সিদ্ধেশ্বর আমার দিকে গর্বিত ভাবে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল। এ অবস্থায় বেশিক্ষণ চুপ করে থাকা মানায় না। আমি আর কী বলব, গম্ভীর হয়ে বললাম, হিসেব ঠিক আছে?
সিদ্ধেশ্বরও গম্ভীর হল, বলল, ইয়ার্কি নয়। পুরো হিসেবটা এখনও হয়নি। এগারোটার মধ্যে গেল ছয়টা। আরও হাতে রইল পাঁচটা। এই পাঁচটার মধ্যে দুটোকে রেখেছি রবীন্দ্রসদনের সামনে। আরও তিনটে কালীঘাটে।
কথার পিঠে কথা জোগানোর জন্যেই আমি বললাম, কালীঘাটে?
সিদ্ধেশ্বর বলল, আরে সেটাই তো হয়েছে সমস্যা। শনিবার বিকেলে কালীঘাটে ভিক্ষের মার্কেট যেরকম, ভিক্টোরিয়ার এদিকটাতেও তাই। দুদিক সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়।
এতক্ষণে আমি অল্প অল্প বুঝতে পারছিলাম সিদ্ধেশ্বরের সমস্যাটা। তখনও সিদ্ধেশ্বর আমাকে বোঝাচ্ছে, অথচ শুক্রবারের দুপুরে কোনও ঝামেলা নেই। দুপুরবেলা বড় নামাজের সময় দুটো। ট্যাক্সি করে সবকটাকে নাখোদা মসজিদের সামনে নামিয়ে দিই। রোববারের সকালেও তাই, চারটে গির্জা আর দুটো কবরখানায় একজন করে যায়। বাকি পাঁচজনের ছুটি। প্রত্যেককে সপ্তাহে দেড় দিন ছুটি দিতে হয়।
আমি গোঁ ধরে বললাম, সপ্তাহে দেড় দিন ছুটি?
গর্জন করে উঠল সিদ্ধেশ্বর, শুধু দেড় দিন ছুটি নয়। দৈনিক দশ ঘণ্টা ডিউটি। মিনিমাম ওয়েজ আইন মেনে প্রত্যেককে আঠারো টাকা সত্তর পয়সা করে দিতে হবে। এ ছাড়া স্পেশাল মজুরি।
এতক্ষণে আমি একটা আসল প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ওদের তুই টাকা দিতে যাবি কেন? ওরা তো যে যার মতো ভিক্ষেই পাচ্ছে।
সিদ্ধেশ্বর অনেকদিন পরে আমার মাথায় একটা চাটি মেরে বলল, তোর কবে বুদ্ধি হবে? ওই ভিক্ষের পয়সাগুলো তো আমার। ওদের তো আমি মাইনে করে রেখেছি। এগারোটা লোকের দৈনিক দুশো টাকার ওপর মাইনে দিতে হয়। তার ওপরে গাড়িভাড়া, বাস হোক, ট্যাক্সি হোক।
সাতটা বাজতে খুব বেশি বাকি নেই। আর একটু পরেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাইরের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। সিদ্ধেশ্বর আমাকে প্রায় ঠেলতে ঠেলতে দক্ষিণ দিকের গেটের অভিমুখে নিয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে সিদ্ধেশ্বর আমাকে বোঝাচ্ছে, সবচেয়ে শয়তান হল ওই খোঁড়া ভিখারিগুলো। খোঁড়া কি খোঁড়া নয় কে জানে, বলে ট্যাক্সি ছাড়া চলব না।
এরপর কিছু একটা ভেবে সিদ্ধেশ্বর আমাকে বলল, তুই খোঁড়া ভিখারিদের নিয়ে কী যেন লিখেছিলি? আমার লেখা নিয়ে উৎসাহ দেখানোর লোক বিরল। সুতরাং ভিখারির প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন উঠতেই আমি সায় দিলাম। সিদ্ধেশ্বর জিজ্ঞাসা করল, কী যেন গল্পটা?
