আমিও অবশ্য তাই করলাম আজকে। তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে ঠাট্টা করে বললাম, কী, বৃষ্টিটা নামিয়ে এলেন বুঝি।
এ কদিন ধরে শৈত্যপ্রবাহ চলছিল বলে সবাই অল্পবিস্তর আবহাওয়া বার্তার দিকে নজর রাখছিল। আবহাওয়া দপ্তরের আজকের পূর্বাভাসে বৃষ্টির কথা একেবারেই ছিল না এবং বলা ছিল শীত কমবে।
এরকম ভুল আবহাওয়া বার্তায় অনেক সময়েই হয়ে থাকে এবং সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিলাসবাবু নিজে খুব সুরসিক লোক। তিনি ঘরে ঢুকে রুমাল দিয়ে মাথা মুছে একপাশে বসলেন। এর মধ্যে মোমবাতিটা নিবে গিয়েছিল, আবার সেটাকে দরজা বন্ধ করে জ্বালানো হল।
বিলাসবাবু শক্ত হয়ে বসে প্রশ্ন করলেন, আপনারা ঘরের মধ্যে কী নিয়ে যেন গোলমাল করছিলেন? আমি বললাম, আপনার বিষয়েই, ওই আবহাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল।
হঠাৎ আমাকে থামিয়ে দিয়ে প্রভাকরবাবু ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে বললেন, এই নিয়ে তৃতীয়বার বললেন কথাটা, আমি বলছিলাম, হিব্রু ভাষায় একটা প্রবাদ আছে।…
আমরা সবাই জানি যে প্রভাকরবাবু হিব্রুভাষা জানেন না এবং প্রভাকরবাবু এখন যে প্রবাদের কথাটা বলবেন, সেটা হিব্রুভাষায় কেন, পৃথিবীর কোনও ভাষাতেই হয়তো নেই। কিন্তু সেই জন্যেই তার কথাবার্তা এত আকর্ষণীয় এবং তাকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তার গল্প শুনতে আমাদের খারাপ লাগে না।
প্রভাকরবাবুর কায়দা হল এক-একটি বাক্য বলে কিছুক্ষণ থেমে থাকা। এতে ওঁর সুবিধে হয়, অনেক কিছু ভেবে নিতে পারেন; আমাদেরও সুবিধে হয় টিকাটিপ্পনি করার।
সে যা হোক, আজকের আলোচনার গোড়ায় ফিরে যাই। শীতের বৃষ্টি নিয়ে কথা হচ্ছিল। উকিল নরেশবাবু বলছিলেন এই বৃষ্টি খুব খারাপ। ধান নষ্ট হবে, আমের বোল, লিচুর মুকুল, কঁঠালের মুচি সব কিছুর ক্ষতি হবে। উকিলবাবুর দেশে জমিজমা আছে, তার এই বক্তব্যের গুরুত্ব আছে। কিন্তু অন্য একজন, পরেশবাবু, ভারিক্কি ধরনের হেডমাস্টার মানুষ। এককালে রীতিমতো বখা ছিলেন এখন মেয়েদের স্কুলের হেডমাস্টার। একটু গম্ভীরভাবে সামলে সুমলে চলতে হয়, তার কথাবার্তায়ও হেডমাস্টারি ভাবটা এসে গেছে, তিনি বললেন, এ বৃষ্টি খুব ভাল ব্যাপার। এতে ফল ফসলের কোনও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং উপকার হবে। তিনি খনার বচন উদ্ধৃত করে রীতিমতো প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, স্বয়ং খনা বলেছেন, যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।
সত্যিই সময়টা মাঘের শেষ চলছে, খনা পক্ষে থাকায় পরেশ হেডমাস্টারের একটু সুবিধে হল। কিন্তু উকিলবাবুও ছাড়ার পাত্র নন, গত সপ্তাহেই তিনি গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরেছেন। সদ্য দেখে এসেছেন, আম গাছে বোল এসেছে, রবি ফসলে দানা বেঁধেছে। বৃষ্টি আর সেই সঙ্গে মেঘলা ভাবটা এক আধদিন থাকলেই সমূহ সর্বনাশ হবে, তখন কেতাবি বিদ্যা বা খনার বচনে মোটেই কাজ হবে না।
