… লোহিত সাগরের তীরের সেই গ্রামের ঘাটে তখন উত্থানশক্তিরহিত রোহিত মাছটি খাবি খাইতেছিল।
খাবি খাইবার জিনিস কিনা? খাইতে কীরকম? খাবি একবার খাইলে আরেকবার খাওয়া যায় নাকি?
জানি এসব প্রশ্ন একদিন উঠিবে। তাই সদাপ্রস্তুত হইয়া আছি। পরশুরামের ভাষায় বলিতে পারি।
দস্তুর মতো প্রস্তুত আমি।…
এর পরেও পনেরো বছর কেটে গেছে। সময়ে-অসময়ে সংসার করতে করতে সুকুমারী প্রাণে যা চায় উলটোপালটা লিখে গেছেন। বলা বাহুল্য, পুলিশ সাহেব তাঁকে সুপরামর্শ দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন, অবশেষে তিনিই যত দেখি, যত জানি, যত ভাবি এই নতুন নামকরণ করে বই ছাপিয়ে দিয়েছেন।
এই বইটির পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে গেলে বইটির প্রতি অন্যায় করা হবে। শুধু একটি কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে।
এই বইটির প্রথম অধ্যায় যত দেখি অংশটি সুকুমারী দেবীর রচনা নয়। আসলে এ অংশ পুলিশ সাহেব মণিলাল দত্তের রচনা। ভদ্রলোক নিজের নাম কোথাও দেননি, স্ত্রীর লেখা জনপ্রিয় করার জন্যে প্রথম দিকের অংশটুকু লিখে দিয়েছেন। তাই মজার বই পাণ্ডুলিপিতে এই লেখাগুলি নেই।
প্রথম অংশের কয়েকটি লেখা এইরকম, নোট জাল করিবার সহজ উপায় অথবা নিজের টাকা নিজে ছাপুন কিংবা পকেটমার বন্ধুদের জন্যে কিছু সাবধানী বাণী অথবা মিথ্যা সাক্ষ্য কীভাবে দিতে হয়।
উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। মণিলাল এবং সুকুমারীর একেবারে মণিকাঞ্চন যোগ হয়েছে।
যত জানি, যত দেখি, যত ভাবি গ্রন্থের চাহিদা এত বেড়ে গেছে যে প্রকাশকদের আগ্রহাতিশয্যে সুকুমারী একটি নতুন বইয়ে হাত দিয়েছেন। দ্বিতীয় বইয়ের নাম মণিকাঞ্চন।
একদা প্রভাতকালে
০১.
শীতের হালকা আমেজ। বাতাসে একটু শিরশিরানি। পৌষ মাসের এই সময়টা কলকাতায় ভারি মধুর। গত বছর এ সময় হাড়কাঁপানো, রক্ত-হিম করা ঠান্ডায় দেশে ছিলাম, সেই জন্যেই বোধ হয়। কিংবা বয়েস বেড়ে যাচ্ছে, আর কতগুলো শীত-বসন্ত এ জীবনে আসবে জানি না, তাই শীতঋতু এবার খুব উপভোগ করছি। সুযোগ পেলেই বাড়ির সামনের চাতালে কিংবা পাশের পার্কে গিয়ে সকালবেলায় রোদে দাঁড়াই।
আমাদের দোতলার শোয়ার ঘরের চিলতে বারান্দাটায় খুব সকালে একটু রোদ আসে। সাড়ে সাতটা বাজার আগেই রোদটা সরে যায়। প্রায় সময়ই তাই সুযোগ হয় না বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ানোর, বাজারে ছুটতে হয়।
আজ খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙেছে। সাতটা এখনও বাজেনি। চোখ মেলে দেখি শিয়রের দিকের জানলা দিয়ে আবছায়া রোদ আমার লেপের ওপরে এসে পড়েছে। অর্ধাঙ্গিনী বিছানার পাশে নেই, নীচতলায় চায়ের বাসনের টুংটাং শব্দে তার সরব উপস্থিতি টের পাচ্ছি।
অন্যদিন আধ-ঘুমে, আধা-জাগরণে এ সময়টায় লেপমুড়ি দিয়ে পড়ে থাকি। বিছানায় হস্তবাহিত এক পেয়ালা ধূমায়িত চা এসে পৌঁছায়, তারপর শয্যাত্যাগ করি।
আজ কী যে মতিভ্রম হল!
