প্রভাকরবাবু: খুব ভাল।
বসন্তবাবু: তখন আর দুধের ব্যবসায় গেলাম না। চোলাই মদের ব্যবসা আরম্ভ করলাম। রমরমা কারবার শুরু হল।
প্রভাকরবাবু: ভাল।
বসন্তবাবু: একদিন পুলিশ এসে আমাকে থানায় ধরে নিয়ে গেল।
প্রভাকরবাবু: খুব খারাপ।
বসন্তবাবু: খারাপ আর কী? থানার বড়বাবুকে ব্যবসার পার্টনার করে নিলাম। ব্যবসা আরও জমে উঠল।
প্রভাকরবাবু: ভাল। খুব ভাল।
বসন্তবাবু: এবার ঠিক করলাম বিয়ে করব। খুব সুন্দরী এখানকার একটা পাত্রী দেখে বিয়ে করেই ফেললাম।
প্রভাকরবাবু: খুব ভাল।
বসন্তবাবু: কিন্তু মেয়েছেলেটা বড় দজ্জাল। বিয়ের সাত দিনের মধ্যে গালাগাল ঝগড়াঝাটি, এক মাসের মধ্যে মারধোর শুরু করল, ঝাটা দিয়ে, খুন্তি দিয়ে, চেলা কাঠ দিয়ে, এখনও শরীরে কালশিটের দাগ আছে।
প্রভাকরবাবু: খারাপ। খুব খারাপ।
বসন্তবাবু: এর মধ্যে একটা বাড়িও তৈরি করে ফেলেছিলাম। খুব সুন্দর দোতলা বাড়ি। ফুল গাছ, লন।
প্রভাকরবাবু: খুব ভাল। ব
সন্তবাবু: কিন্তু বউয়ের যন্ত্রণায় বাড়িতে টিকতে পারতাম না। বাড়িতে ঢুকতে গেলেই চেলাকাঠ ছুঁড়ে মারত, দোতলা থেকে গরমজল গায়ে ফেলার চেষ্টা করত। আর চেঁচামেচি, চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার, মোগলাই গালিগালাজ, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। এক মুহূর্ত বাড়িতে টিকতে পারছিলাম না।
প্রভাকরবাবু: খারাপ।
বসন্তবাবু: বাড়িটায় হঠাৎ একদিন আগুন লেগে গেল। আগুনে বাড়িটা সম্পূর্ণ পুড়ে গেল।
প্রভাকরবাবু: খুব খারাপ।
বসন্তবাবু: কিন্তু বাড়িটা ইনসিওর করা ছিল। দু লাখ টাকা পেয়ে গেলাম।
প্রভাকরবাবু: ভাল।
বসন্তবাবু: বাড়িটার সঙ্গে দজ্জাল বউটাও পুড়ে মরল। তার ইনসিওর থেকে আরও দেড় লাখ টাকা পেলাম।
প্রভাকরবাবু: খুব ভাল।
.
এই ভাল, খুব ভাল, খারাপ, খুব খারাপ কতক্ষণ ধরে চলত বলা কঠিন। এই সময়ে হঠাৎ আবার লোডশেডিং হল, আলো নিবল। আমরা প্রভাকরবাবুকে আর সুযোগ না দিয়ে দ্রুত উঠে পড়লাম।
এ বৃষ্টি সহজে থামবে বলে মনে হচ্ছে না। অন্ধকার রাস্তায় ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে যেতে যেতে রাস্তায় বিলাসবাবুকে বললাম, এই বৃষ্টিটা ভাল না খারাপ কিছুই জানা গেল না। পিছনেই প্রভাকরবাবু ছিলেন, অন্ধকারে টের পাইনি, তিনি বললেন, একটা হিব্রু প্রবাদে আছে। ..তাকে কথা শেষ করতে দিলেন না বিলাসবাবু, দ্রুত পা চালাতে চালাতে বললেন, খুব ভাল, না খুব খারাপ?
