কোনও কিছুরই অভাব নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনের অন্তরঙ্গ আড্ডা জমে উঠল। কথায় কথায় পুরনো প্রসঙ্গও উঠল। বসন্ত কিছুই রাখঢাক না করে নিজের কথা সব বলতে লাগল।
এই সময় হঠাৎ আলোটা জ্বলে উঠল, বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে। সন্ধে কাবার করে রাতের দিকে এগোচ্ছে সময়। আলো জ্বলতে অনেকেই হাতঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা সমিতির দেয়ালেও একটা ওয়াল-ক্লক আছে। অভ্যাসমতো সেটার দিকে তাকিয়ে নিজের হাতঘড়ির সময় মনে মনে মিলিয়ে দেখা আমার অনেকদিনের অভ্যেস। দেখলাম দুটোতেই প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। বৃষ্টির সন্ধ্যায় এর চেয়ে বেশি দেরি না করাই ভাল। যেকোনও সময় আরও বৃষ্টি আসতে পারে।
আমি উঠতে যাব এমন সময় হেডমাস্টার পরেশবাবু প্রভাকরবাবুকে ধরলেন, আপনি যে তহবিল তছরুপের গল্প ধরেছেন মশায়, তার মধ্যে আবার মদও এনে ফেলেছেন। গোড়ায় বললেন যা ভাল তাই খারাপ, এই বৃষ্টিটা ভালও বটে, খারাপও বটে। এখন অন্য গল্প ধরলেন কেন?
পরেশবাবু আমাদের সকলের মনের কথাই বলেছেন। আমরাও এই কথাই ভাবছিলাম।
প্রভাকরবাবু পরেশবাবুর কথার জবাবে বললেন, যা ভাল তাই খারাপ। যা খারাপ তাই ভাল। সেই কথাই তো বলছি। বুঝতে পারছি বৃষ্টির জন্যে আপনাদের বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে। অল্প একটু ধৈর্য ধরুন। গল্পটা এখনই গুটিয়ে আনছি।তারপর প্রভাকরবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, আরেক কাপ চা হলে ভাল হত, তাই না?
কিন্তু চায়ের আর উপায় নেই। একটু আগে জগা এসে আগের খালি গেলাসগুলো নিয়ে চলে গেছে। তাদের দোকান এখন বন্ধ।
তবু প্রভাকরবাবুর আন্তরিকতা দেখে আরেকটু বসে গেলাম। যদি দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে গল্পটা মিটে যায়, দেখাই যাক না।
প্রভাকরবাবু বললেন, চা তো হল না। আপনারা যদি অনুমতি করেন এবার তবে গল্পটা হোক। বলেছিলাম না, যা ভাল তাই খারাপ। এবার গল্পটায় সরাসরি যাচ্ছি। বুঝতে পারবেন কথাটার মানে।
আমরা আর বাধা দিলাম না। এখন যত তাড়াতাড়ি শেষ করে ততই মঙ্গল।
প্রভাকরবাবু আমাদের মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন। জানকী আর বসন্ত সেনকে নিয়ে একটা রসালো গল্প বোধহয় তার জিভের ডগায় সুড়সুড় করছিল। প্রভাকরবাবু বললেন, জানকীর ব্যাপারটা আজ না হয় থাক। বসন্তের সেই ভাল খারাপের ব্যাপারটা বলি।
ভাল খারাপের ব্যাপারটা আমরা যত সোজা ভেবেছিলাম প্রভাকরবাবুর গল্পে কিন্তু ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেল।
আমি কারুকার্য করতে যাব না। প্রভাকরবাবুর লাইনেই গল্পটা বলি। সে লাইনটা আমার লাইনের চেয়ে খারাপ নয়।
