এই সুযোগে, প্রভাকরবাবু আবার আত্মপ্রকাশ করলেন। চতুর্থ বার বললেন, হিব্রু ভাষায় একটা প্রবাদ আছে।
বিলাসবাবুর গল্পটা প্রায় মাঠে মারা যাওয়ায় এবার আর প্রভাকরবাবুর দিকে নজর না দিয়ে পারা গেল না। আমিই বললাম, প্রভাকরবাবু, আপনার ওই হিব্রু প্রবাদের ব্যাপারটা কী? আর তার সঙ্গে জল, বৃষ্টি, আবহাওয়ার কী সম্পর্ক? বিলাসবাবু বললেন, আবহাওয়া সম্পর্কে কোনও হিব্রু প্রবাদ আছে। নাকি?
ইতিমধ্যে জগা এসে চায়ের কঁকা গেলাসগুলো তুলে নিয়ে গেল। আরেকবার মোমবাতি নিবল, আরেকবার জ্বালানো হল। জগার মা এসে বলল, বাদলার জন্যে আজ তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করবে। যদি আর চা লাগে এখনই দিয়ে যাবে।
প্রভাকরবাবু সঙ্গে সঙ্গে সকলের জন্যে আরেক রাউন্ড চা এবং চানাচুর আদেশ করলেন। তারপর বললেন, আপনারা এতক্ষণ এই বৃষ্টিটা ভাল না খারাপ তাই নিয়ে তর্ক করলেন। তাই শুনে আমার ওই হিব্রু প্রবাদটার কথা মনে পড়ল। আর সেই সঙ্গে একটা গল্প।
উকিলবাবু জেরার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলেন, হিব্রু প্রবাদে এই বৃষ্টি সম্পর্কে কী বলেছে, ভাল না খারাপ? প্রভাকরবাবু বললেন, বৃষ্টি সম্পর্কে হিব্রু প্রবাদে কিছু বলা নেই। প্রবাদটার কথা হল, যা ভাল তাই খারাপ আর যা খারাপ তাই ভাল। যেমন এই বৃষ্টিটা ভাল আবার খারাপও বটে।
বিলাসবাবু আর আমি সমস্বরে বললাম, এ আবার কী হেঁয়ালি?
প্রভাকরবাবু বললেন, দেখুন হেঁয়ালি-পেঁয়ালি নয়। প্রবাদটা বোঝাবার জন্যে আমি একটা ঘটনা বলছি।
আমরা এটাই আশা করেছিলাম, এবার চুপ করে প্রভাকরবাবু কী বলেন শুনতে লাগলাম।
প্রভাকরবাবু বলতে লাগলেন, ধর্মতলার পূর্বদিকের শেষ মাথায় সানরাইজ বার বলে একটা জায়গা ছিল আমাদের মদ খাওয়ার আড্ডা।
আমি বললম, সানরাইজ বার নামে কোনও কিছু ওদিকে দেখিনি তো। প্রভাকরবাবু বললেন, আগে গল্পটা শুনুন। এটা অনেকদিন আগের কথা। যে জায়গায় বারটা ছিল সে জমিতে এখন এগারোতলা বাড়ি উঠেছে।
প্রভাকরবাবুকে আমরা আর বাধা দিলাম না। তিনি বললেন, ওই সানরাইজে একসময় আমি সন্ধ্যা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত আড্ডা দিতুম। আড্ডা মানে মদ্যপান। তবে কখনও মাতাল হতুম না।
আমরা কেউ কেউ তাঁর এ কথায় মুচকিয়ে হাসলাম, কিন্তু মোমবাতির সামান্য আলোয় প্রভাকরবাবু হয়তো সেটা দেখতে পেলেন না।
