সালাম বলল, সেটা ভাল খবর কি খারাপ খবর বুঝতে পারছি না।
ভাল-খারাপ
হিব্রু ভাষায় একটা প্রবাদ আছে, হঠাৎ প্রভাকরবাবু বললেন।
নানা কারণে আমাদের সন্ধ্যাসমিতির সভ্যেরা প্রায় কেউই প্রভাকরবাবুকে পছন্দ করেন না। প্রভাকরবাবু আমাদের এ পাড়ায় এসেছেন প্রায় পনেরো বছর কিন্তু আগাগোড়া আমাদের এড়িয়ে গেছেন। পুজো-পার্বণে চাঁদা-টাঁদা দিয়েছেন; কিন্তু সন্ধ্যাসমিতির ক্লাবঘরে, যেখানে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের জমাট আড্ডা বসে, তাস খেলা হয়, সেখানে তিনি ভুলেও কোনও সন্ধ্যায় পা মাড়াননি।
আসলে প্রভাকরবাবুর ঝোঁক ছিল অন্যত্র। আমাদের তরল আড্ডার চেয়ে তরলতর দ্রব্য অর্থাৎ শক্ত পানীয়ের প্রতি তার টান ছিল অনেক, অনেক বেশি।
আমরা সন্ধ্যাসমিতির সদস্যেরা অনেকদিন রাতে তাস এবং আড্ডার শেষে যখন ক্লাবঘরে তালা দিচ্ছি, দেখেছি প্রভাকরবাবু টলতে টলতে ট্যাকসি বা রিকশা থেকে নামছেন এবং তারপর ভাড়া মিটিয়ে স্থলিত চরণে নিজের বাড়িতে ঢুকছেন।
সন্ধ্যাসমিতি কোনও উঠতি মাস্তানদের ঠেক কিংবা রাজনৈতিক দলের ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠান নয়; পুরনো, বনেদি কলকাতার আদি ও অকৃত্রিম সমিতিগুলোর একটা। প্রতিটি সন্ধ্যায় অফিসকাছারির শেষে বাড়ি ফেরত ভদ্রলোকেরা এখানে বসে একটু গল্পগুজব করেন, তাস-টাস খেলেন। তবে সে সবই নিতান্ত নিরামিষ ব্যাপার।
এতকাল এসব নিরামিষ ব্যাপার প্রভাকরবাবুর মোটেই পছন্দ ছিল না। তিনি এক সওদাগরি প্রতিষ্ঠানের মাঝারি সাহেব। সন্ধ্যায় চা খাওয়া তাঁর পোষায় না। তিনি আমাদের এড়িয়েই চলতেন। সন্ধ্যায় তার যাওয়ার জায়গা ছিল অন্যরকম।
কিন্তু সম্প্রতি প্রভাকরবাবু এক দুর্বিপাকে পড়েছেন। তাঁর লিভার না কী যেন খারাপ হয়েছে। সব রকম দুমূল্য পানীয় ডাক্তার নিষেধ করে দিয়েছেন। বাধ্য হয়েই তিনি আমাদের সন্ধ্যাসমিতির আড্ডায় ভিড়েছেন। সন্ধ্যাবেলায় দূরদর্শনের প্রোগ্রাম বা বই পড়া, এসব কিছুই তাঁর সহ্য হয় না। কী আর করবেন, দু-চারদিন ইতস্তত করার পরে সন্ধ্যাসমিতিতে অনুপ্রবেশ করেছেন।
বলা বাহুল্য, সন্ধ্যাসমিতির সাবেকি সদস্যেরা প্রায় কেউই প্রভাকরবাবুকে পছন্দ করেন না। তার উন্নাসিকতার ইতিহাস এত সহজে বিস্মৃত হবার নয়। তবে ভদ্রলোকের দুটো গুণ আছে।
প্রথম গুণ হল, কথা বলায় ওস্তাদ। যেকোনও বিষয়ে যেকোনও কথা বলতে পারেন। শুধু কথা নয়, অনর্গল চটকদার বাক্যের নকশা, তার মধ্যে কল্পনার সোনালি ফুল মেশানো।
প্রভাকরবাবুর দ্বিতীয় প্লাস পয়েন্ট হল, তিনি অমায়িক, দিলদরিয়া ব্যক্তি। নিজে আজকাল চা-সিগারেটও কদাচিৎ খান, কিন্তু সন্ধ্যাসমিতির আড্ডায় এই সব রসদ ঘুষ দিয়ে তিনি নিজের পূর্বকর্মের প্রায়শ্চিত্তই হয়তো করেন।
