদ্বিগ্ন) সাংবাদিক সুকুমারীর বক্তব্য শুনে নিয়ে বললেন, দেখুন, আপনার চিঠি হয়তো আমরা ছাপব না, বা ছাপতে পারব না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি আপনাকে বলতে পারি, আপনি এই চিঠিতে যেরকম মৌলিক চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন, সেটা খুব সাধারণ ব্যাপার নয়।
সুকুমারী বললেন, তা হলে?
সাংবাদিক বললেন, তা হলে আবার কী? একটা বাঁধানো মোটা খাতায় এইরকম যা যা, যেমন যেমন মাথায় থাকে লিখে যান। অনেকটা লেখা হয়ে গেলে বই করবেন।
যেতে যেতে সুকুমারী জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম দেব বইয়ের, চিন্তা-ভাবনা?
দুঁদে সাংবাদিক বললেন, সর্বনাশ! ওরকম নামে কোনও বই এক কপিও বিক্রি হবে না। হালকা নাম ভাবুন।
.
সাংবাদিক ভদ্রলোকের কাছে আশকারা পেয়ে সুকুমারী বাড়ি ফেরার পথেই চার দিস্তে কাগজ কিনলেন, ভাঁজ করে মাঝবরাবর সেলাই করে চমৎকার একটা লম্বা খাতা হল, বেশ মোটা।
খাতার ওপরে বাঁশ কাগজের মলাট লাগিয়ে লাল ডট পেনসিল দিয়ে সেখানে বড় করে লিখলেন-সুকুমারী পাল প্রণীত মজার বই (?) তৃতীয় পঙক্তিতে মজার বই নামের পর একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন, যার মানে হল এই নামকরণ চূড়ান্ত নয়, পরিবর্তিত হতে পারে।
এরপর বহু বহু বছর চলে গেছে, মজার বই নামটা সহজে পালটানো যায়নি, অবশ্য ইতিমধ্যে মজার বই নামে অন্যদের অন্তত পাঁচ-সাতটা বই বাজারে বেরিয়ে গেছে। আসলে যেটা পরিবর্তিত হয়েছে, সেটা বইয়ের লেখিকার নাম। কুড়ি বছর হল সুকুমারী পাল বিয়ে করে সুকুমারী দত্ত হয়েছেন। অবশ্য তিনি শুধু দত্ত লেখেন না, আধুনিক কায়দায় লেখেন সুকুমারী পালদত্ত। বাপের বাড়ির আর শ্বশুর বাড়ির পদবি মিলিয়ে।
মজার বই নামের খাতার মলাটে তিনি নতুন পদবি সংযোগ করে সুকুমারী পালদত্ত হয়ে গেলেন। যদিও বিয়ের পর অনিবার্য কারণে লেখা কমে গেল।