যা হোক, চা এসে গিয়েছিল, চায়ের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে প্রভাকরবাবু বলতে লাগলেন, সানরাইজে বসন্ত সেন বলে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। দুজনে এক টেবিলে বসে প্রতিদিন সন্ধ্যায় মদ খেতাম। বেশ হৃদ্যতা হয়েছিল। শুনেছিলাম সে কোথায় এক কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কে কাজ করে। হঠাৎ একদিন বসন্ত এল না। তারপর, সে আর এলই না। কানাঘুষো শুনলাম, সে নাকি কোঅপারেটিভ থেকে লাখখানেক টাকা সরিয়ে উধাও হয়েছে। এরপরে তার আর খোঁজ পেলাম না। তাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ গতবার আগ্রায় বেড়াতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা। স্টেশনের থেকে তাজমহলে যাওয়ার পথে বাজারের মোড়টায় একটা মদের দোকান আছে, সাজাহান ওয়াইন শপ, সেখানে এক পাঁইট রাম কিনতে গেছি। দেখি কাউন্টারে বসন্ত সেন। এতদিন বাদে হলেও আমি তাকে একবার দেখেই চিনতে পারলাম। সেও চিনতে পারল, মোটেই আত্মগোপনের চেষ্টা করল না। বরং সন্ধ্যায় তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করল। হোটেলে উঠব ভেবেছিলাম। সুটকেসটা হাতেই ছিল, সেটা তার দোকানে নামিয়ে বাড়ির ঠিকানা নিয়ে রিকশায় করে তাজমহল দেখতে চলে গেলাম। বললাম তাজমহল দেখেশুনে সরাসরি তার বাড়িতে সন্ধ্যায় চলে যাব।
ইতিমধ্যে চা পান এবং চানাচুর খাওয়া শেষ হয়েছে। বাইরে বৃষ্টির জোর আরেকটু বেড়েছে। শীতের রাতের বৃষ্টি সহজে হয়তো ছাড়বে না। আমরা কেউ কেউ উঠি উঠি করছিলাম। বাড়িতে যদি আবহাওয়ার মেজাজ বুঝে খিচুড়ি-টিচুড়ি রান্না হয় তাহলে সময়মতো না পৌঁছালে গোলমাল আছে।
কিন্তু প্রভাকরবাবু গল্পটা ভাল ধরেছেন। বসন্ত সেনের গল্পটা জমবে বলেই মনে হচ্ছে, তা ছাড়া গল্পের মধ্যপথে ওঠাটা ঠিক ভদ্রতাও নয়।
সন্ধ্যায় গেলাম বসন্ত সেনের বাড়িতে। প্রভাকরবাবু বলতে লাগলেন, বসন্ত আগেই চলে এসেছিল। দেখলাম বাসায় সে একাই থাকে। এক মধ্যবয়সি দেহাতি কাজের মেয়ে আছে, নাম বোধহয় জানকী। জানকী সধবা না বিধবা না অবিবাহিতা কিছুই বোঝা গেল না। তবে বুঝলাম রান্না বান্না থেকে সংসারের সব কিছুই সে করে।
একটা ছোটগলির একদম শেষে একটা ছোট একতলা বাড়ি, গেটে নেমপ্লেট রয়েছে এস বসন্ত (S. Vasanta)। বুঝলাম নামটা একটু ঘুরিয়ে দিয়েছে সে, সেনকে এস করে বসন্ত নামটাকে উপাধি বানিয়েছে। আত্মরক্ষার জন্যে বোধহয় এটা প্রয়োজন ছিল। নেমপ্লেটে নামের নীচে লেখা রয়েছে ওয়াইন মার্চেন্ট।
বসন্ত কিন্তু খুব সমাদর করল। বাড়িতে আসার পথে একটা দোকান থেকে মাংসের বড়া আর কাবাব নিয়ে এসেছে। আমি পৌঁছে যাওয়ার পর সে সেগুলো উঠোনে একটা ছোট জনতা স্টোভে গরম করতে লাগল। জানকী মাছ-মাংস ছোঁয় না, শুদ্ধাচারী। তাই এই ব্যবস্থা।
সে যা হোক, বসন্ত বড় এক বোতল ফৌজি রামও এনে রেখেছিল। একটু পরে গেলাস, বোতল, জল এই সব নিয়ে দুজনে পরিপাটি করে বসলাম। প্লেটে প্রচুর পরিমাণে মাংসের বড়া এবং কাবাবও রইল।