আমি গল্পটা এড়িয়ে গিয়ে বললাম, আসলে ব্যাপারটা কিছু নয়। একটা খোঁড়া ভিখারি অন্ধ সেজেছে আর অন্ধ ভিখারি গেছে সিনেমা দেখতে। কথা হল খোঁড়াও প্রকৃত খোঁড়া নয়, অন্ধও অন্ধ নয়।
আমার কথা শুনে খুব উৎসাহিত হয়ে পড়ল সিদ্ধেশ্বর, পিঠ চাপড়িয়ে বলল, তুই প্রবলেমটা ঠিক ধরেছিলি। জানিস কানা খোঁড়া এদের রেট ডেইলি পঁচিশ টাকা। কিন্তু টাকাটা দিতে হয়, কারণ রিটার্ন বেশি আসে।
আমার কিছু বলার নেই। আমি নিঃশব্দে তার কথা শুনে যেতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে সিদ্ধেশ্বর কথা বলে যাচ্ছে, জানিস, ভাল একটা মেয়েছেলে ভিখারির রেট তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকা!
আমি বললাম, তা জানি না। তবে মেয়েছেলে ভিখারির একটা গল্প জানি। মেয়েছেলে ভিখারি বিষয়ে সিদ্ধেশ্বরের খুব উৎসাহ দেখা গেল। আমি গল্পটা ছোট করে বললাম।
গৃহস্থের বাড়িতে ভিখারি ভিক্ষা চাইতে গেছে। গৃহস্থ বলছে, এখন ভিক্ষা হবে না। এখন বাড়িতে মেয়েছেলে নেই। ভিখারি বলল, কর্তা আমি তো মেয়েছেলে চাইছি না। দু পয়সা ভিক্ষা চাইছি।
এত ভাল গল্পটা শুনে কিন্তু সিদ্ধেশ্বর মোটেই খুশি হল না। ততক্ষণে দক্ষিণ দিকের গেটে পৌঁছে গেছি। হঠাৎ র্যাপারে আগাগোড়া মাথাসুদ্ধ শরীর ঢেকে সিদ্ধেশ্বর এগিয়ে গিয়ে একটু আড়াল থেকে তার নিয়োজিত ভিখারিদের পর্যবেক্ষণ করল। তারপর ফিসফিস করে আমাকে বলল, এ দুটোই একদম আলসে। একটু চেঁচাতে হবে, বাটিতে পয়সা বাজাতে হবে। নাকিসুরে কাঁদতে হবে, তবে না লোক পয়সা দেবে। দুটোকেই কাল ছাড়িয়ে দেব। একটু থেমে পরামর্শ চাওয়ার ভঙ্গিতে সিদ্ধেশ্বর আমাকে বলল, ভাবছি এবার একটা লেপার ব্যান্ড করব!
আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তবু ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞাসা করলাম, লেপার ব্যান্ড আবার কী?
লেপার ব্যান্ড জানিস না? খুবই অবাক হয়ে গেল সিদ্ধেশ্বর। ওই যে চৌরঙ্গি পাড়ায় ব্যান্ড বাজিয়ে টুপি মাথায়, পায়ে কেডস জুতো, নাক থ্যাবড়া কালো কুষ্ঠ রোগীরা নেচে পয়সা তোলে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, সেই লেপার ব্যান্ড তুই কী করে করবি?
আমার অজ্ঞতা ব্যথিত করল সিদ্ধেশ্বরকে। সে বলল, ও তো সোজা ব্যাপার। যাত্রা পার্টির মতো। আমাদের লাইনে ওর নাম হল কুষ্ঠ অপেরা।
আমি বিস্ময়োক্তি করতে বাধ্য হলাম, কুষ্ঠ অপেরা।
সিদ্ধেশ্বর বলল, কিন্তু খুব খরচ। লাভ আছে বটে তবে ওরকম একটা দল বানাতে বিশ পঁচিশ হাজার টাকা লেগে যায়। তারপরে থানা পুলিশ আছে।
আমার এবার বাড়ি ফেরার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া জ্ঞানলাভও যথেষ্ট হয়েছে। সিদ্ধেশ্বরকে বললাম, আমি এখন যাই। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তুই আর কতক্ষণ?
সিদ্ধেশ্বর বলল, আমার যেতে রাত দশটা। আজ শনিবার, অনেক মাতাল আসবে এদিকে। মাতালেরা খুব ভাল ভিক্ষে দেয়। দশ টাকা, একশো টাকার নোট পর্যন্ত দেয়। এই ভিখারিগুলো যা। চোর–চোখের আড়াল হলেই লুকিয়ে রাখবে। ইটের নীচে চাপা দেবে, গাছের ফোঁকরে গুঁজে রাখবে। ওদের শরীরের মধ্যেও অনেক লুকোনোর জায়গা। কী আর বলব, হাজার সার্চ করেও বার করা যাবে না!