অনেকদিন পরে এ বছর খুব জমাট শীত পড়েছে। তার ওপরে আজ সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা মেঘলা। এখন সন্ধ্যার দিকে একটু ঝিরঝির করে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে, খুব জোর নয়, বর্ষাকালে যে বৃষ্টিকে ইলশেগুঁড়ি বলে সেই রকম। তবে বেশ জোর উত্তুরে হাওয়া সঙ্গে আছে।
কথা হচ্ছিল এই অসময়ের বৃষ্টি নিয়ে। আমাদের এই সন্ধ্যাসমিতি বসে একটা পুরনো বাড়ির একতলার প্যাসেজের পাশে একটা বড় ঘরে। প্যাসেজ পেরিয়ে সামনে রাস্তার পাশেই একটা চায়ের স্টল। চা ছাড়া চানাচুর, বিস্কুট, সিগারেট, পান প্রায় সব কিছু আনুষঙ্গিক জিনিসই পাওয়া যায়। দোকানটা চালান এক কর্কশকণ্ঠী মহিলা, তার নাম কেউ জানে না। তবে তার ছেলের নাম জগা। জগাই দোকানের বয়ের কাজ করে এবং জগার সূত্রেই মহিলাকে সবাই জগার মা বলে।
জগার মার ভূমিকা অবশ্য এ কাহিনিতে তেমন জোরদার নয়, তবু সূত্রপাত করে রাখলাম। এবার বৃষ্টির মধ্যে ফিরি।
অকালের বৃষ্টি, জমাটি ঠান্ডা তার ওপরে উত্তুরে হাওয়া। সুতরাং আবহাওয়া নিয়ে একটু কথাবার্তা হবেই। তা ছাড়া অন্যান্যবার শীতকালে মোটেই লোডশেডিং হয় না কিন্তু এ বছর শীতকালেও ভয়াবহ বৈদ্যুতিক গোলমাল। আবহাওয়ার দুর্যোগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এসেছে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার।
সন্ধ্যাসমিতির ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ। ইলেকট্রিকের বিকল্প একটা কেরোসিন লণ্ঠনের বন্দোবস্ত ছিল, কিন্তু অনেকদিন কাজে না লাগায় সেটা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ঘরের এক প্রান্তে একটা মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে, কিন্তু কেউ ঘরে ঢুকলে বা বেরিয়ে গেলে যেই দরজা খুলতে হচ্ছে দমকা হাওয়া ভিতরে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে মোমবাতিটাকে ঘরের কোনা থেকে খুঁজে বার করে ধরে হুস করে নিবিয়ে দিচ্ছে।
একটু আগে প্রভাকরবাবুর ফরমায়েস মতো জগা চা দিতে এসেছিল, তখন দরজা খুলে দিতেই মোমেবাতি নিবে গিয়েছিল। এখন আবার কে যেন দরজাটা ঠুকঠুক করে নাড়ছে, বোধহয় জগাই গেলাস ফেরত নিতে এল। সবাই ঠান্ডায় জড়সড় হয়ে আছে। আবার দরজা খুলতে হবে, কনকনে হাওয়া ঢুকবে, মোমবাতি নিববে। কেউই উঠে দরজা খুলতে যায় না। দরজার কাছেই আমি বসেছিলাম, বাধ্য হয়েই আমাকেই উঠে দরজা খুলতে হল।
না, জগা নয়। বিলাসবাবু। বিলাসবাবু সন্ধ্যাসমিতির একজন স্থায়ী সদস্য। প্রতি সন্ধ্যাতেই আসেন। বিলাসবাবু চাকরি করেন আবহাওয়া দপ্তরে। তাঁর গলাবন্ধ ফুলহাতা সোয়েটারে এবং মাফলারে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি গুঁড়ো লেগে রয়েছে। বিলাসবাবুর দুর্ভাগ্য এই যে আবহাওয়া একটু এদিক ওদিক হলেই সবাই তাঁর সঙ্গে আবহাওয়া নিয়ে রসিকতা করেন।