ভিখারি বিষয়ে
কার্তিক সবে শেষ হতে চলেছে। কলকাতায় শীত আসতে এখনও ঢের দেরি। তবে সকালে সন্ধ্যায় বাতাসে একটু হিম হিম ভাব। রাতে গায়ে একটা চাদর দিলে আরাম লাগে। ভোরবেলায় গাছের পাতা, মাঠের ঘাস শিশিরে ভিজে থাকে। সন্ধ্যার দিকে একটা নীল কুয়াশার হালকা পরদা ল্যাম্পপোস্টের নীচে নেমে আসে কোনও কোনও দিন।
মাসের দ্বিতীয় শনিবার দুপুরে খেয়ে উঠে শারদীয় সংখ্যার একটা উপন্যাসের পাতা ওলটাতে ওলটাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে মাসকাবার বাজার করেছি। তারপর বিক্রিওয়ালা ডেকে পুরনো খবরের কাগজ বিক্রি করেছি। অবশেষে স্নানের সময় পোষা কুকুরটাকে সাবান মাখিয়ে স্নান করিয়েছি। ঠান্ডা পড়ে যাচ্ছে, এর পরে আর অনেকদিন স্নান করানো যাবে না। একটা বুড়ো এবং বেয়াদপ কুকুরকে স্নান করানো খুব কষ্টসাধ্য কাজ। বাজার করা, কাগজ বেচাও খুব সোজা কাজ নয়।
ফলে যথেষ্টই শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। দু-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি এবং যখন ঘুম ভাঙল তখন রীতিমতো অন্ধকার। শেষবারের মতো দিন ফুরানোর মুখে কয়েকটা কাক ডাকাডাকি সেরে নিচ্ছে শ্রান্ত কণ্ঠে।
অবেলায় ঘুম থেকে উঠে মন খারাপ হয়ে গেল। কত কী করার ছিল, কত কী করার আছে, কিছুই হল না।
ছুটির দিনের বিকেল। বাড়ির সবাই বাইরে বেরিয়েছে। বিছানা থেকে উঠে আলো জ্বেলে মুখ ধুয়ে খাওয়ার টেবিলের ওপরে চায়ের ফ্লাস্ক থেকে পেয়ালায় চা ঢেলে খেলাম।
শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। বার বার হাই উঠছে। জামাকাপড় পরে বাইরে বেরুলাম। সদর দরজার ডুপ্লিকেট চাবির বন্দোবস্ত আছে। খালি বাড়ি বন্ধ করে যেতে কোনও অসুবিধে নেই। তা ছাড়া কুকুরটা আছে। আমরা এখনও যেখানটায় থাকি সেখান থেকে ময়দানের দক্ষিণ প্রান্ত বেশ কাছে। হাঁটতে হাঁটতে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পর্যন্ত গেলাম।
শনিবারের সন্ধ্যা বলেই গেটের কাছে খুব ভিড়, রীতিমতো মেলা জমে গেছে। বেলুনওলা, পুলিশের ভয়ে ত্রস্ত ফুচকা ও আলুকাবলিওয়ালা এবং সেই সঙ্গে এক দঙ্গল ভিখারি। ভ্রমণকারী বায়ুসেবীরা অধিকাংশই অবাঙালি, কালোয়ার বা গুজরাটি। আজকাল আবার কিছু চিনেও জুটেছে। হংকং হস্তান্তর হয়ে যাবে কয়েক বছরের মধ্যে, সেখানকার চিনেরা নাকি কলকাতার দিকে আসছে। কথাটা হয়তো সত্যি; থিয়েটার রোডে, ময়দানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে আজ বছর দুয়েক হল চিনেদের সংখ্যা কেবলই বাড়ছে। আগে এসব অঞ্চলে চিনে দর্শন অকল্পনীয় ছিল।
তা যা হোক, কালোয়ার, গুজরাটি আর চিনে এই তিন সম্প্রদায়েরই ভিক্ষে দেওয়ার দিকে ঝোঁক। হয় এদের হাতে কাঁচা পয়সা খুব বেশি অথবা অন্য কোনও পাপপুণ্যজনিত গর্হিত কারণ। আছে কিংবা দুটোই। এরা ভিখারি খুঁজে, ভিখারি ডেকে ভিক্ষা দেয়।
ভিক্টোরিয়ার প্রধান গেটের উলটো দিকে একটা অশ্বথ গাছের নীচে একটা ইট বাঁধানো বেদি আছে। ময়দানে এলে অনেক সময় এই বেদিটার ওপর বসি। জায়গাটা এমনিতে সুন্দর। সামনে বিশাল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড, তার ওপারে আলোঝলমল এসপ্ল্যানেড। ডাইনে চৌরঙ্গির উঁচু উঁচু বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে। কাঁচের জানলা দিয়ে সেই আলোর রেশ শহরকে মোহময়ী করে তুলেছে।