তুমুল তর্ক বেধে গেল। শীতের অকাল বৃষ্টি ভাল না খারাপ, এই প্রশ্নে সদস্যেরা দুই দলে ভাগ হয়ে রীতিমতো হইহল্লা শুরু করে দিল। বলা বাহুল্য এদের কারওরই এ বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান অভিজ্ঞতা কিছুই নেই, সবাই মোটামুটি কলকাতার লোক, শুধু একজন ছোটবেলায় কয়েক বছর কাকদ্বীপে ছিলেন, তিনি বললেন, বৃষ্টি হলে তরমুজ খুব বড় বড় হয়।
এরই মধ্যে খনার বচনের সুবাদে প্রভাকরবাবু পরপর দুবার হিব্রু প্রবাদের উল্লেখ করেছেন। এখন বিলাসবাবু ঘরে ঢুকতে তিনি আরেকবার বললেন, হিব্রুভাষায় একটা প্রবাদ আছে।
আমরা জানি প্রভাকরবাবু যখন ধরেছেন প্রসঙ্গটা শেষ পর্যন্ত ধরে থাকবেন। তার আগে বিলাসবাবু একটা মজার কথা বললেন। বিলাসবাবু বললেন যে, এই হঠাৎ বৃষ্টিটা এসে গেল এটা তারা আবহাওয়া অফিসেও চব্বিশ ঘণ্টা আগে টের পাননি। কোথাও সহসা একটা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে, তারই জের টেনে এই বৃষ্টি।
অতঃপর বিলাসবাবু যা বললেন তা প্রণিধানযোগ্য। এই অকালবৃষ্টি। মাঘের শেষের বর্ষণ ভাল কি খারাপ, এমনকী হিব্রু প্রবাদের অবতারণার প্রচেষ্টা চাপা পড়ে গেল কিছুক্ষণের জন্যে।
পাবলিক আর খবরের কাগজ আজ কিছুদিন হল যাচ্ছেতাই হেনস্তা করছে আবহাওয়া দপ্তরকে। বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে অন্তত সাড়ে তিনশো দিন আবহাওয়া অফিস যা বলে তা মিলে যায় কিন্তু ওই যে বছরে দিন দশ পনেরো ভুলভাল হয় তাই নিয়ে সবাই কটুকাটব্য, তিক্ত ও বক্র মন্তব্য করে। হাসাহাসি করে।
বিলাসবাবু বললেন, তাদের ওপরওয়ালারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এখন থেকে আর ওরকম হবে না, আবহাওয়া বুলেটিন এখন থেকে শতকরা একশো ভাগ শুদ্ধ হবে। এমনকী ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড এই সব দুর্যোগও আবহাওয়া বুলেটিনে পরিষ্কার এবং শুদ্ধ থাকবে।
আমরা সবাই বুঝলাম, এটা সম্পূর্ণ বাজে কথা। এরকম হতেই পারে না, এর মধ্যে বিলাসবাবুর কোনও চালাকি বা রসিকতা আছে।
অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই বিলাসবাবু নিজেই ব্যাপারটা ভাঙলেন, বিলাসবাবু বললেন, ঠিক হয়েছে যে, এখন থেকে আমরা আর পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার আবহাওয়ার বুলেটিন না দিয়ে পূর্ববর্তী চব্বিশ ঘণ্টার আবহাওয়াবার্তা দেব। তাতে আর কোনও ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
একথা শুনে আমরা সবাই অল্পবিস্তর হাসলাম। তবে আমরা বিলাসবাবুর রসিকতা যতটা জোরালো হবে ভেবেছিলাম তা একেবারেই হয়নি।
