বেদিটার ওপর বসতে গিয়ে দেখি একপাশে একটা লোক আগাগোড়া র্যাপার মুড়ি দিয়ে বসে রয়েছে। সে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সদর গেটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। লোকটার বসার ভঙ্গি, ঘাড় বাঁকানোর ভঙ্গি কেমন যেন খুব চেনা চেনা মনে হল।
বুঝলাম লোকটাও আমাকে চিনতে পেরেছে। হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে বসে বলল, কীরে, সন্ধ্যাবেলা ময়দানে কী করছিস?
গলার স্বর শুনে স্পষ্টই চিনতে পারলাম। আমার পুরনো বন্ধু সিদ্ধেশ্বর। সে আমাকে যে প্রশ্ন করেছে সেই একই প্রশ্ন আমিও তাকে করতে পারতাম, তা না করে র্যাপার-আবৃত অবয়বের দিকে তাকিয়ে বললাম, খুব শীত পড়েছে।
সিদ্ধেশ্বর উঠে দাঁড়াল, তারপর বলল, যা, ইয়ার্কি করিস না। জানিস না ঠান্ডায় আমি কষ্ট পাই। আর এই নতুন ঠান্ডাতেই সবচেয়ে বেশি বেকায়দা হয়।
আমি বললাম, তা হলে ঠান্ডায় ময়দানে বসে আছিস কেন? সিদ্ধেশ্বর জবাব দিল, উপায় নেই। পেটের দায়ে এই কাজ করতে হচ্ছে। র্যাপারটা সেজন্যেও দরকার।
পেটের দায়ে ময়দানে গাছের নীচে চাদরমুড়ি দিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে শুনে আমি একটু চিন্তিত হলাম। এ আবার কী ধরনের পেটের দায়? সিদ্ধেশ্বর কি গোয়েন্দাগিরি কিংবা স্পাইং শুরু করেছে। নাকি? কাউকে অনুসরণ করছে, কারও দিকে নজর রাখছে? সিদ্ধেশ্বরের পেটের দায়ের আগের ধান্দাগুলো কিছু কিছু জানি। সেজন্যে আরও চিন্তায় পড়লাম।
এবারে সে কুকুরের বাচ্চার ব্যবসা করেছিল। এমন যে আমি ওর এত পুরনো বন্ধু আমার কাছেও ও একটা বাচ্চা বিক্রি করেছিল। আমাদের বাড়িতে এখন যে বুড়ো পাজি কুকুরটা রয়েছে, যেটাকে স্নান করাতে গিয়ে আজই গলদঘর্ম হয়েছি, সেটাই সিদ্ধেশ্বর আমাকে গছিয়ে দিয়েছিল।
কুকুর বেচে লাভ করার একটা সহজ এবং চমৎকার পন্থা আবিষ্কার করেছিল সিদ্ধেশ্বর। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, ফোর্টের সামনে গঙ্গার ধারে শীতের মরশুমে বেদেরা আসে পাহাড়ি কুকুর নিয়ে। সেই সব কুকুরের ছানা তারা যার কাছে যেরকম পারে সেইরকম দামে বিক্রি করে।
সিদ্ধেশ্বর করেছিল কী, সেখান থেকে সস্তায় কুকুরছানা নিয়ে এসে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে উচ্চবংশের কুকুর বলে চড়া দামে বেচত।
শেষরক্ষা করতে পারেনি। কারণ তার লোভ বেড়ে যায়। রাস্তা থেকে নেড়ি কুকুরের ছানা কুড়িয়ে বা চুরি করে এনে বেশি দামে বেচতে থাকে। খুব ছোট কুকুরছানার জাতগোত্র বিচার করা। কঠিন। সব ছানারই কান ঝোলা, ঝকমকে লোম। এক পুলিশ সাহেবের মেয়ের বয়ফ্রেন্ডের কাছে। এরকম একটা কুকুরছানা বিক্রি করে গুরুতর বিপদে পড়েছিল সিদ্ধেশ্বর। তারপর ও লাইন ছেড়ে দেয়।