লেপটা শরীরের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলাম। যাই, সরকারি চাতালে কিংবা পার্কে নয়, নিজের বাড়ির বারান্দার ক্ষণিক রোদে একটু দাঁড়াই। কিন্তু বারান্দায় পৌঁছতে গেলে বারান্দার দিকের দরজাটা খুলতে হবে। এবং সেটা একটা সমস্যা।
আমাদের এই নতুন বাড়ির কয়েকটা দরজা, বিশেষ করে এই দোতলা ঘরের সামনের দিকের দরজাটা একটু গোলমেলে।
গোলমালের ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি।
স্কুলপাঠ্য বিজ্ঞান বইতে পদার্থবিদ্যার অধ্যায়ে তাপ বিষয়ে বলা আছে।
তাপে পদার্থ প্রসারিত হয়, বেড়ে যায়। আর শৈত্যে পদার্থ সংকুচিত হয়, ছোট হয়ে যায়।
একদা এক বিদ্যালয়ের বালিকাকে পদার্থ বিজ্ঞানের তাপের এই প্রসার এবং সংকোচনের বিষয়ে একটি উদাহরণ দিতে বলা হয়েছিল।
সে বলেছিল, দিন।
বিস্মিত দিদিমণি জিজ্ঞাসা করেন, দিন? দিন কেন?
মেয়েটি বলেছিল, গরমের দিনে দিন বড় হয়, আর শীতে দিন ছোট হয়ে যায়।
আমাদের ঘরের সামনের এই দরজাটা উক্ত বালিকার দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধির উদাহরণের মতোই গ্রীষ্মে বিশেষ করে বর্ষায় ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন আর চৌকাঠের মধ্যে গলে না। ছিটকিনি লাগানো সম্ভব হয় না। দুটো কড়া লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখি।
আবার শীতে সংকুচিত হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে চৌকাঠে গলিয়ে যায়। অবশেষে শুকোতে শুকোতে এমন হয় যে দরজা আর চৌকাঠের মধ্যে প্রায় এক-দেড় ইঞ্চি ফাঁক দেখা দেয়। হয়তো কাঠটা কাঁচা ছিল, তাই।
অবশ্য সারা বছরে দিন পনেরো কমাবাড়ার মধ্যবর্তী সময়ে দরজাটা মোটামুটি ফিট করে। বছরের এই সময়টায় সেটা সম্ভব হয়।
এ বছর কাল রাতেই প্রথম দরজাটা চৌকাঠের মধ্যে প্রবেশ করেছে, অবশ্য তার জন্যে কাল রাতে শোয়ার আগে আমাকে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হয়েছিল।
বারান্দায় রোদে দাঁড়াব বলে আজ সকালে দরজাটা খুলতে গিয়ে দেখি বন্ধ করতে যতটা কষ্ট হয়েছিল, দরজাটা খোলা তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টসাধ্য।
অনেকদিন আগে আমি একটা কবিতায় লিখেছিলাম, অথচ বাসনা ছিল, শীতের রৌদ্রের মতো জনপ্রিয় হব। সেই আমি রৌদ্রস্নাত হওয়ার জন্যে আজ মরিয়া। তালা লাগানোর কড়া ধরে ভেতরদিক থেকে প্রাণপণ টান দিলাম।
ঠিক সেই সময়ে আমাদের কাজের মেয়েটি একতলা থেকে চায়ের পেয়ালা নিয়ে আমার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। হঠাৎ সজোরে আকর্ষিত দরজা দড়াম শব্দ করে বিদ্যুৎগতিতে খুলে গেল। আমি ঘরের মধ্যে ছিটকিয়ে গিয়ে পড়লাম কাজের মেয়েটির গায়ে। গরম চায়ের পেয়ালাসহ সে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল, ঝনঝন করে পেয়ালা পিরিচ ভাঙল, গরম চায়ে ফোঁসকা পড়ে গেল মেয়েটির হাতে। সে ওরে বাবারে মেরে ফেলল রে বলে আর্তনাদ করতে লাগল। আমার স্ত্রী একতলা থেকে ছুটে এসে আমার দিকে অতিশয় সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। একটু পরে কাজের মেয়েটিকে নিয়ে তিনি পাড়ায় ডাক্তারবাবুর কাছে চলে গেলেন।