প্রভাকরবাবু বললেন, বসন্তের সঙ্গে নানা সুখদুঃখের গল্প হল। সে বলল, তহবিল তছরুপ না করে কোনও উপায় ছিল না। কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কে যা মাইনে-টাইনে পেতুম তাতে কায়ক্লেশে খাওয়া-দাওয়া চলে যেত কিন্তু এই মদের নেশাটা ধরে বেকায়দায় পড়ে গেলুম। সামান্য চাকরির টাকায় তো আর মদের খরচা চলে না। আমি অল্প অল্প ক্যাশ ভাঙতে লাগলুম। বছর খানেকের মধ্যে টাকার অঙ্কটা প্রায় তিরিশ হাজারে পৌঁছল। তখন রেস খেলতে শুরু করলাম এই আশায় যে রেসে জিতে যদি টাকাটা তুলতে পারি। সে তো হলই না বরং আরও হাজার কুড়ি টাকা গচ্চা গেল। তখন দেখলাম আর বেশিদিন ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখা যাবে না, ধরা পড়বই, জেলে যাবই; সব রকম। ভেবেচিন্তে ক্যাশে বাকি যা হাজার পঞ্চাশেক টাকা ছিল সেটা নিয়ে কেটে পড়লাম।
প্রভাকরবাবু থামলেন। গল্পটা শেষমেশ মোটেই জমল না। আমরা উঠতে যাচ্ছিলাম। এই এক মামুলি টাকা চুরির গল্পের জন্যে এত সব কায়দা, যা-ভাল তাই-খারাপ, হিব্রু প্রবাদ। আমি মনে মনে ঠিক করলাম আগামীকাল থেকে প্রভাকরবাবু গল্প আরম্ভ করলেই বাধা দেব।
কিন্তু প্রভাকরবাবুর মুখ দেখে মনে হল, আজকের গল্পটাই এখনও শেষ হয়নি। তিনিও নিঃশব্দে হাত তুলে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বললেন, জানালেন যে এর পরে আর গল্প বিশেষ নেই শুধু তার সঙ্গে সেই রাতে বসন্ত সেনের যা বাক্যালাপ হয়েছিল সেটুকু শুনলেই হয়ে যাবে।
.
প্রভাকরবাবুর গল্প লিখছি আমি। প্রভাকরবাবু বলছেন বসন্ত সেনের কথা। ব্যাপারটা খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে। তাই আমি এরপর পাঠক পাঠিকাদের সুবিধার্থে সরাসরি প্রভাকরবাবু কথিত বসন্তবাবুর ও প্রভাকরবাবুর বাক্যালাপ তুলে ধরছি।
প্রভাকরবাবু: বসন্ত তুমি ওই টাকা নিয়ে কোথায় গেলে? পুলিশে তোমাকে ধরার চেষ্টা করেনি?
বসন্তবাবু: দেখুন প্রভাকরদা, নিজে থেকে ধরা না দিলে কিংবা আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব ধরিয়ে না দিলে এসব কেসে পুলিশ কাউকে ধরার চেষ্টা করে না। আমি টাকা নিয়ে চলে এলাম এখানে আগ্রায়। পাশেই একটা দেহাতে ঘরভাড়া নিয়ে চুরির টাকায় দশটা দুধেল গোরু কিনলাম। দুধের ব্যবসা শুরু করে দিলাম।
প্রভাকরবাবু: ভাল।
বসন্তবাবু: ভাল আর কী বলছেন দাদা। দুধের ব্যবসায় খুব লাভ হতে লাগল।
প্রভাকরবাবু: খুব ভাল।
বসন্তবাবু: কিন্তু হঠাৎ গোমড়ক শুরু হল। সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার। এক রাতে আমার দশটা গোরুই মরে গেল।
প্রভাকরবাবু: খুব খারাপ।
বসন্তবাবু: কিন্তু কিছুই ক্ষতি হল না আমার। তাজা গোরুর চেয়ে মড়া গোরুর চামড়ার দাম বেশি। ওই মরা গোরুগুলো কশাইয়ের কাছে বেচে ষাট হাজার টাকা পেলাম।
প্রভাকরবাবু: ভাল।
বসন্তবাবু: তা ছাড়া সরকার থেকে কয়েক মাস পরে ক্ষতিপূরণ পেলাম।