সিদ্ধেশ্বরের পরের লাইন ছিল আরও গোলমেলে। সাব রেজিস্ট্রারের অফিসে যেসব দলিল। রেজিস্ট্রি করা হয় তার মধ্যে গোলমেলে দলিল থাকে কিছু। সেসব দলিলের সাক্ষী কেউ হতে চায় না। বেশ কিছুকাল সিদ্ধেশ্বর ওইরকম সব দলিলের পেশাদার সাক্ষী হয়ে রুজিরোজগার করেছে। তারপর বহুদিন কোথায় বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। জেলে-টেলেও গিয়ে থাকতে পারে, কিছুই আশ্চর্য নয়।
আজ আবার অনেকদিন পরে সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে ময়দানে এইখানে দেখা হয়ে গেল। তবে। আজকে সিদ্ধেশ্বরের সমস্যাটা কী সেটা ভাল বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য বেশিক্ষণ মৌন থাকার পাত্র সিদ্ধেশ্বর নয়। সে নিজে থেকেই মুখ খুলল। সহসা খেদোক্তি করল, ভিখারিরা যে এত জোচ্চোর হয় একথা কি আগে কোনওদিন বুঝতে পেরেছিলাম।
তার কথা শুনে একটু বিচলিত হলাম। ভিখারিরা জোচ্চুরি করবে তার সুযোগ কোথায়? তারা তো কিছু দেয়া-নেয়া, কেনা-বেচা করে না। তাদের সঙ্গে আমাদের শুধু প্রদানের সম্পর্ক, আদানপ্রদানের নয়। এক্ষেত্রে প্রতারণা বা জোচ্চুরির সুযোগ কোথায়?
আমার বিমূঢ় এবং চিন্তাশীল ভাব দেখে সিদ্ধেশ্বর বলল, তুই বিশ্বাস করছিস না? কী করে বিশ্বাস করবি বল? তোর তো আর নিজের অভিজ্ঞতা নেই?
এরপর একটু থেমে থেকে, একটু দম নিয়ে, একটু দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে সিদ্ধেশ্বর বলল, আমার কথা শোন। এই দেড় মাসে আমার ঢের অভিজ্ঞতা হয়েছে। জানিস আমার এখন এগারোটা ভিখারি।
দেড় মাস এবং এগারোটা ভিখারি এই দুটো জিনিস আমার মোটেই হৃদয়ঙ্গম হল না। আমি আরও হতবাক হয়ে গেলাম।
সিদ্ধেশ্বর নিজের মনে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, আমার এগারোটা ভিখারি, এগারোটাই ডিসঅনেস্ট। সবকয়টা পুরো জোচ্চোর। চাবকিয়ে সিধে করে দিলে মনে শান্তি হয়।
অসাধু ভিখারিদের শিক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধেশ্বরের খুব উত্তেজনা ও আগ্রহ দেখে আমি আরও চিন্তিত হলাম, কী জানি ব্যাপারটা কী। সিদ্ধেশ্বর বোকা নয়, কখনওই বোকা ছিল না। সে আমার বোঝবার অসুবিধেটা বোধহয় আন্দাজ করেছিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল, আয়, আমার সঙ্গে আয়। আমি কিছুটা কৌতূহলবশত এবং বাকিটা কোনও কিছু এই মুহূর্তে করার না থাকায় বিনা বাক্যব্যয়ে সিদ্ধেশ্বরকে অনুসরণ করলাম। রাস্তা পার হয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের গেটের ভেতরে ঢুকে গিয়ে পাঁচিলের ওপারে আড়াল থেকে আঙুল দিয়ে দুজন ভিখারিকে দেখিয়ে সিদ্ধেশ্বর আমাকে বলল, এ দুটো আমার ভিখারি।
আমি কিছুই না বুঝে সিদ্ধেশ্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নির্বিকার সিদ্ধেশ্বর বলে চলল, আমার আর দুটো ভিখারি আছে ওই দিকে উত্তরের গেটে আর ওপাশে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের সামনের গেটে দুজন। এই হল মোট ছজন।
